বিশ্ব জয় করছে ‘তেঁতুলিয়া’ অর্গানিক চা

সবুজ ব্যবসায় মুনাফা কম হলেও প্রাপ্তি অনেক : আসমা-উল-রোকসানা

চায়ের বাজারে একটি দেশি ব্র্যান্ড কিভাবে আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি এনে দেয় তার প্রমাণ দিয়েছে কাজি অ্যান্ড কাজি চা। এই কম্পানির ‘তেঁতুলিয়া’ চা এখন বিশ্বের স্বীকৃত প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড। বিশ্বের শীর্ষ মানসনদ প্রদানকারী সংস্থাগুলোর মূল্যায়নে শতভাগ এই অর্গানিক চায়ের বাজার বাড়ছে ক্রমাগত। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া জনপদের মানুষের দারিদ্র্য জয় করতে সহায়ক এই উদ্যোগ আজ বিশ্বের সেরা ২৫টি প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে বলে জানালেন কাজি অ্যান্ড কাজি টি প্যাকেজিং ইউনিটের হেড অব অপারেশনস আসমা-উল-রোকসানা। যুক্তরাষ্ট্রের ফোর্বস ম্যাগাজিন ও সার্কেল আপের করা ২০১৫ সালের বিশ্বের সেরা ২৫টি চায়ের ব্র্যান্ডের তালিকায় জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশের তেঁতুলিয়া অর্গানিক চা। আসমা-উল-রোকসানার বলেন, এ ধরনের সবুজ ব্যবসায় মুনাফা কম হলেও সমাজ ও পরিবেশের ওপর এর ইতিবাচক প্রভাব অনেক বেশি। এ কারণে এই উদ্যোগ থেকে প্রাপ্তির পরিমাণও বেশি। সম্প্রতি কালের কণ্ঠকে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে তিনি বিশ্ব স্বীকৃত এই ব্র্যান্ডের পেছনের কাহিনীর কথা জানান। ‘এ কাপ অব হ্যাপিনেস’ স্লোগানে ২০০৭ সাল থেকে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার নামানুসারে বিশ্ববাজারে ‘তেঁতুলিয়া’ ব্র্যান্ডের চা রপ্তানি শুরু করে কাজি অ্যান্ড কাজি টি এস্টেট কম্পানি। প্রথমে এই চা যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যে রপ্তানি শুরু হয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষ এটিকে অর্গানিক চা হিসেবে স্বাকৃতি দেয়। তেঁতুলিয়া হচ্ছে বাংলাদেশের প্রথম চা, যা যুক্তরাজ্যের হ্যারডস সুপারমার্কেটে বিক্রি হয়। যেখানে রানি শপিং করেন বলে কথিত রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রেও উন্নতমানের এই চায়ের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে, যা বিশ্বের খ্যাত অঞ্চলগুলো থেকে আসে। যুক্তরাষ্ট্রের খুচরা বাজারে এসব চা ১৬টি ব্যাগের একটি ইকো-ক্যানিস্টার সাত-আট ডলারে বিক্রি হয়। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যের বাজারেও নামিদামী চেইন সুপারশপে তেঁতুলিয়া পাওয়া যায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বাজারে সফলতার পর তেঁতুলিয়া চা এখন জাপান, মালয়েশিয়া, নিউজিল্যান্ড, কুয়েতসহ আরো কয়েকটি দেশের আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন দোকানে বিক্রি হচ্ছে। মান ও দামের দিক থেকে তেঁতুলিয়াকে বিশ্বখ্যাত প্রিমিয়াম ব্র্যান্ডগুলোর সমপর‌্যায়ের বলে জানালেন আসমা-উল-রোকসানা। তিনি বলেন, ‘আমাদের চা ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্র এবং জাপানের মানসনদপ্রাপ্ত। যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় ম্যাগাজিন নিউজউইক আমাদের নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। আগামীতে অস্ট্রেলিয়া ও কানাডার বাজারেও রপ্তানি হবে তেঁতুলিয়া চা।’ শতভাগ অর্গানিক চা উত্পাদনের পেছনের দর্শন তুলে ধরে কাজি অ্যান্ড কাজি টির এই কর্মকর্তা বলেন,  ‘আমাদের মূল দর্শন ছিল পরিবেশ সুরক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের জীবন মান উন্নয়ন। পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ার মতো মঙ্গাপীড়িত শিল্প কারখানাবিহীন জনপদে আমাদের এই উদ্যোগে বহু মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। এ জন্য আমরা সমবায় পদ্ধতি বেছে নিই। সেখানে আমাদের প্রতিষ্ঠানের স্বপ্নদ্রষ্টা কাজী শাহেদ আহমেদের নামে একটি ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করা হয়। শতভাগ অর্গানিক চা উত্পাদনে কাজি অ্যান্ড কাজি কম্পানি ৩০০০ একর জমি কেনে, যেখানে কখনোই কোনো চাষাবাদ হয়নি। আমরা ফাউন্ডেশনের সদস্যদের কোনো নগদ অর্থ ছাড়াই গরু পালনে যুক্ত করি। সেই গরুর গোবর এবং দুধ আমরা কিনে নিই, যা দিয়ে পর‌্যায়ক্রমে গরুর দাম শোধ হয়ে যায়। আমাদের চা বাগানে আমরা কোনো রাসায়নিক সার কিংবা কোনো বালাইনাশক ব্যবহার করি না, যা মানুষ ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক। এ জন্য আমরা আমাদের সাড়ে তিন হাজার সদস্যের কাছ থেকে ছয় হাজারের বেশি গরুর গোবর সংগ্রহ করে তা থেকে তৈরি করা জৈব সার চা বাগানে ব্যবহার করি। এ ছাড়া পোকামাকড় দমনের কাজে আমরা পুরো বাগানে চার লাখের বেশি নিম গাছ এবং প্রচুর বাসক গাছ লাগিয়েছি, যা পোকামাকড় দমনে সহায়ক। তার পরও পোকা লাগলে আমরা আমলকী, বহেরা, হরীতকী, নিম ইত্যাদির নির‌্যাস পোকামাকড় দমনে ব্যবহার করে থাকি। এ ধরনের গ্রিন বিজনেস সফল করতে গিয়ে আমরা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ নিয়েছি। তবে এই ব্যবসায় মুনাফা কম হলেও তৃপ্তি অনেক বেশি। এই উদ্যোগের মধ্য দিয়ে আমরা একটি অবহেলিত কমিউনিটির অসংখ্য নারীর মুখে হাসি ফোটাতে পেরেছি, এটাই বড় আনন্দের।’ কাজি অ্যান্ড কাজি চা কিভাবে শতভাগ অর্গানিকের নিশ্চয়তা দিচ্ছে জানতে চাইলে আসমা-উল-রোকসানা বলেন, ‘আমরা বিশ্ববাজারে নিজেদের শতভাগ অর্গানিক প্রমাণ করতে আমেরিকা, ইউরোপ, জাপান থেকে সার্টিফিকেশন বডিকে আমাদের মান পরীক্ষার আমন্ত্রণ জানাই। কাজি অ্যান্ড কাজিই হচ্ছে বাংলাদেশের একমাত্র চা, যাকে শতভাগ অর্গানিক হিসেবে ঘোষণা করেছে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগ (ইউএসডিএ), সুইস সোসাইটে জেনেরেল দে সারভিল্যান্স (এসজিএস) এবং জাপানিজ অ্যাগ্রিকালচারাল স্ট্যান্ডার্ড (জেএএস)। এসব সংস্থার প্রতিনিধিরা আমাদের অজান্তে দীর্ঘ সময় আমাদের বাগানে এসে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এক বছরের জন্য আমাদের অর্গানিক সনদ দেয়। এক বছর পর আমরা আমাদের মান ঠিক রাখছি কি না তা যাচাইয়ের জন্য আবার তাদের কাছ থেকে সনদ নিতে হয়। এভাবে এখন পর্যন্ত আমরা তাদের শতভাগ অর্গানিক সনদের যাবতীয় শর্ত সফলভাবে পরিপালন করে আসছি।’    বহুজাতিক কম্পানির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাংলাদেশের একটি স্থানীয় কম্পানির পক্ষে প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড তৈরি করা খুবই কঠিন কাজ বলে জানালেন রোকসানা। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের একমাত্র চা কম্পানি হিসেবে আমরাই নিজস্ব ব্র্যান্ডে বিশ্ববাজারে শতভাগ অর্গানিক চা রপ্তানি করি। পাশাপাশি স্থানীয় বাজারে আমরা কাজি অ্যান্ড কাজি ব্র্যান্ডের প্রথম গ্রিন টি, ব্ল্যাক টি, তুলসি টি, জেসমিন গ্রিন টি, জিনজার টিসহ ব্যতিক্রমী ফ্লেভারের চা নিয়ে আসি। এসব চায়ের ফ্লেভার তৈরি করতে গিয়েও কোনো কৃত্রিম নির‌্যাস ব্যবহার করিনি। এ ক্ষেত্রে বাগানের ভেতরেই অর্গানিক পদ্ধতিতে আদা, তুলসি, জেসমিন ফুল উত্পাদন করি।’ স্থানীয় বাজারের পরিধি বড় হওয়ার কারণে কাজি অ্যান্ড কাজি টি স্থানীয় বাজারেও মনোযোগী হচ্ছে বলে জানালেন আসমা-উল-রোকসানা। তিনি বলেন, ‘স্থানীয় বাজারে ২০ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি হয়েছে কাজি অ্যান্ড কাজি টির। দেশজুড়ে সাত হাজার বিক্রয়কেন্দ্রে পাওয়া যায় আমাদের চা। দেশে প্রিমিয়াম চায়ের বাজারে আমরা এখন প্রথম স্থানে আছি। যারা স্বাস্থ্যসচেতন তারা আমাদের গ্রিন টির নিয়মিত ভোক্তা।’ চলতি বাজেটে চা আমদানি নিরুৎসাহিত করতে শুল্ক বাড়ানো হয়েছে। এটি স্থানীয় চা কম্পানিগুলোর বাজার সম্প্রসারণে আরো সহায়ক হবে বলে মনে করেন রোকসানা। তিনি বলেন, ‘আমরা রপ্তানি করব, স্থানীয় বাজারেও অবস্থান শক্ত করতে চাই। এ জন্য আমরা এখন জেলা পর‌্যায়েও পণ্য বাজারজাতকরণ বাড়াচ্ছি। এখন উত্পাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক বাড়াচ্ছি; প্যাকেজিং, ফ্লেভারে পরিবর্তন আনছি। দেশে অর্গানিক পণ্যের মানসনদ প্রদানকারী কোনো সংস্থা না থাকায় অর্গানিক চা নিয়েও ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা করছে কিছু অসাধু প্রতিষ্ঠান। অর্গানিক ব্যবসায় ভালো কম্পানিগুলো টিকিয়ে রাখতে সরকারকে দ্রুত এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।