সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল হচ্ছে ফেনী-মিরসরাইয়ে

মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে পার্শ্ববর্তী জেলা ফেনীর সোনাগাজী উপজেলার উপকূলীয় এলাকা। নতুন জেগে ওঠা চর মিলিয়ে এই দুই উপজেলায় গড়ে উঠবে দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল। যার আয়তন হবে ৩০ হাজার একর। ইতিমধ্যে ১৩ হাজার একর জমি বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (বেজা)। এর মধ্যে ফেনী অঞ্চলের পাঁচ হাজার একর জমিও আছে। বাকি জমি অধিগ্রহণের জন্য মাঠপর্যায়ের জরিপ শুরু হয়েছে। আগামী বছরের মাঝামাঝি দৃশ্যমান হয়ে উঠবে পুরো প্রকল্পটি। এর ফলে প্রায় ২০ লাখ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলে। খুলে যাবে অর্থনীতির নতুন দিগন্ত। জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘মিরসরাইয়ের মতো ফেনী অঞ্চলেও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে ভূমি উন্নয়নকাজ শুরু হবে। এ জন্য খুব সহসা দরপত্র আহ্বান করা হবে।’ শুরুতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য শুধু মিরসরাই উপজেলার উপকূলীয় এলাকাকে বিবেচনায় আনা হলেও পরবর্তী সময়ে পার্শ্ববর্তী ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার উপকূলীয় এলাকা ও জেগে ওঠা নতুন চরও যুক্ত করা হয়। মিরসরাইয়ের অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ভূমি অধিগ্রহণ আগেই সম্পন্ন হয়েছে। এবার ফেনী জেলার সোনাগাজী উপজেলার দক্ষিণে উপকূলীয় এলাকায় প্রস্তাবিত বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ভূমি অধিগ্রহণের কাজও শুরু হয়েছে। মূলত বঙ্গোপসাগর, ফেনী নদীর মোহনায় জেগে ওঠা চরেই হচ্ছে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি। শুধু এই অঞ্চলেই ২০ হাজার একর জমি অধিগ্রহণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে গত ৭ আগস্ট থেকে চলছে মাঠ জরিপের কাজ। ইতিমধ্যে একসঙ্গে পাঁচ হাজার একর জমি বেজাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান বলেন, ‘আগামী দুই বছরের মধ্যে মিরসরাইয়ের চার হাজার একর জমি বিনিয়োগ উপযোগী হবে। এই সময়ের মধ্যে আনোয়ারা উপজেলায় অবস্থিত ৮০০ একরের চায়না অর্থনৈতিক অঞ্চলও তৈরি হয়ে যাবে। মিরসরাই-ফেনী অর্থনৈতিক অঞ্চলটি বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চল তথা পুরো দেশের অর্থনীতিতেই ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। আশা করছি শুধু কর্মসংস্থানই সৃষ্টি হবে ২০ লাখ থেকে ২৫ লাখ। তবে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি পরিবেশগত দিক বিবেচনা করেই প্রতিষ্ঠা করা হবে। এখানে লেক, জলাধার, বিনোদন পার্ক যেমন থাকবে, তেমনি স্কুল-কলেজ এমনকি শ্রমিকদের আবাসনের ব্যাপারটিও বিশেষ বিবেচনায় আছে। শুধু এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য আলাদা বন্দর নির্মাণ করা হবে।’ বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান আরো বলেন, ‘মিরসরাইয়ে ৫৫০ একর জমির জন্য ইতিমধ্যে দরপত্র সম্পন্ন হয়েছে। দেশের শীর্ষ শিল্পপ্রতিষ্ঠান বসুন্ধরা গ্রুপ, পাওয়ারটেক, এনার্জিপ্যাক, ইনসেপ্টার মতো ব্যবসায়িক গ্রুপগুলো এতে অংশগ্রহণ করে। আগামী মাসেই এই দরপত্র কারা পাচ্ছে তা আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হবে।’ বাংলাদেশ রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা কর্তৃপক্ষের (বেপজা) আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাদের এক হাজার থেকে এক হাজার ২০০ একর জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদন সাপেক্ষে আগামী মাসেই এই বরাদ্দ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এ ছাড়া দুটি ব্লকে আরো এক হাজার ৩০০ একর জমির জন্য এ বছরেই দরপত্র আহ্বান করা হবে বলে পবন চৌধুরী জানান। এ ছাড়া স্টিল মিল, বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো বৃহৎ শিল্প-কারখানাগুলোকে দরপত্রের মতো দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ায় না গিয়ে সরাসরি বরাদ্দ দেওয়ার ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করছে বেজা। সরকারের উচ্চপর্যায়ে এটি নিয়ে আলোচনা চলছে। বেজার এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মিরসরাইয়ে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে গ্যাস সংযোগ নিয়ে যাবে কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কম্পানি লিমিটেড। এক হাজার ১৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে তিন লেনের সড়ক নির্মাণ করছে সড়ক ও জনপথ বিভাগ। এ বছর অর্থনৈতিক অঞ্চল তীরবর্তী ১২ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণকাজ চলছে। পরবর্তী সময়ে আরো ২৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণ করা হবে। সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে ৭০ হাজার একর জমি শিল্পায়নের উপযোগী করে গড়ে তোলা হবে বলে বেজার এই শীর্ষ কর্মকর্তা জানান। এ প্রসঙ্গে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের লক্ষ্য এক লাখ একর জমিকে অর্থনৈতিক অঞ্চলের আওতায় আনা। যাতে আগামী ৫০ বছর শিল্পায়নের জন্য জমি নিয়ে চিন্তা করতে না হয়, বরং কিভাবে এত বিশাল অঞ্চলজুড়ে বিনিয়োগ হবে সেটা নিয়েই ব্যস্ত থাকতে হবে।’ ফেনী জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সোনাগাজীর আমিরাবাদ ও সদর ইউনিয়নের ৬৯ নম্বর খোয়াজের লামছি মৌজায় ১৫৪৩ একর, ৭০ নম্বর চরখোয়াজের লামছি মৌজায় ১৮৮ দশমিক ৮৮ একর, ৯৪ নং খোন্দকার মৌজায় ১৯৬১ দশমিক ৯২ একর, ৯৪/১০৩ নম্বর দক্ষিণ চরখন্দকার মৌজায় ১৫৭৯ একর, ৯৩ নম্বর বাহিরচর মৌজায় ৬২৮ দশমিক ৯৯ একর, ২৩২ নম্বর চররামনারায়ণ মৌজায় ১৩১৮ একর ভূমি নির্বাচন করা হয়েছে। যেসব চরে এখনো জরিপ হয়নি, সেগুলো পর্চা ম্যাপের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জরিপ হওয়া জমির মধ্যে ইতিমধ্যে প্রায় সাড়ে সাত হাজার একর অর্থনৈতিক অঞ্চল করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সোনাগাজী উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) বিদর্শী সম্বৌধি চাকমা জানান, ইতিমধ্যে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়ের সচিব প্রস্তাবিত সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত স্থান চরচান্দিয়ার পূর্ব বড়ধলী পরিদর্শন করেন। বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের জন্য প্রায় এক হাজার একর ভূমি অধিগ্রহণ চলছে এবং শিল্পাঞ্চলকে ঘিরে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নয়নের লক্ষ্যে ২৪৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে সোনাপুর থেকে সোনাগাজী হয়ে জোরারগঞ্জ সড়কের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে একনেক।