চট্টগ্রামের পেয়ারার কদর মধ্যপ্রাচ্যে

পেয়ারা চাষ সৌভাগ্যের জাদু লাগিয়েছে দক্ষিণ চট্টগ্রামের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকায়। পেয়ারা চাষের সঙ্গে বেকার যুব সমাজ জড়িয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছে। দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশের কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, ছৈয়দাবাদ, পূর্ব এলাহাবাদ, লট এলাহাবাদ, দোহাজারীর রায়জোয়ারা, লালুটিয়ায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় ২০ হাজারের বেশি বাগানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পেয়ারা চাষ হচ্ছে। এসব পেয়ারা চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ হয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, স্বাদে-ঘ্রাণে অতুলনীয় এসব পেয়ারা চট্টগ্রামের গ-ি পেরিয়ে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশে রফতানি হচ্ছে।
দক্ষিণ চট্টগ্রামের শত শত শ্রমিক কয়েক মাইল পথ পাড়ি দিয়ে পাহাড় ও পাদদেশের বাগান থেকে বিশেষভাবে লালসালুতে মুড়িয়ে পেয়ারা নিয়ে বাজারে আসেন। লালসালুর পুঁটলিতে বাঁধা থরে থরে সাজানো পেয়ারার সারি দেখে ক্রেতা-বিক্রেতারা সহজেই আকৃষ্ট হন। তাছাড়া পেয়ারা চাষিদের মতে, কুদৃষ্টি পড়লে ফলন ভালো হয় না এবং স্বাদ ও সুগন্ধ কমে যায়। তাই লালসালুতে করে পেয়ারা বাজারে আনা হয়ে থাকে। চলে দরদাম-বেচাকেনা। দেশের বিভিন্ন স্থানে পেয়ারা কেজিদরে বিক্রি হলেও এখানে পাইকাররা শ’হিসেবে পেয়ারা কিনে বিক্রি করেন ডজন হিসেবে। মৌসুমের শুরুতে প্রতি ডজন পেয়ারা ৮০ থেকে     ১০০ টাকায় বিক্রি হয়। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, প্রচুর বৃষ্টিতে পাহাড় ও পাদদেশে নতুন পলিমাটি জমা হয়। এ পলিমাটি খুব উর্বর হওয়ায় পেয়ারা গাছের গোড়ায় কোনো ধরনের রাসায়নিক সার প্রয়োগ করতে হয় না। গাছে কোনো ধরনের কীটনাশকও ছিটানোর প্রয়োজন হয় না। এ কারণে এ এলাকার পেয়ারাকে স্বাস্থ্যসম্মত পেয়ারা বলা হয়। তাছাড়া চাষিরা ডাঁটা ও পাতাসহ এ পেয়ারা সংগ্রহ করে থাকেন। ফলে ফরমালিন এবং রাসায়নিকদ্রব্য মেশানো ছাড়াই চার থেকে পাঁচ দিন পর্যন্ত অনায়াসে সংরক্ষণ করা যায়।
সরেজমিন দেখা যায়, পটিয়া উপজেলার খরনা, কেলিশহর, হাইদগাঁও পাহাড়ি এলাকায় পাশের উপজেলা চন্দনাইশের কাঞ্চননগর, লট এলাহাবাদ, ধোপাছড়ি, হাশিমপুর পেয়ারা বাগানের গাছে গাছে প্রচুর ফলন হয়েছে। প্রতিটি গাছে ঝুলে থাকা থোকা থোকা পেয়ারা পাহাড়টিকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজিয়েছে। সবুজ পাতার ডালগুলো পেয়ারার ভারে হেলে পড়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য মতে, পটিয়া উপজেলায় প্রায় ২ হাজার একর পাহাড়ি ও সমতল জমিতে পেয়ারা চাষ হয়ে থাকে। বেসরকারিভাবে তা ৪ হাজার একরেরও বেশি। এসব এলাকায় ২৫ হাজারের অধিক বাগান রয়েছে বলে চাষিরা জানান। এছাড়া চন্দনাইশের কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, ছৈয়দাবাদ, পূর্ব এলাহাবাদ, লট এলাহাবাদ, দোহাজারীর রায়জোয়ারা ও লালুটিয়ায় ৩০ কিলোমিটার এলাকায় ২০ হাজারের বেশি বাগানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পেয়ারা চাষ হয়। গুণগতমানে চন্দনাইশে ১৩ ধরনের পেয়ারা উৎপাদিত হয়। এর মধ্যে কাঞ্চননগর ও মুকুন্দপুরী পেয়ারা খুবই পরিচিত এবং সুস্বাদু। এছাড়া এ এলাকায় বারি পেয়ারা-২ ও ৩, বাউ পেয়ারা-১, ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৮, ৯ এবং ইপ্সা পেয়ারা উৎপাদিত হয়। রয়েছে সাহেব ও মাথা পেয়ারাও।
চাষিরা জানান, এসব উৎপাদিত পেয়ারা বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে রওশনহাট, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল গেট, বাদামতল, বাগিচাহাট, খানহাট রেলস্টেশন, গাছবাড়িয়া কলেজ গেট, চা বাগান রাস্তার মাথা ও কমল মুন্সীরহাটÑ এসব এলাকার রাস্তার দুইপাশে বসে পেয়ারার পাইকারি বাজার। প্রতি বছর আষাঢ় থেকে ভাদ্র পর্যন্ত ৩ মাস এ বাজার নিয়মিত বসে। কৃষি অধিদফতর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আমিনুল হক জানান, এখানে প্রতি হেক্টরে ২০ টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়। এ অঞ্চলের চাষিরা পেয়ারা গাছে রাসায়নিক সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ছিটান না। তাছাড়া পেয়ারা সংরক্ষণেও কোনো ধরনের ফরমালিন বা মেডিসিন ব্যবহার করেন না।