ভাগ হচ্ছে ঢাকা ॥ তৃণমূলে সেবা পৌঁছানোর উদ্যোগ

ভবিষ্যতে আরও বিভাগ হবে ॥ জানালেন প্রধানমন্ত্রী ময়মনসিংহ বিভাগ উন্নয়ন পরিকল্পনা সংক্রান্ত সভায় প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপ আবাসিক এলাকায় অবশ্যই জলাধার নির্মাণ করতে হবে, ধরে রাখতে হবে বৃষ্টির পানি

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ওপর গুরুত্বারোপের পাশাপাশি দেশের সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করতে ভবিষ্যতের বিষয়টি মাথায় রেখে পরিকল্পনা প্রণয়নের ক্ষেত্রে আরও স্বচ্ছ এবং সুদূরপ্রসারী চিন্তা করার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন। ঢাকা বিভাগকে আরও ছোট করার পরিকল্পনার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, দুই দশক পর কী হতে পারে তা মাথায় রেখেই শহর বা অবকাঠামো উন্নয়ন পরিকল্পনা করতে হবে। কিছু হলেই যেন ঢাকায় ছুটতে না হয় সেজন্য ক্ষমতাকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে। বুধবার সকালে তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে নবগঠিত ময়মনসিংহ বিভাগের উন্নয়ন পরিকল্পনা সংক্রান্ত সভায় প্রধানমন্ত্রী নাগরিক সেবা বাড়াতে ঢাকা ভেঙ্গে আরও নতুন বিভাগ করার পরিকল্পনার কথা জানিয়ে বলেন, ঢাকা বিভাগকে ভেঙ্গে ময়মনসিংহ বিভাগ করা হয়েছে। আমাদের পরিকল্পনা আছে ঢাকাকে আরেকটু ছোট করে দেয়া। এতে জনগণের দোরগোড়ায় সেবাটা পৌঁছাতে পারব। কোন একটা কিছু হলেই ঢাকায় ছুটে আসতে হবে, এভাবে তো মানুষের সেবাটা নিশ্চিত করা যায় না।

কিছু হলেই রাজধানীতে ছুটে আসার সমালোচনা করে তিনি বলেন, ১৬ কোটি মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দিতে হলে আমাদের ক্ষমতাকে আরও বিকেন্দ্রীকরণ করা একান্ত প্রয়োজন। তাই তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটানোর মানসিকতা ত্যাগ করে চিন্তাটাকে আরও স্বচ্ছ, সুদূরপ্রসারী করতে হবে, দূরদর্শী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। তিনি বলেন, আমরা যখনই কোন পরিকল্পনা নেব তখন এটা মাথায় রাখতে হবে যে আজ থেকে ২০ বছর পর কতটা উন্নতি হতে পারে, কত জনসংখ্যা বাড়বে, কত মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়বে, কি হতে পারে সে বিষয়টা মাথায় রেখেই আমাদের পরিকল্পনা নেয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের দায়িত্ব বাংলাদেশের মানুষের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়া। তাঁর নেতৃত্বে সরকার গঠনের পর থেকে স্থানীয় সরকারগুলোকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে জনগণের কাছে সেবা পৌঁছে দেয়ার কাজ চলছে। এখন অনেক শহর এমন উন্নত হয়ে গেছে যে, ট্রাফিক জ্যাম হচ্ছে, বাইপাস করতে হচ্ছে। এসব চিন্তা-ভাবনা আমাদের শুরু থেকেই করা উচিত। ২০ বছর, ২৫ বছর পরে কী হবে সেটা মাথায় রেখেই আমাদের প্রত্যেকটা পরিকল্পনা নেয়া উচিত বলে মনে করি। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের উদ্দেশ্য করে তিনি বলেন, এটা আপনাদের কাছে আমার অনুরোধ, যখনই আমরা যে পরিকল্পনা নেব, এটা মাথায় রাখবেন যে, আজ থেকে বিশ বছর পর কতটা উন্নতি হতে পারে, জনসংখ্যা কতটা হবে এবং কী হতে পারে। অর্থনৈতিক কর্মকা- বাড়বে সে কথা মাথায় রেখেই কিন্তু আমাদের পরিকল্পনা নেয়া উচিত।

শেখ হাসিনা বলেন, ঢাকা বিভাগকে ইতোমধ্যে ভেঙ্গে ময়মনসিংহ, জামালপুর, শেরপুর ও নেত্রকোনা জেলা নিয়ে দেশের অষ্টম বিভাগ ময়মনসিংহ গঠন করা হয়। ঢাকা বিভাগ প্রতিষ্ঠার সময় থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চল ঢাকা বিভাগের অংশ ছিল। তিনি বলেন, আমাদের কিছু মানসিকতা এমন আছে যে, তাৎক্ষণিক বিষয়টাই শুধু চিন্তা করি। আমাদের এই চিন্তাটাকে স্বচ্ছ এবং সুদূরপ্রসারী করতে হবে। ভবিষ্যতে নগর সম্প্রসারণে ট্রাফিক জ্যামসহ জনসংখ্যা বাড়লেও অন্যান্য নাগরিক সুযোগ-সুবিধা যেন বজায় থাকে-সে বিষয়টা পরিকল্পনায় আনতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের ভৌগোলিক অবস্থানটা কোথায় সেটা মাথায় রেখে এবং জলাধার নির্মাণের বিষয়টি মাথায় রেখে আমাদের স্থাপনা নির্মাণ করতে হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোতেও জলাধার নির্মাণের নির্দেশ দিয়েছেন বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী।

আধুনিক ও পরিকল্পিত ময়মনসিংহ শহর গড়ে তোলার নির্দেশ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ময়মনসিংহ শহর একটা গুরুত্বপূর্ণ শহর ছিল। জায়গা পছন্দ করে দিয়েছি। আধুনিক, সুন্দর একটা শহর গড়ে উঠুক এটাই চাই। তিনি বলেন, ঢাকা বিভাগ বিশাল। এখানে ১৭ জেলা। ১৭ জেলায় কাজ করা অত্যন্ত কঠিন। সেবাটা নিশ্চিত করতে আমরা প্রশাসনিক কর্মকা-কে ছোট-ছোট করে ভাগ করে দেব। যাতে সেবাটা মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারে। তৃণমূলে সেবা পৌঁছাতে ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ ও স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ময়মনসিংহ বিভাগটা যখন করা হচ্ছে তখন ঠিক করলাম ব্রহ্মপুত্র নদের ওপারে সেটা করে দেব। কারণ শহর তো বাড়তে থাকে, সেখানে জায়গা পাওয়া যাবে আধুনিক স্থাপনা নির্মাণের, সেখানে আধুনিক দৃষ্টিনন্দন শহর গড়ে তুলতে পারি।

আধুনিক স্থাপনা নির্মাণ এবং নগরোন্নয়ন শহরের বাইরেই করা হয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও করা হয়েছিল কিন্তু ঢাকার বাইরে। জাতীয় তিন নেতার সমাধির সামনে ছিল ঢাকার প্রবেশদ্বার ‘ঢাকা গেট’। সেই ঢাকা গেটের নজির হিসেবে পুরনো স্তম্ভ এখনও রয়েছে। গ্রামে গড়ে তোলা হয়েছিল মহাখালী বক্ষব্যাধি হাসপাতাল। অথচ এখন সেখান থেকেও অত্যাধুনিক শহর আরও সামনে এগিয়ে গেছে। ধানম-ি ৩২ নম্বরের বাড়িতে ওঠার সময়কার স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, আমরা যখন ধানম-ির বাড়িতে আসি তখন আশপাশে ধানক্ষেত দেখতে পাওয়া যেত। কেউ এলে বলত ঢাকা থেকে এসেছি বা ঢাকায় যাচ্ছি সে সময় ধানম-িও ঢাকা বলে গণ্য হতো না। এখনতো ঢাকা প্রায় টাঙ্গাইল পর্যন্ত চলে গেছে, অচিরেই ময়মনসিংহ পর্যন্ত চলে যাবে। এভাবেই একটি শহর গড়ে ওঠে বলেও উল্লেখ করেন তিনি।

বৃষ্টির পানিকে সম্পদ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বৃষ্টির পানি সবচেয়ে নিরাপদ পানি। বছরে ৭-৮ মাস আমাদের দেশে প্রচুর বৃষ্টিপাত হয়। যেখানেই কোন আবাসিক এলাকা করা হবে, সেখানে জলাধার তৈরি করতে হবে এবং বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের জন্য সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। এ সময় তিনি বসুন্ধরা সিটি শপিংমলে আগুন লাগার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, বসুন্ধরাতে যখন আগুন লাগল, তখন আগুন নেভানোর জন্য পানি পাওয়া যাচ্ছিল না। পানি আনতে হলো সোনারগাঁও হোটেলের সুইমিং পুল থেকে। তাহলে কী আমাদের ভবিষ্যত সুইমিংপুলেই আটকে থাকবে?

স্মৃতি রোমন্থন করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বসুন্ধরায় আগুন লাগলে পানি না পাওয়া গেলেও আমরা ছোটবেলায় দেখেছি ঐ এলাকাটা ছিল একটা বিল। আর আজকের পান্থপথের জায়গাটি ছিল একটা খাল। সেখানে শাপলা ফুটতো, নৌকা চলত। এই খালটি ধানম-ি লেক হয়ে একদম নদী পর্যন্ত সংযোগ ছিল। কিন্তু সেখানে বক্সকালভার্ট করে দিয়ে খালটাকে শেষ করে দেয়া হলো। তিনি বলেন, খালটাকে মাঝে রেখে তার দুইদিকে রাস্তা করলে দেখতেও দৃষ্টিনন্দন হতো এবং যেকোন প্রয়োজনে স্থানীয় জলের চাহিদা পূরণ করে জলাবদ্ধতা দূর করতেও এটি ভূমিকা রাখতে পারত। অথচ সেখানে এমনভাবে স্থাপনা তৈরি হলো যে একটি বাড়িতেও আগুন লাগলেও আর পানি পাওয়া যাবে না। আবার স্থাপনা তৈরির সময় মাটিটার প্রতি ঠিকভাবে খেয়াল রাখা হয়নি বলে সুন্দরবন হোটেলটির চারপাশ দেবে যায় বলেও প্রধানমন্ত্রী উল্লেখ করেন।

শেখ হাসিনা বলেন, রাজধানীর সব খালগুলো দখল হয়ে যাওয়ায় আজ নগরবাসীর নানা দুর্ভোগ হচ্ছে শহরের তাপমাত্রা বেড়ে গেছে। সেগুনবাগিচার খালটির ওপর বক্সকালভার্ট করে খালটিকে শেষ করে দেয়া হলো মৎস্যভবনের পাশের রাস্তাটি করা হলো। শান্তিনগর খালটিও বন্ধ করে দেয়া হলো। তিনি বলেন, মতিঝিল, কেউ আর সেই ঝিল দেখেনি। কিন্তু আমরা দেখেছি, সেখানে নৌকায়ও চড়েছি। তিনি বলেন, সেখানকার বিশাল ঝিলটা আইয়ুব খান সরকার ক্ষমতায় এসে বন্ধ করে দিলেন।

জলাবদ্ধতা দূরীকরণে জলাশয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমাদের কার্যালয়ের (প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়) সামনে এক সময় পানি জমে থাকত। সে পানিও এয়ারফোর্সের নিজস্ব জায়গায় একটি পুকুর কেটে সেটা সরু একটি লেকের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে চ্যানেলের মাধ্যমে জমে থাকা পানি সেখানে সরানোর ব্যবস্থা করায় এখন আর বৃষ্টির পানি জমতে পারে না। শেখ হাসিনা এ সময় বঙ্গবন্ধুর ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সকলের সহযোগিতা কামনা করেন।

বৈঠকে অন্যান্যের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম অংশগ্রহণ করেন। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মোঃ আবুল কালাম আজাদ বৈঠকটি সঞ্চালনা করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব সুরাইয়া বেগম এবং প্রেস সচিব ইহসানুল করিম এ সময় উপস্থিত ছিলেন।