বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাল্টা ও কমলা চাষের সম্ভাবনা

বরেন্দ্র অঞ্চলে মাল্টা ও কমলা চাষে সাফল্য পেয়েছে চাষিরা। উত্পাদন খরচ কম এবং ফল দুটির স্বাদ ও ঘ্রান অতুলনীয় হওয়ায় বাণিজ্যিকভিত্তিতে চাষের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাজশাহী অঞ্চলের অনেকেই বাড়ির আঙিনায় রোপণ করছে কমলার চারা। চাঁপাইনবাবগঞ্জে বাণিজ্যিকভিত্তিতে মাল্টা চাষের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০১৩ সালে মাত্র ২ বিঘা জমিতে মাল্টা চাষ হয়। সেখানে চলতি বছর ৯৬ বিঘা জমিতে মাল্টা চাষ হচ্ছে। সদর উপজেলার ঝিলিম ইউনিয়নের জামতলা এলাকায় মতিউর রহমান ২০১৩ সালে সর্বপ্রথম ২ বিঘা জমিতে পরীক্ষামূলকভাবে মাল্টা চাষ শুরু করেন।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার ও কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্পের আওতায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট উদ্ভাবিত মাল্টা চাষে প্রথম বছরেই ব্যাপক সাফল্য আসে। মতিউর ২০১৪-১৫ সালে মাল্টা বিক্রি করে ৪ থেকে ৫ লক্ষ টাকা আয় করেন। তার এই সাফল্য দেখে জেলার অনেক চাষি বাণিজ্যিকভাবে মাল্টা চাষ শুরু করেন। পরে নিজে আরো ১২ বিঘা জমিতে চলতি মৌসুমে মাল্টা চারা রোপণ করেছেন। মতিউর রহমান বলেন, মাল্টার স্বাদ নিয়ে প্রথমে ভয় ছিল। কিন্তু পাকার পর দেখা গেছে এটি সুস্বাদু। তাছাড়া পাকার পরও অনেক দিন রেখে খাওয়া যায়, নষ্ট হয় না এবং স্বাদও ঠিক থাকে।

নাচোল উপজেলায় ৫০ বিঘা জমিতে কয়েক হাজার মাল্টা চারা রোপণ করেছেন বাচ্চু নামে এক প্রবাসী। তিনি বলেন, পেয়ারাসহ অন্য ফলের চেয়ে মাল্টা চাষ লাভজনক এবং খরচও কম হয়। চারা রোপণের দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়।

রাজশাহী জেলায় বাণিজ্যিক ভাবে মাল্টা চাষাবাদ শুরু না হলেও জেলার বিভিন্ন উপজেলায় প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ বাসা-বাড়িতে মিষ্টি কমলার গাছ রয়েছে বলে রাজশাহী জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে। তানোর উপজেলার পাঁচন্দর গ্রামের হাসানুজ্জামান মুন এক যুগ আগে শখের বসে যশোর থেকে একটি কমলা গাছ কিনে বাড়ির উঠানে লাগিয়েছিলেন। গত দুই বছর ধরে প্রচুর পরিমাণে কমলা ধরছে গাছটিতে। খেতেও সুস্বাদ। এ কমলা দেখে স্থানীয় কৃষিবিদদের ধারণা বরেন্দ্র অঞ্চলের পোড়া মাটিতে কমলা চাষের উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। হাসানুজ্জামান মুন বলেন, আগামীতে বাণিজ্যিকভাবে কমলা চাষের ইচ্ছা আছে। এ উপজেলায় কয়েক বছরের মধ্যে এই রকম ৭০ থেকে ৮০টি পরিবার ২ থেকে ৩টি করে কমলার গাছ রোপণ করেছেন। এদের অনেকের গাছে ফলও ধরতে শুরু করেছে। উপজেলার সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সমশের আলী জানান, কমলার গাছটি উচ্চতা এবং কমলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে এটি থাই কমলা। এই মাটিতে এত বেশি কমলা ধরছে, যা আগামীতে পুরো বরেন্দ্র অঞ্চলে কমলা চাষের আগাম বার্তা দিচ্ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উদ্যান প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম জানান, মাল্টা চাষ সমপ্রসারিত হলে দেশে উত্পাদিত ফল খেতে পারবে মানুষ। কৃষকদের মাল্টা চাষে আগ্রহ ও সফলতা দেখে চলতি বছর কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হামিদুর রহমান সরেজমিনে এই অঞ্চলে এসে মাল্টা বাগান পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন। প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম আরো জানান, মাল্টা চাষের জন্য জমি ভালো করে চাষ দিয়ে আগাছা মুক্ত করে নিতে হবে। তার পর দুই থেকে আড়াই ফুট দৈর্ঘ্য প্রস্থ ও গভীর করে গর্ত করতে হবে। গর্তের উপরের মাটি এক তৃতীয়াংশ এক দিকে এবং বাকি নীচের মাটি অন্য দিকে রাখতে হবে উপরের মাটির সঙ্গে ১০-১৫ কেজি পচা গোবর সার বা কম্পোস্ট, ১৫০ গ্রাম এমওপি, ২৫০ গ্রাম টিএসপি, ৫ গ্রাম বোরিক এসিড, ১ কেজি চুন, মাটির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে গর্তের নীচে দিয়ে উপরের মাটি দিয়ে গর্ত ভরাট করে রেখে ১০ দিন পরে চারা রোপণ করতে হবে।

Views: 32