ঢাকার খাল দখলমুক্ত করার উদ্যোগ

সিটি করপোরেশন ওয়াসা ও জেলা প্রশাসনের যৌথসভা

অবৈধভাবে দখলকৃত ঢাকার ৪৬টি খাল এবং জলাশয় পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নিয়েছে সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশন দখলকৃত এই সম্পত্তি পুনরুদ্ধার এবং দখলমুক্ত করার লক্ষ্যে দুই সপ্তাহের মধ্যে কার্যক্রম শুরু করতে ঢাকা জেলা প্রশাসক ও ঢাকা ওয়াসাকে অনুরোধ করেছে। সেই অনুযায়ী সরকারি খালের অবৈধ দখলদারদের তালিকা তৈরি করছে জেলা প্রশাসন।ঢাকার বেদখলকৃত খালের মধ্যে রয়েছে মান্ডা খাল, মেরাদিয়া খাল, নন্দিপাড়া খাল, কসাইবাড়ি খাল, হাজারীবাগ ও বাইশটোকি খাল, মাদারটেক ত্রিমোহনী খাল, বাসাবো খাল, বেগুনবাড়ি খাল, সেগুনবাগিচা খাল, মহাখালী খাল, রামচন্দ্রপুর খাল, আবদুল্লাহপুর খাল, কল্যাণপুর খাল, গোপীবাগ খাল, ঝিগাতলা-শুক্রাবাদ খাল। এছাড়া সূত্রাপুর-লোহারপুল হয়ে বুড়িগঙ্গা, উত্তরার-আবদুল্লাহপুর থেকে তুরাগ, উত্তরখান হয়ে তুরাগ, মোহাম্মদপুরের বছিলা হয়ে বুড়িগঙ্গা, খিলক্ষেত ডুমনি হয়ে বালু ও মানিকনগর হয়ে শীতলক্ষ্যা পর্যন্ত খালেরও অস্তিত্ব বর্তমানে প্রায় বিলীন। কল্যাণপুর, শ্যামলী, মোহাম্মদপুর আদাবর ও বায়তুল আমান হাউজিং এলাকা পর্যন্ত ছিল কল্যাণপুর খাল।জানা গেছে, গুলশান, বনানী, বাউনিয়া, দিয়াবাড়ী, কাঁটাসুর, ইব্রাহিমপুর, কল্যাণপুর, শাহজাপুুর খাল নামমাত্র টিকে থাকলেও সেগুলো ভূমিদস্যুদের থাবায় সংকুচিত হয়ে আসছে। রামপুরা-মেরাদিয়া খালও ভূমিদস্যুদের থাবায় ক্ষতবিক্ষত।এছাড়াও প্রায় ৯ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ‘ঢাকার খালগুলো থেকে বক্স কালভার্ট তুলে দিয়ে খালগুলো রক্ষা করতে হবে’_ নির্দেশনা বাস্তবায়নে সম্ভাব্যতা যাচাই করার জন্য তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হয়েছে। এই কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালককে। কমিটির দুই সদস্য হলেন ডিএনসিসি’র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও ঢাকার জেলা প্রশাসক।ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) মেয়র মোহাম্মদ সাঈদ খোকনের সভাপতিত্বে গত ৩ আগস্ট সংস্থার সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত এক সভায় জেলা প্রশাসন ও ঢাকা ওয়াসাকে অবৈধ দখলকৃত খাল উদ্ধারের দায়িত্ব দেয়া হয়। একই সঙ্গে ওই সভায় বক্স কালভার্ট তুলে দেয়া সংক্রান্ত কমিটি গঠন করা হয়।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে ঢাকার জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন সংবাদকে বলেন, ‘আমরা বেদখলকৃত খালগুলোর কাগজ, দলিলপত্র-পর্চার খোঁজখবর নিচ্ছি। অরিজিনাল কাগজ খুঁজছি। পাশাপাশি অবৈধ দখলদারদের তালিকাও করছি। এরপরই এভিশন ড্রাইভ (উচ্ছেদ অভিযান) পরিচালনা করা হবে।’ ডিএনসিসি সূত্র জানায়, ওইদিনের সভায় ঢাকার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শহিদুল ইসলাম জানান, ‘ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে মোট ৪৬টি খাল রয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগ পড়েছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে।’ তারা আরএস ও সিএস পর্চা দেখে খালগুলো চিহ্নিত করে পুনরুদ্ধারের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন বলে শহিদুল ইসলাম সভায় জানান।ওই সভায় ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী তাকসিন এ খান বলেন, ‘তাদের ২৬টি খালের উদ্ধার কাজ চলমান রয়েছে। অথপ্রাপ্তি সাপেক্ষে এটি চলমান থাকবে।’ এ সময় মেয়র সাঈদ খোকন ওয়াসার সঙ্গে আলোচনা করে আগামী দুই সপ্তাহের মধ্য খাল বা জলাশয়গুলো উদ্ধার বা দখলমুক্ত করার জন্য ঢাকার জেলা প্রশাসককে অনুরোধ করেন।এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম সংবাদকে বলেন, ‘বহুদিন ধরেই আমরা ঢাকার খালগুলো উদ্ধারের কথা বলে আসছি। এ ব্যাপারে হাইকোর্টেরও নির্দেশনা রয়েছে। খাল উদ্ধারের দায়িত্ব ঢাকা ওয়াসার। তারা খাল উদ্ধারের জন্য মাঝে-মধ্যে অভিযান পরিচালনা করলেও তা স্থায়ী হয় না। খাল উদ্ধারের কিছুদিন যেতে না যেতেই খালগুলো পুনরায় বেদখল হয়ে যায়।’অধ্যাপক নজরুল ইসলাম খালগুলো স্থায়ীভাবে উদ্ধারের উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘একদিকে ওয়াসা খাল পুণরুদ্ধার করছে, অন্যদিকে মানুষ ময়লা-বর্জ্য ফেলে খালগুলো দখল করে নিচ্ছে। এজন্য খাল উদ্ধারে ওয়াসাকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে।’বিশেষজ্ঞরা বলেন, খালগুলোর মাধ্যমে নগরীর পানি নিষ্কাশনের কথা থাকলেও আবর্জনা ও আবাসিক-অনাবাসিক ভবনের কারণে খালগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এতে সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয় রাজধানীতে। বেদখলকৃত খালগুলো পুনরুদ্ধার না করা হলে অদূর ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ জলাবদ্ধতা থেকে প্রায় এক কোটি বিল লাখ মানুষের ঢাকাকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। ১৯৮৯ সালে সরকারের গঠিত বন্যা নিয়ন্ত্রণ পরিকল্পনার তথ্য অনুযায়ী, বন্যা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীতে কমপক্ষে ২০ হাজার ৯৩ একর খাল থাকা দরকার।জানা গেছে, প্রায় ৯ বছর আগে ঢাকা ওয়াসায় এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ‘ঢাকা শহরের পানি অপসারণের অন্যতম প্রতিবদ্ধকতা হলো বক্স কালভার্ট।’ বক্স কালভার্টগুলো কিছুটা পরিষ্কার করার জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন বলে জানান ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক।পরিবেশবিদরা বলছেন, বিগত ৪০/৫০ বছরে রাজধানীর খালগুলো বেদখল হয়েছে। এর আগে ঢাকায় কোন জলাবদ্ধতা ছিল না। ঢাকার সার্বিক পরিবেশ ছিল স্বাস্থ্যসম্মত ও দূষণমুক্ত। খালগুলো বেদখল-ভরাটের কারণে হারিয়ে গেছে ঢাকার সেই চিত্র। খালগুলো দখল করে বহুতল ভবন নির্মাণ করেছেন প্রভাবশালী ব্যক্তিরা। এতে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা ও সুয়্যারেজ লাইনে বিপর্যয় ঘটে। প্রায়ই পরিবেশ বিপর্যয়ের কবলে পড়ে নগরবাসী।ঢাকার খালগুলোই পানি ও পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। ভূমিদস্যুরা মানুষের আবাসন ব্যবস্থা করার নামে রাজধানীর খালগুলো দখল করে গড়ে তুলছে বহুতল ভবন ও বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। অনেক ক্ষেত্রে সরকারের প্রশাসন এসব বিষয় সম্পর্কে অবহিত থাকলেও ভূমিদস্যুদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিবেশবিদরা দীর্ঘদিন ধরেই এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে খালগুলো পুনরুদ্ধারে দাবি জানিয়ে আসছেন।পরিবেশবিদরা বলছেন, প্রভাবশালীদের দ্বারা দখল অথবা আবর্জনায় ভরে যাওয়ার কারণে খালগুলোর প্রায় ১০ কিলোমিটার জায়গা পরিণত হয়েছে কংক্রিট বক্সে। এগুলো কেবল সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা ওয়াসার পক্ষে পরিষ্কার করা প্রায় অসম্ভব।যদিও বিগত সিটি করপোরেশন নির্বাচনের সময় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটির দুই মেয়রই খালগুলো পুনরুদ্ধারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। এখন তারা জেলা প্রশাসন কিংবা ঢাকা ওয়াসাকে খাল উদ্ধারের দায়িত্ব দিচ্ছেন।