তিন মেধাবীর কাছে হেরেছে সব বাধা

নদী কেড়ে নিয়েছে সব। অন্যের জায়গায় খুপরিঘর তুলে কোনোভাবে মাথা গুঁজে থাকতে হচ্ছে। আবার বাবার অকাল মৃত্যুতে নিদারুণ দারিদ্র্য আঁকড়ে ধরেছে পুরো পরিবারকে। এর পরও এসব পরিবারের সন্তান এবারের এইচএসসি পরীক্ষায় অদম্য মেধার স্বাক্ষর রেখেছে। প্রমাণ করেছে, কোনো বাধাই আর বাধা থাকে না। দৃঢ় মনোবল, অধ্যবসায় আর মেধার জোরে সব বাধাই জয় করা সম্ভব। এমনই তিন মেধাবী কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার রায়হানুল ইসলাম, কুমিল্লার তিতাসের শিরিনা আক্তার ও রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার আহসানুল কবির। রায়হানুল ইসলাম : আর দশটা শিক্ষার্থীর মতো অনায়াসে স্বাচ্ছন্দ্যে লেখাপড়া করার অবস্থা ছিল না রায়হানুল ইসলামের। অন্যের বাড়িতে থেকে ওই বাড়ির সন্তানদের সকাল-সন্ধ্যা পড়িয়ে ফাঁকে ফাঁকে নিজের পড়ার টেবিলে বসতে হতো। একই সঙ্গে তাকে চিন্তা করতে হয়েছে অর্থকষ্ট নিয়েও। কারণ তার লেখাপড়ার জন্য অর্থের জোগান দেওয়ার সামর্থ্য মা-বাবার নেই। এমন চরম দারিদ্র্যের মধ্যদিয়েই তাকে স্কুল পেরিয়ে কলেজ পর্যন্ত আসতে হয়েছে। আর তা সম্ভব হয়েছে মেধা আর অধ্যবসায়ে ভর করেই। এসএসসিতে জিপিএ ৫ অর্জন করার পর ভর্তি হয় ময়মনসিংহ কেভি কলেজে। এখান থেকেই এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে এই মেধাবী জিপিএ ৫ অর্জন করে। এর আগে পিইসি ও জেএসসিতেও জিপিএ ৫ অর্জনের পাশাপাশি বৃত্তিলাভ করেছিল সে। কুড়িগ্রামের রাজীবপুর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদবিচ্ছিন্ন চড়াইহাটি চরে রায়হানুলের বাড়ি। বারবার ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে সব হারিয়ে পরিবারটি এখন ভূমিহীন। অন্যের বসতভিটায় একটা ঘর তুলে কোনোভাবে মাথা গুঁজে আছে পরিবারটি। বাবা সাহার আলী ঢাকায় রিকশা চালান। মা রাহেলা বেগম অন্যের বাড়িতে কাজ করে সামান্য আয়-রোজগার করেন। রায়হানুলের আরো দুই ভাই রয়েছে। তারাও স্কুল-মাদ্রাসায় লেখাপড়া করে। সরেজমিনে চড়াইহাটি গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কথা হয় পরিবারটির সঙ্গে। রায়হানুলের বাবা সাহার আলী বলেন, ‘পোলায় ভালো রেজাল্ট করেছে সেই খবর শুনে বাইত্তে আইছি। এসএসসিতে ভালো রেজাল্ট করার পর অনেক দয়াবান মানুষ তাকে ভালোবাসা দিয়েছে। তাদের সহযোগিতায় পোলা আমার ময়মনসিংহ কলেজে পড়ছে। মাইনসের বাইত্তে থাইকা অনেক কষ্ট কইরা পড়ছে। তার পড়ার খরচ হিসেবে একটা টাকাও আমি দিতে পারি না। আরো দুই পোলা আছে। তাদের পড়া ও খাওয়ার খরচ আছে। এহন পোলাডার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি ও পড়ার খরচ নিয়া খুব চিন্তায় আছি।’ রায়হানুলের মা রাহেলা বেগম বলেন, ‘পোলা আমার অনেক কষ্ট কইরা পড়ছে। নদীভাঙনের সময় থাকার জায়গা ছিল না, পড়ার টেবিল ছিল না। তহনও মাইনসের বাইত্তে থাইকা পড়ছে। মাইনসের পোলাপানের মতো ভালামন্দ খাবার দিবার পারি নাই। মাছ-মাংস-দুধ কী জিনিস আমার পোলা চোখেও দেখে না। মাইনসের সহযোগিতায় তার পড়ার খরচ অইছে। এহন তো আরো বড় কলেজে ভর্তি হওয়া নাগবো। এতে এক গাদি ট্যাহা নাগবো। অত ট্যাহা পাবো কই।’ রায়হানুল বলল, ‘অর্থের অভাব আমার ছোটবেলা থেকেই। তাই এখন আর অভাবকে অভাব মনে হয় না। শুধু মনে হয় এই অভাবকে সঙ্গে নিয়েই আমাকে লেখাপড়া করতে হবে। মা-বাবার স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। আমি যে বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করেছি তারা আমাকে যথেষ্ট আদর-স্নেহ করেছে। তাদের সহযোগিতা ও উৎসাহ পেয়েছি। আর যাঁদের অর্থ সাহায্যে এই সাফল্য পেয়েছি তাঁদের প্রতি আমার অগাধ সম্মান। প্রতিটি মুহূর্ত তাঁরা আমাকে প্রেরণা জুগিয়েছেন। আমি আরো পড়তে চাই। জানি না আমার স্বপ্ন পূরণ হবে কি না।’ রায়হানুল ইসলাম ময়মনসিংহের কেওয়াটখালি এলাকার যে বাড়িতে থেকে লেখাপড়া করত সেই বাড়ির মালিক নজরুল ইসলাম ভুঁইয়া বলেন, ‘আমি জানি রায়হানুল গরিব। এ কারণে আমি কখনো আমার সন্তানদের পড়াতে ওকে চাপ দেইনি। আমি আমার সন্তানদের মতোই ওকে আদর-স্নেহ দিয়েছি। টাকা-পয়সার দরকার হলে সাধ্যমতো দেওয়ার চেষ্টা করেছি।’ শিরিনা আক্তার : মায়ের শ্রম-ঘাম বৃথা যায়নি। অধ্যবসায় আর মেধার কাছে হার মেনেছে প্রকট দারিদ্র্য। কুমিল্লার তিতাসের গাজীপুর খান বহুমুখী হাই স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এবার এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে জিপিএ ৫ অর্জন করেছে বাবাহারা শিরিনা আক্তার। গিয়াস উদ্দিন-শিল্পী দম্পতির এক ছেলে ও এক মেয়ে সন্তানের মধ্যে শিরিনা বড়। ছোট ভাই নূরনবী পড়ছে মাছিমপুর আর আর ইনস্টিটিউশনে অষ্টম শ্রেণিতে। সরেজমিনে দেখা যায়, নড়বড়ে দোচালা ঘরের মধ্যে দুই সন্তান নিয়ে স্বামীহারা শিল্পী বেগমের বসবাস। ঘরে আসবাব বলতে কিছু নেই। এমনকি পড়ার টেবিলটাও নেই। পাশের বাসা থেকে মাসিক হারে বিদ্যুতের বাতি জ্বললেও নেই কোনো ফ্যান। ঘরের মধ্যে একটি ছোট চৌকিতে ঘুমাতে হয় তিনজনকে। দারিদ্র্যের প্রকটতা সর্বত্র। আধুনিকতার প্রতিযোগিতায় সংসারে প্রতিদিন নিত্যনতুন সামগ্রী সংযুক্ত হলেও বাঁশের কঞ্চির মাধ্যমেই রাখতে হয় তাদের কাপড়-চোপড়। পৈতৃক সূত্রে প্রাপ্ত অল্প কিছু জমিই শেষ ভরসা। তা দিয়েই চলে কোন রকম সংসারের চাকা। স্থানীয় রবিউল আউয়াল রবি নামে স্থানীয় এক ব্যক্তি জানান, শিরিনার বাবা গিয়াস উদ্দিন ২০০৩ সালে বাহরাইনে শ্রমিক হিসেবে পাড়ি জমান। ২০০৬ সালে এক দুর্ঘটনায় সেখানেই তিনি মারা যান। সম্পদ বলতে পৈতৃক সূত্রে পাওয়া অতি সামান্য জমি। স্বামীকে হারিয়ে হাল ছেড়ে দেননি শিল্পী বেগম। দুই সন্তান নিয়ে নেমে পড়েন জীবনযুদ্ধে। মেয়ে ভালো ফল করায় মা আনন্দে কেঁদে ফেলেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে বললেন, ‘দুটি সন্তানই আমার শেষ ভরসা। ২০ বছর ধইরা এই ঘরে ওদের নিয়া বসবাস করছি। একদিন ভাগ্য পরিবর্তন হইবো—সে আশায় কষ্ট কইরা যাচ্ছি।’ শিরিনা বলল, এটুকু সাফল্যের পুরোটাই সম্ভব হয়েছে মায়ের জন্য। আমার লেখাপড়া চালাতে অনেক কষ্ট হচ্ছিল। তখন আত্মীয়স্বজন নবম শ্রেণিতে পড়ার সময়ই আমার বিয়ে দিতে চেয়েছিল। জবাবে বলেছিলাম, আমার লেখাপড়ার খরচ আমিই জোগাব। সেই সময় থেকেই টিউশনি করে আসছি। শেষ পর্যন্ত আমি সাফল্য পেয়েছি। আর তা সম্ভব হয়েছে মা সব সময় পাশে থেকেছে বলেই।’ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার আনোয়ারা চৌধুরী জানান, ‘এবার উপজেলার দুটি কলেজ থেকে ৮৭৭ জনের মধ্যে ৫২৪ জন বিভিন্ন গ্রেডে পাস করেছে। তার মধ্যে একমাত্র জিপিএ ৫ পেয়েছে শিরিনা আক্তার। এটা ওর জন্য বিশাল অর্জন। দোয়া করি, সে যেন কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারে।’ আহসানুল কবির : এইচএসসিতে জিপিএ ৫ অর্জন করেছে আহসানুল কবির। অথচ এটুকু পথ পাড়ি দিতে তাকে প্রতিনিয়ত মুখোমুখি হতে হয়েছে নানামুখী বাধাবিপত্তির। তবে সবচেয়ে বড় বাধার নাম দারিদ্র্য। এখন এই মেধাবীর লক্ষ্য মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়া। আর সেই পথ ধরে একজন চৌকস চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবা করা। রাজবাড়ীর কালুখালী উপজেলার মদাপুর ইউনিয়নের গোপালপুর গ্রামের আবদুস শুকুরের ছেলে কবির। দুই ভাই ও এক বোনের মধ্যে কবির সবার ছোট। কৃষিকাজ করে আবদুস শুকুরের পাঁচজনের পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস চাষের সামান্য জমি। কৃষিকাজে বাবাকে সব সময় সহায়তা করেন বড় ভাই কামরুল হাসান। তবে কবিরও বসে থাকেনি। লেখাপড়ার পাশাপাশি বাবার সঙ্গে মাঠের কাজে শরিক হয়েছে। কবির অবশ্য শিক্ষাজীবনের শুরু থেকেই মেধার পরিচয় দিয়ে আসছে। পিইসি ও জেএসসি পরীক্ষায় ট্যালেন্টপুলে বৃত্তিলাভ তার অদম্য মেধার স্বাক্ষর বহন করে। এরপর এসএসসি পরীক্ষায়ও বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ ৫ অর্জন করে। এই মেধাবীর অভিব্যক্তি, ‘সবারই একটা লক্ষ্য থাকে। আমারও আছে। একজন নামকরা চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন দেখি। সেই স্বপ্ন পূরণের প্রথম ধাপ হিসেবে মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছি। আমি সবার দোয়াপ্রার্থী।’ আবদুস শুকুর বলেন, ‘যাদের সহযোগিতায় আমার ছেলে ভালো ফল করেছে তাদের সবার কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’ রাজবাড়ী সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ জয়নুল আবেদীন জানান, সমাজের বিত্তশালী হৃদয়বান ব্যক্তিরা আহসানুল কবিরের মতো মেধাবী শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়ালে ওরা অনেকদূর যেতে পারবে।’ প্রতিবেদনের সরেজমিন তথ্য-উপাত্ত পাঠিয়েছেন কুমিল্লার দাউদকান্দি থেকে ওমর ফারুক মিয়াজী, কুড়িগ্রামের রৌমারী থেকে কুদ্দুস বিশ্বাস ও রাজবাড়ী থেকে জাহাঙ্গীর হোসেন।