বাংলাদেশ এগিয়ে যাবে আপন মহিমায়

দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ আজ জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত। দেশের উন্নয়নের চাকাকে পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাচ্ছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা। তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানাতে চাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশকে ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না। তাকে সমহিমায় ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। ঘুরে দাঁড়াতে হবে আপনাকে, আমাকে, সবাইকে। ঠিক একাত্তরের মতো, অসীম সাহস আর উদ্দীপনা নিয়ে, জীবনকে তুচ্ছ করে বাঙালি জেগে উঠবে। রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-বাণিজ্যিক-জঙ্গি ও সন্ত্রাসী আগ্রাসনসহ সব ধরনের আগ্রাসন থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এত ত্যাগ সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে। আসুন আমরা বিভেদ, অনৈক্য, বিদ্বেষ ও হানাহানি ভুলে রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার ঊধর্ে্ব উঠে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাহসীকতার সঙ্গে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করি, নতুন করে দেশ গড়ার শপথ নিই। জয় আমাদের হবেই।

তৃতীয় বিশ্বের দেশ হলেও বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে গৌরবজনক এটি দেশ। এ গৌরবের অংশীদার প্রধানত এ দেশের খেটে খাওয়া জনগণ এবং সরকার। এ দেশের মানুষ পরিশ্রমী তবে বুদ্ধিমত্তা ও কৌশল অবলম্বন করে পরিশ্রম করতে পারে না। যার কারণে গাধার খাটুনি খেটেও উপযুক্ত পারিশ্রমিক বা ফল থেকে বঞ্চিত থাকে। দেশের অভ্যন্তরে যারা কাজ করেন দেশের উন্নয়নের জন্য, তাদের বিপুল অংশ শোষিত হয় মালিক শ্রেণির হাতে। এভাবে যারা বিদেশে কর্মরত তারাও নিরুপায় হয়ে গতর খাটেন এবং উপযুক্ত পারিশ্রমিক পান না। এ ছাড়াও দেশের নানান উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গেলে ব্যয়ের বড় অংশ অর্থবরাদ্দ লুটপাটের কবলে পড়ে। ফলে উন্নয়ন ব্যাহত হয়। সুশাসন না থাকার কারণে দেশের উন্নয়ন বার বার বাধাগ্রস্ত হয়। এর পাশাপাশি রাজনৈতিক অস্থিরতা তো আছেই। এত সংকট ও সীমাবদ্ধতার মধ্যে সাড়ে চার দশকে বাংলাদেশ আপন গতিতে এগিয়ে চলছে তার অভীষ্ট লক্ষ্যে।
‘৭২ সালের যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ আর ২০১৬ সালের বাংলাদেশ এক নয়। তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলেছিলেন আর সাবেক এক মার্কিন রাষ্ট্রদূত বলেছেন ‘এশিয়ার রাজা’। বলেছেন, ‘বাংলাদেশের মানুষের রক্তে মিশে আছে গণতন্ত্র। বাংলাদেশ অপার সম্ভাবনার দেশ।’ তলাবিহীন ঝুড়ির অভিযোগ এখন সাফল্যে পরিণত হয়েছে। যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে ছিল বড় বাধা। যারা মুক্তিযুদ্ধের সময় সপ্তম নৌবহর পাঠিয়েছিল বাংলাদেশকে পরাজিত করার জন্য তারাই আজ বাংলাদেশের প্রশংসা করছে। প্রশংসা শুনে আমরা নিজেদের দেশের ব্যাপারে আশাবাদী হয়ে উঠি। নানা সমস্যা আর সংকটের পাহাড় ঠেলে ঠেলে সামনের দিকে এগোচ্ছে বাংলাদেশ। এটা আমাদের জন্য বড় অর্জন। আমরা পরিশ্রমী আত্মবিশ্বাসী বলেই এগোতে পারছি। যে জাতি ভাষার জন্য রাজপথে রক্ত দিয়েছে, যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছে_ তাদের তো কোনোভাবেই পিছিয়ে থাকার কথা নয়। বাঙালি ইতোমধ্যে নানা দিকে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে।

বাংলার কৃষক মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে ফসল ফলিয়ে ১৬ কোটি মানুষের অন্নের জোগান দিচ্ছে। অথচ তারা ফসলের, শাক-সবজির ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। তার পরও তারা দেশের কৃষি অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি। এ দেশের শ্রমিকশ্রেণি দেশের অভ্যন্তরে যেমন বিভিন্ন গার্মেন্টে ও শিল্প-কারখানায় কাজ করে দেশের উন্নয়নে বিশেষ ভূমিকা রাখছে। একইভাবে এদের উল্লেখযোগ্য অংশ প্রবাসে কর্মরত থাকায় রেমিট্যান্স প্রবাহ অনেক বেড়েছে। বেড়েছে বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভও। তাহলে সহজেই বোঝা যাচ্ছে_ এ দেশের কৃষক ও শ্রমিক হচ্ছে উন্নয়নের প্রাণশক্তি। অথচ এরা নানাভাবে অবহেলিত, শোষিত ও বঞ্চিত হয়; যা উন্নয়নের ইতিবাচক ধারাকে ব্যাহত করে।
মনে রাখতে হবে সামষ্টিক উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন সম্মিলিত উদ্যোগ বা প্রয়াস। প্রয়োজন জাতীয় ঐকমত্য। আমাদের দুর্ভাগ্য যে ওই সংস্কৃতি আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এটা আমাদের জাতীয় ব্যর্থতা। এ অনৈক্যের মধ্যেও আমাদের দামাল ছেলেরা ক্রীড়া ক্ষেত্রে সাফল্য দেখিয়েছে, আমাদের তরুণ-তরুণীরা এভারেস্ট জয় করেছে, বর্তমান সরকারের আন্তরিক প্রচেষ্টায় পোলিওমুক্ত বাংলা হয়েছে, শিশু ও মাতৃ মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্য হারে কমেছে, বিপুল চাহিদার মধ্যে বিদ্যুৎ ঘাটতি অনেক কমেছে, রেকর্ড পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের ফলে। শিক্ষা ক্ষেত্রে সাফল্য এসেছে। আমরা প্রথমে মিয়ানমার এবং পরে ভারতের কাছ থেকে সমুদ্র জয় করেছি। আমাদের সেনাবাহিনী ও পুলিশ জাতিসংঘের শান্তিরক্ষী বাহিনীতে গিয়ে সাফল্যের পরিচয় দিয়েছে। তথ্যপ্রযুক্তিতে বাংলাদেশ এখন অনেক এগিয়ে। দেশের প্রায় তিন কোটি মানুষ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। আধুনিক ব্যাংক ব্যবস্থাপনা ও করপোরেট হাউসগুলো পুরোপুরিই তথ্যপ্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। বোনম্যারো প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সাফল্য দেখিয়েছে। পাট ও মহিষের জন্মরহস্য আবিষ্কৃত হয়েছে। এভাবে ধীরে ধীরে বাংলাদেশ তার অভীষ্ট লক্ষ্যে পেঁৗছাতে শুরু করেছে। এসব দেখেবুঝেই হয়তো বর্তমান সরকার বাংলাদেশকে ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ এবং ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিয়েছে। এ ঘোষণা বাস্তবায়ন কঠিন, তবে অসম্ভব নয়। আমরা যদি একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ না পেতাম তা হলে এই স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন সম্ভব ছিল না।
এ কথা সত্য যে, ভাষা আন্দোলনের পথ ধরেই এসেছে বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধ কোনো কাকতালীয় বিষয় নয় বরং পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ-নির্যাতনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ ২৪ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনের ফসল এই স্বাধীনতা। কোনো জাতি যখন স্বাধীনতা চায় তখন সে প্রত্যাশিত স্বাধীনতাকে ঠেকিয়ে রাখার শক্তি আর কারো থাকে না। ‘৭১-এ স্বাধীনতা অর্জনের বিষয়ে সমগ্র জাতি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়েছিল। কারণ বাঙালি চেয়েছিল স্বাধিকার তথা স্বায়ত্তশাসন। দেখেছিল স্বাধীনভাবে বেঁচে থাকার স্বপ্ন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ করতে হয়েছে দেশের আবালবৃদ্ধবনিতা সবাইকে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সংগ্রাম ও প্রজ্ঞার ফল আমাদের এই স্বাধীনতা। ৩০ লাখ প্রাণের বিসর্জন এবং আড়াই লাখ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে পৃথিবীর বুকে নতুন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। আমরা পেয়েছি লাল-সবুজের রক্তস্নাত পতাকা, যার নেতৃত্বে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
বিনম্র শ্রদ্ধায় পালিত হলো ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসে সবচেয়ে শোকাবহ ও বেদনার দিন এটি। ‘৭৫-এর এ দিনে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কিছু পথভ্রষ্ট জুনিয়র সামরিক অফিসার কর্তৃক সপরিবারে শাহাদাতবরণ করেন। বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাংলাদেশ নামক স্বাধীন সার্বভৌম ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতা। সমকালীন বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে নির্মম ট্র্যাজেডি বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-। যিনি স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক, তাকেই স্বাধীন দেশে প্রাণ দিতে হলো। ঘাতকের বুলেট তার প্রাণ কেড়ে নিল। এর চেয়ে মর্মপীড়াদায়ক ও দুঃখজনক ঘটনা বাংলার ইতিহাসে আর কী হতে পারে?
দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার মাধ্যমে সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্নকে স্থবির করে দিয়েছিল। সেই ষড়যন্ত্রকারীরা এখনো সক্রিয়। তারা স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের অগ্রযাত্রাকে আজো ব্যাহত করতে চায়। জঙ্গিবাদের বিস্তার সহ দেশের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের চেষ্টা চলছে। জঙ্গি সন্ত্রাসী কর্মকা-ের মাধ্যমে দেশকে অস্থিতিশীল করতে সক্রিয় রয়েছে একটি বিশেষ মহল। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার মাধ্যমে এই ষড়যন্ত্রকে রুখে দিতে হবে। যাতে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের মতো কোনো ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়। ১৫ আগস্টের জাতীয় শোক দিবসের বিভিন্ন কর্মসূচিতে এমন আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের নেতারা। তারা অবিলম্বে বিদেশে পলাতক বঙ্গবন্ধুর সাজাপ্রাপ্ত খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করতেও সরকারের প্রতি আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধু যে সুখী সমৃদ্ধ, আসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন, সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে সে স্বপ্নের সফল বাস্তবায়ন ঘটাতে হবে বলেও অনেকেই অভিমত ব্যক্ত করেন।
আন্তর্জাতিকভাবে চক্রান্ত করে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করা হয়েছে। এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়, বঙ্গবন্ধু বেঁচে থাকলে বাংলাদেশ এতদিনে ‘উন্নত দেশে’ পরিণত হতো। তবে আমাদের আনন্দের বিষয় হলো_ অনেক বছর পর হলেও বঙ্গবন্ধুর আত্মস্বীকৃত খুনিদের বিচার হয়েছে। খুনিদের একটি বড় অংশের ফাঁসির রায় কার্যকর করা হয়েছে। এই সরকারের উদ্যোগে বিদেশে পলাতক খুনিদের দেশে ফিরিয়ে এনে রায় কার্যকর করা হবে বলে আমাদের বিশ্বাস।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি। তিনি বলতেন_ ‘ফাঁসির মঞ্চে গিয়েও বলব, আমি বাঙালি, বাংলা আমার ভাষা, বাংলাদেশ আমার দেশ।’ বাঙালি ও বাংলাদেশের অবিসংবাদিত নেতা তিনি। পাকিস্তানের শুরু থেকেই তিনি বাঙালিদের স্বার্থের বলিষ্ঠ প্রবক্তা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। শুধু তাই নয়_ পাকিস্তান সৃষ্টির আগে থেকেই বাংলা ও বাঙালির স্বার্থরক্ষায় তিনি বলিষ্ঠ ভূমিকা ও অবদান রেখে আসছেন। জন্ম তার শুভক্ষণে শুভদিনে কিন্তু পরাধীনতার মধ্যে। দুই পর্বের পরাধীনতা ও শোষণ তাকে ভোগ করতে হয়েছে। প্রথমত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শোষণ দ্বিতীয়ত পাকিস্তানি শোষণ-নির্যাতন, জেল-জুলুম-হুলিয়া আরো কত কী। কোনো কিছুই দমাতে পারেনি তাকে। এমনকি মৃত্যুও ।
এ দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের নেতৃত্ব দিয়েছেন তিনি। জেল-জুলুম, নির্যাতন, হুলিয়া বহন করেছেন তিনি। পূর্ববাংলার শোষিত-বঞ্চিত-নিপীড়িত জনগণকে স্বাধীন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখিয়েছেন তিনিই এবং প্রতিষ্ঠাও করেছেন তিনি। তিনি না হলে তো এ দেশ স্বাধীনই হতো না। যুগে যুগে কিছু মহাপুরুষ পৃথিবীতে আসেন কোনো কোনো জাতির ত্রাণকর্তা হিসেবে। বঙ্গবন্ধুও তেমনি একজন। মহাপুরুষদের মধ্যে মানবিকতা ও সরলতা এ দুটি গুণ অতিমাত্রায় থাকে। যার কারণে দেশ এবং দেশের মানুষের প্রতি থাকে তাদের সীমাহীন আস্থা ও ভালোবাসা। বঙ্গবন্ধুরও তেমনটা ছিল। এই আস্থা ও ভালোবাসাই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সাধারণ মানুষকে কাছে টানা ও সম্মোহন করার ক্ষমতা ছিল তার অসীম। এমন অসীম ক্ষমতার অধিকারী মানুষ বাংলাদেশে আর একজনও জন্মগ্রহণ করেননি
বাংলাদেশ সৃষ্টির পূর্বাপর দুটি ঘটনা কোনোভাবেই সাধারণ চোখে দেখার সুযোগ নেই। একটি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং অন্যটি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা। জীবনের মায়া ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধে আপামর বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এবং মরণপণ লড়াই করে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনা। এ সমষ্টিগত অসাধ্য কাজটি দ্বিতীয়বার করা বাঙালি জাতির পক্ষে আর সম্ভব নয়। সেই দেশপ্রেম আর আবেগের সংমিশ্রণ ঘটানোও আর সম্ভব নয়। আজ একুশ শতকে এসে আরো একটি মুক্তিযুদ্ধ করাও আর আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তাই মুক্তিযুদ্ধকে সাধারণ চোখে দেখা ও বিবেচনা করা অন্যায়। ঠিক তেমনি পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টকেও সাধারণ চোখে দেখা অন্যায়। বাঙালি কতখানি নিষ্ঠুর ও ক্ষমতা-অন্ধ হলে এমন ঘটনা ঘটাতে পারে তা ভাবতেও গা শিউরে ওঠে।
বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি আমরণ সংগ্রাম করে গেছেন। তিনি স্বপ্ন দেখতেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত বাংলাদেশের। অথচ স্বাধীনতার ৪৫ বছরেও তার স্বপ্নের বাংলাদেশ আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। এর মূল কারণ রাজনৈতিক বিদ্বেষ, দলীয় সংকীর্ণতা ও হানাহানি। যে বাঙালির জন্য তার স্বপ্ন ও সংগ্রাম ছিল, ওই বাঙালিরই একটি অংশ তাকে বাঁচতে দিল না। বঙ্গবন্ধুর অপরাধ কি এত বেশি ছিল যে তাকে সপরিবারে হত্যা করতে হবে? এর চেয়ে দুঃখ আর পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে? তাতে কি দেশের কোনো লাভ হয়েছে? দেশ প্রগতিশীল ধারা থেকে প্রতিক্রিয়াশীল ধারায় ফিরেছে। রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধীদের উত্থান ঘটেছে। আধুনিক ও গণতান্ত্রিক বিশ্বের কাছে আমরা ছোট হয়ে গেছি।
এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, বঙ্গবন্ধুর জন্ম না হলে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেতাম না। কারণ বাঙালির স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসন প্রশ্নে নেতৃত্ব দেয়ার মতো যোগ্য লোক পূর্ববাংলায় দ্বিতীয়জন ছিলেন না। আমাদের আজো পশ্চিম পাকিস্তানিদের গোলামি করতে হতো। আজ যে বাঙালিরা স্বাধীন দেশে রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে আসীন আছেন, স্বাধীনভাবে কাজ করছেন, মুক্ত বাতাসে ইচ্ছামতো ঘুরে বেড়াচ্ছেন_ এর কোনো সুযোগ ছিল না।
দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ আজ জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদে আক্রান্ত। দেশের উন্নয়নের চাকাকে পেছনের দিকে ঘুরিয়ে দিতে চাচ্ছে দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা। তারা বাংলাদেশকে ব্যর্থ রাষ্ট্র বানাতে চাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশকে ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না। তাকে সমহিমায় ঘুরে দাঁড়াতেই হবে। ঘুরে দাঁড়াতে হবে আপনাকে, আমাকে, সবাইকে। ঠিক একাত্তরের মতো, অসীম সাহস আর উদ্দীপনা নিয়ে, জীবনকে তুচ্ছ করে বাঙালি জেগে উঠবে। রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক-বাণিজ্যিক-জঙ্গি ও সন্ত্রাসী আগ্রাসনসহ সব ধরনের আগ্রাসন থেকে আমাদের মুক্ত হতে হবে। তা না হলে বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। এত ত্যাগ সংগ্রাম আর রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতা অর্থহীন হয়ে যাবে। আসুন আমরা বিভেদ, অনৈক্য, বিদ্বেষ ও হানাহানি ভুলে রাজনৈতিক সঙ্কীর্ণতার ঊধর্ে্ব উঠে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সাহসীকতার সঙ্গে জঙ্গি ও সন্ত্রাসবাদ মোকাবেলা করি, নতুন করে দেশ গড়ার শপথ নিই। জয় আমাদের হবেই।