চট্টগ্রাম বন্দরের পাশেই হচ্ছে তিন গুণ বড় টার্মিনাল

চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ে আয়তনে তিন গুণ বড় এবং আরো বড় আকারের জাহাজ ভেড়ার উপযোগী নতুন বন্দর তৈরির পরিকল্পনা নিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। বহির্নোঙর থেকে মাত্র এক কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগর উপকূল ঘেঁষে জেগে ওঠা বিশাল চরে হালিশহর এলাকায় এটি নির্মাণ করা হবে। ‘বে টার্মিনাল’ নামের এই বন্দর নির্মিত হলে চট্টগ্রাম বন্দরের বিদ্যমান সীমাবদ্ধতাগুলো কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে একই সঙ্গে বন্দরের সক্ষমতাও বাড়বে বলে মনে করেন বন্দর ব্যবহারকারীরা। বে টার্মিনাল নির্মাণের কারিগরি, অর্থনৈতিক, অপারেশনাল ও আর্থিক সম্ভাব্যতা যাচাই এবং পণ্য ওঠানামার পূর্বাভাস নিরূপণের জন্য জার্মানির প্রতিষ্ঠান সেল হর্নের সঙ্গে সম্প্রতি চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। এর সঙ্গে জার্মানি ও বাংলাদেশের দুটি প্রতিষ্ঠান সহযোগী হিসেবে কাজ করবে। প্রতিষ্ঠানগুলো আগামী ৯ মাসের মধ্যে প্রতিবেদন বন্দরের কাছে জমা দেবে। এর পরই নতুন এই বন্দর নির্মাণের কাজ শুরু হবে। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এম খালেদ ইকবাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বে টার্মিনালের প্রথম পর্যায়ের কাজ ২০২৩ সালে সম্পন্ন করার লক্ষ্য থাকলেও তা ২০২১ সালেই সম্পন্ন করা হবে। আড়াই হাজার মিটার দীর্ঘ টার্মিনালের মধ্যে ১৫০০ মিটার টার্মিনাল দিয়ে ২০২১ সালেই আমরা জাহাজ ভেড়াতে চাই এই টার্মিনালে।’ বন্দর কর্মকর্তাদের মতে, বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে সর্বোচ্চ ১৮০০ একক কনটেইনারবাহী জাহাজ ঢুকতে পারে আর বে টার্মিনালে একসঙ্গে পাঁচ হাজার একক কনটেইনার ধারণক্ষমতার জাহাজ জেটিতে ভিড়তে পারবে। বন্দরে জোয়ার-ভাটার ওপর ভিত্তি করে জাহাজগুলো জেটিতে ভেড়ার সুযোগ পায় কিন্তু অবস্থানগত সুবিধার কারণে বে টার্মিনালে দিনে-রাতে জাহাজ জেটিতে ভিড়তে ও ছেড়ে যেতে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে ১৯টি জাহাজ ভিড়তে পারে আর বে টার্মিনালে একসঙ্গে ৩০-৩৫টি জাহাজ ভিড়তে পারবে। বহির্নোঙর থেকে চট্টগ্রাম বন্দর জেটিতে পৌঁছতে একটি জাহাজকে ১৫ কিলোমিটার দূরত্ব পাড়ি দিতে হয় এর বিপরীতে বে টার্মিনাল ভিড়তে লাগবে মাত্র এক কিলোমিটার। এ ছাড়া বে টার্মিনালে পণ্য জাহাজ থেকে নামিয়ে সরাসরি চট্টগ্রাম-ঢাকা মহাসড়ক দিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যেতে পারবে। বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরের আয়তন ৩৩০ একর আর বে টার্মিনালের আয়তন তিন গুণ বড় ৯০৭ একর। বন্দর জেটিতে সাড়ে ৯ মিটার এবং ১৯০ মিটারের বড় জাহাজ জেটিতে ঢুকতে পারে না। বহির্নোঙর থেকে পণ্য লাইটার বা স্থানান্তর করে ছোট জাহাজে জেটিতে আনতে হয়। কিন্তু ১০-১২ মিটার গভীরতার জাহাজ সরাসরি বে টার্মিনালে প্রবেশ করতে পারলে পণ্য পরিবহন খরচ অনেক কমে যাবে। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য এম এ লতিফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বেড়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা পূর্ণ হয়ে আসছে। এই অবস্থায় চট্টগ্রাম বন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এই বে টার্মিনাল দ্রুত নির্মাণ জরুরি হয়েছে। কারণ অবস্থানগত কারণে বে টার্মিনালের মতো আর কোথাও দ্রুত জেটি নির্মাণের সুযোগ নেই।’ চট্টগ্রাম বন্দরের মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়নকারী জার্মানির এইচপিসি হামবুর্গের হিসাবে, বন্দরের বর্তমান প্রবৃদ্ধি ঠিক থাকলে বর্তমান জেটি-টার্মিনাল দিয়ে সর্বোচ্চ ২০১৬ সাল পর্যন্ত পণ্য ওঠানামা করা সম্ভব। এরই মধ্যে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পুরোদমে চালু হলেও ২০১৮ সাল থেকেই সক্ষমতার অতিরিক্ত পণ্য ওঠানামা করতে হবে বন্দরকে। ২০১৭ সালে বন্দরের মোট সক্ষমতা হবে ২৩ লাখ ৬০ হাজার একক কনটেইনার আর পণ্য ওঠানামা হবে ২১ লাখ ৬৮ হাজার একক। আর ২০১৮ সালে বন্দরের মোট সক্ষমতা থাকবে ২৩ লাখ ৭০ হাজার একক, আর সে বছর পণ্য ওঠানামা বেড়ে গিয়ে দাঁড়াবে ২৩ লাখ ৯৮ হাজার একক। ফলে ২০১৮ সালেই সক্ষমতা অতিক্রম করবে চট্টগ্রাম বন্দর। কিন্তু নতুন টার্মিনাল ছাড়া তা সামাল দেওয়া কখনোই সম্ভব নয়। এই বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে বে টার্মিনালের জন্য বিগত ২০১৫ সাল থেকেই তোড়জোড় শুরু করে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। নৌ মন্ত্রণালয়ের ছাড়পত্র, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন মিললেও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র, বন বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসনের অনাপত্তিপত্র মেলেনি। এসব অনুমতির পর ৯০৭ একর জমির অধিগ্রহণ শুরু করবে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন। চট্টগ্রাম চেম্বার পরিচালক মাহফুজুল হক শাহ বলেন, ‘জনবসতি না থাকায় এখানে ভূমি অধিগ্রহণে ঝামেলা নেই। এর পরও নির্দিষ্ট সময়ে এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে না পারলে এর মাসুল দিতে হবে আমাদের সবাইকে।’