সিঙ্গাপুরের আদলে গড়ে তোলা হবে পায়রা বন্দরকে

যাত্রা শুরু করেছে পায়রা সমুদ্রবন্দর। সিঙ্গাপুরের আদলে বাংলাদেশের তৃতীয় এ পায়রা সমুদ্রবন্দরকে গড়ে তোলা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ। সব আধুনিক সুবিধা থাকবে এ বন্দরকে ঘিরে। গভীরতা থাকায় বিভিন্ন দেশ থেকে আসা মাদার ভেসেল থেকে সরাসরি বন্দরে পণ্য খালাস করা যাবে।

বিদেশী ব্যবসায়ীদের মতে, বাংলাদেশে সরাসরি বিদেশী বিনিয়োগ বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে এ সমুদ্রবন্দর। তবে এ বন্দরের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার সবটুকু কাজে লাগাতে আন্তঃদেশীয় যোগাযোগসহ সব ধরনের অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর জোর দিচ্ছেন অর্থনীতি বিশ্লেষকরা। আর নৌপরিবহনমন্ত্রী জানালেন, গভীর সমুদ্রবন্দরের প্রয়োজনীয়তাকে গুরুত্ব দিয়েই বাস্তবায়ন করা হবে সব ধরনের পরিকল্পনা।

সমুদ্র পথে পণ্য আমদানি-রফতানির চাপ মোকাবেলায় ২০১৩ সালের শেষদিকে শুরু হয় বাংলাদেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রার অবকাঠামো নির্মাণ কাজ। এর আড়াই বছরের মাথায় চালু হলো বন্দরটির প্রথম ধাপের পণ্য খালাস কার্যক্রম।

বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের বাণিজ্য প্রসারে এ বন্দর বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে বলে মনে করছে প্রথম বন্দর ব্যবহারকারী চীনা প্রতিষ্ঠান এশিয়া প্যাসিফিক জেরাল্ডটন লিমিটেড। প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক ফেলিক্স গাও বলেন, ‘আমার মনে হয় এ অঞ্চলের বাণিজ্য প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে পায়রা। আমাদের দেশ থেকে আরও কয়লা ও ছোট ছোট পাথর এ বন্দরের মাধ্যমে পাঠানোর পরিকল্পনা করেছি আমরা। স্বাভাবিকভাবেই বাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে সহায়ক হবে এ বন্দরকেন্দ্রিক পরিকল্পনা।’

ভৌগোলিকভাবে খুবই গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অবস্থিত বাংলাদেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর পায়রা। এমনটা দাবি করে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, এ বন্দরের মাধ্যমে বাংলাদেশের আশপাশের দেশসমূহে পণ্য পরিবহন করা যেমন সহজ হবে, তেমনি সমুদ্রকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থা সিল্ক রুটের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে বিবেচিত হতে পারে এ বন্দরটি। তবে এজন্য খুব দ্রুততর সময়ের মধ্যে উন্নয়ন করতে হবে সার্বিক যোগাযোগ অবকাঠামোর। এ প্রসঙ্গে সিপিডির অতিরিক্ত গবেষণা পরিচালক ড. গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, শুধু বন্দরকেন্দ্রিক অবকাঠামো উন্নয়ন করলে হবে না। এর সঙ্গে আনুষঙ্গিক আরও যেগুলো দরকার সেগুলোর উন্নয়ন করতে হবে। তিনি বলেন, পূর্ণাঙ্গ বন্দর হিসেবে গড়ে উঠার পর আশপাশের দেশগুলো এ বন্দরের মাধ্যমে ট্রানজিট সুবিধা গ্রহণ করতে পারবে।

পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, আউটার এ্যাংকরেজ থেকে রায়নাবাদ চ্যানেলে ঢোকার পথে পানির সর্বনিম্ন গভীরতা ৫ মিটার এবং ভেতরে ১৬ থেকে ২১ মিটার। চ্যানেলের ৩৫ কিলোমিটার এলাকার ড্রেজিং শেষ হলে ২৫০ মিটার দৈর্ঘের জাহাজ অনায়াসে আসা-যাওয়া করতে পারবে।

এ প্রসঙ্গে পায়রা সমুদ্রবন্দরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ক্যাপ্টেন সাইদুর রহমান বলেন, প্রাকৃতিকভাবে খুবই নিরাপদ জায়গা এটি। ভেতরে গভীরতা ১৬ থেকে ২৫ মিটার পর্যন্ত আছে। ন্যাচারালিই এটা খুবই ভাল একটি বন্দর। আমাদের শুধু চ্যালেঞ্জ হচ্ছে মোহনার প্রতিবন্ধকতা। ড্রেজিং ঠিকভাবে সম্পন্ন করতে পারলে এটাকে গভীর সমুদ্রবন্দরে আমরা রূপান্তর করতে পারব।

নৌপরিবহনমন্ত্রী শাজাহান খান বলেন, এ প্রজেক্টটা হলো ১৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের। আমরা ১১২৮ কোটি টাকা এরই মধ্যে বরাদ্দ পেয়েছি, ২০১৮ সালের মধ্যে আমরা এগুলোর কার্যক্রম শুরু করব। গভীর সমুদ্রবন্দর করার জন্য যে গভীরতা দরকার সেটি করার জন্য আমরা এরই মধ্যে বেলজিয়ামের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছি। তিনি বলেন, পায়রাকে গভীর সমুদ্রবন্দরের উপযোগী করতে রাবনাবাদ চ্যানেল খননের পাশাপাশি কয়লা ও এলএনজি টার্মিনালসহ সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ করা হবে।

পটুয়াখালীর কলাপাড়া উপজেলার লালুয়া ইউনিয়নে রাবনাবাদ চ্যানেলের পশ্চিম তীরে গড়ে উঠছে বাংলাদেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর ‘পায়রা’। বঙ্গোপসাগরের পোতাশ্রয় মুখ থেকে মাত্র ৫ কিলোমিটার দূরে এর অবস্থান। প্রাথমিকভাবে ৬ হাজার একর জমির ওপর গড়ে তোলা হচ্ছে এ বন্দর। গত শনিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সীমিত আকারে চালু হয়েছে এ বন্দরের কার্যক্রম। ২০২৩ সালের মধ্যে চ্যানেলের ১৬ মিটার গভীরতার ড্রেজিং হলে ওই বছর থেকেই পূর্ণাঙ্গ বন্দরের রূপ লাভ করবে পায়রা সমুদ্রবন্দর।