দুই জলপরী

পাথারিয়ার ফুলঝেরঝেরি ও ফুলবাগিচা জলপ্রপাত। নজর কাড়া সৌর্ন্দয। যেন দুই ডানাকাটা জলপরী। বড়লেখা সদর ইউনিয়নের আওতাধীন এ জলপ্রপাত দুটির রূপমাধুর্য এখন সবার মুখে মুখে। দুর্গম পাহাড়ি এলাকার লোকচক্ষুর অন্তরালে থাকা এই প্রপাত দুটির রূপ দর্শনে এখন প্রতিনিয়তই ছুটছেন এডভাঞ্চারপ্রিয় পর্যটকরা। জাদুময়ী জলপ্রপাত দুটিই আপন সৌন্দর্যে একে অপরকে ছাড়িয়ে। এই দুজল সুন্দরীর কাছে পৌঁছাতে দুর্গম পাহাড়ি পথে মিলে পাহাড়িটিলার পাদদেশে বয়ে চলা ছড়ার স্বচ্ছ শীতল পানি, সবুজ প্রকৃতি, বনফুল, চাষনী লেবুর সুবাস, পাখি ও ঝিঁঝি পোকার ডাক। এ যেন প্রকৃতির এক অন্যরকম আবেশ। গন্তব্য পথে নানা অনিন্দ্য সুন্দর প্রকৃতির হাতছানি। চোখজুড়ে ঘন সবুজ অরণ্য। পাহাড়ি টিলার আঁকাবাঁকা পথ। দুর্গম পাহাড়ি পথে ছোট-বড় পাথরের ঝর্ণাধারার কলকল শব্দ। এমন অপলক প্রাকৃতিক দৃশ্যে মন নাচে আনন্দ আবেগে। এমন অপরূপ প্রকৃতির রূপ বৈচিত্র্যের আঁধার বড়লেখার পাথারিয়ার ফুল ঢালনী ঝেরঝেরী ও ইটাহরী ফুলবাগিচা জলপ্রপাত। পাথারিয়া পাহাড়ের উঁচু-নিচু টিলার ওপর সবুজ বৃক্ষরাজি ও পাহাড়ের বুক চিরে প্রবাহমান জলপ্রপাত প্রকৃতিপ্রেমীদের আপন করে কাছে টানে। ছড়ার ছোট-বড় পাথরের ওপর দিয়ে বয়ে চলা স্বচ্ছ স্রোতস্বিনী জলধারা জানান দিচ্ছে এই জল সুন্দরীদ্বয়ের আপন সৌন্দর্য। সম্প্রতি এই দুই জলসুন্দরীর রূপ সৌন্দর্য ধরা পড়েছে প্রকৃতিপ্রেমীদের চোখে। তাই দুর্গম পাহাড়ে থাকা এই জলপ্রপাত দুটির এখন পরিচিত বাড়ছে দিন দিন। মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার সদর ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী ডিমাই বাজার হয়ে বড়লেখা সদর বন বিটের আওতাধীন পাথারিয়া পাহাড়ের নির্জন পল্লী ডিমাই পুঞ্জির পাশ দিয়ে দুর্গম পাহাড়ি ও ছড়া পথে হাঁটলেই চোখে পড়ে দৃষ্টিনন্দন অনেকগুলো ছোট ঝর্ণা। প্রায় ৬ কিলোমিটার পিচ্ছিল পাথুরে ছড়া দিয়ে হাঁটার পর এই ছোট ঝর্ণাগুলো বেয়ে ওপরে ওঠলে দুটি টিলার ভিতরেই অবস্থান অনিন্দ্য সুন্দর ঝেরঝেরী জলপ্রপাত। আর ফুলবাগিচা জলপ্রপাতে পৌঁছাতে প্রায় ৬০-৭০ ফুট উঁচু দুটি পাহাড়ের পিচ্ছিল পথ এগুলেই দেখা মিলে এই জল সুন্দরীর। স্থানীয়দের কাছে এগুলো ঢালনী (ঝেরঝেরী) ও ইটাহরী ফুলবাগিচা জলপ্রপাত নামেই পরিচিত। এই জলপ্রপাত থেকে আসাম প্রদেশের করিমগঞ্জ বর্ডারের দূরত্ব প্রায় ৩ কিলোমিটার। পাথারিয়া পাহাড়ের আরেকটি অংশে বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ জনপ্রিয় জলপ্রপাত মাধবকুণ্ড। মাধবকুণ্ড ও কমলগঞ্জের কুরমা বনবিটের দুর্গম পাহাড়ী বনের হামহাম জলপ্রপাতের মতো বড় না হলেও ঝেরঝেরী ও ফুলবাগিচা জলপ্রপাত নান্দনিক প্রাকৃতিক পরিবেশের ছোঁয়ায় রয়েছে অন্যরকম স্বকীয়তা। স্থানীয়দের তথ্যমতে ঢালনী (ঝেরঝেরী) ও ইটাহরী ফুলবাগিচার মতো পাথারিয়া পাহাড়ের ওই অংশ হতে চোখে পড়বে ত্রিপল ঝর্ণা, জামিনীকুণ্ড, মৌলভীঝর্ণা, জমজ ঝর্ণা ও রামাকুণ্ড নামে আরো প্রায় ৫টি জলপ্রপাত। এগুলোর বেশিরভাগই মৌসুমী ঝর্ণা। বর্ষাকালে এই ঝর্ণাগুলো যৌবনদীপ্ত হয়ে ওঠে। আর শুষ্ক মৌসুমে থাকে শুকনো। এছাড়াও পাথারিয়া পাহাড়ের ফুলছড়িতে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নান্দনিক একটি মাটির ব্রিজ। এই ব্রিজটি দুটি টিলার সংযোগস্থল। প্রায় ৩০ ফুট লম্বা ব্রিজটির নিচে প্রবহমান ছড়া। যাতায়াত ব্যবস্থার অপ্রতুলতা ও দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় এবং প্রচার প্রচারণার না থাকায় প্রকৃতির নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের প্রতীক এই জলপ্রপাতগুলো ছিল লোকচক্ষুর অন্তরালে। স্থানীয়রা জানালেন, পুরো পাথারিয়ারর বুক চিরে এরকম প্রায় অর্ধশতাধিক ছোট বড় ঝর্ণা রয়েছে। বড়লেখা সদর ইউনিয়নের স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ওখানকার প্রাকৃতিক ঝর্ণা, ছড়া আর নৈসর্গিক প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের এই সবুজের রাজ্য দর্শনার্থীদের মনজুড়াতে রয়েছে প্রস্তুত। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হলে পর্যটকরা সহজেই প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগে আগ্রহী হবেন। তারা জানালেন পর্যটকরা দূর-দূরান্ত থেকে বড়লেখায় এসে শুধু মাত্র মাধবকুণ্ড ভ্রমণ করেন। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ উদ্যোগী হলে মাধবকুণ্ডসহ আশেপাশের দর্শনীয় স্থান দেখার পাশাপাশি এই জলপ্রপাতগুলোও দেখেও মুগ্ধ হবেন পর্যটকরা। এতে দেশের পর্যটন শিল্পের যেমন বিকাশ ঘটবে তেমনি সরকারও পাবে রাজস্ব। এবিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) প্রকাশ কান্তি চৌধুরী বলেন, সরকার দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশে খুবই আন্তরিক। বড়লেখার এই নতুন জলপ্রপাতগুলো ও সেখানকার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বিষয়টি সম্পর্কে খোঁজ নেয়া হবে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ সমস্ত পর্যটন স্পটগুলোকে সার্বিক ব্যবস্থাপনা, যোগাযোগ, পর্যটকদের সার্বিক সুবিধা ও অবকাঠামোগত উন্নয়নের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।