ইউরোপে রপ্তানি হচ্ছে নরসিংদীর লেবু

জেলায় কলম্বো লেবু চাষ বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এ লেবু উৎপাদনের জন্য এলাকাটির মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী হওয়ায় এখন ব্যাপকহারে চাষ হচ্ছে এটি। জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর বলেছে, ২০০২ সালের পর থেকে এ জেলায় কলম্বো লেবু চাষ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। জেলার পাঁচটি উপজেলায় মোট ৬শ’ হেক্টর জমিতে কলম্বো লেবু চাষ হচ্ছে। জেলায় এ বছরে ১০ হাজার টনের বেশি লেবু চাষ হয়েছে।জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক লাতাফাত হোসেন বলেন, জেলার কৃষকরা এ বছরে বিপুল পরিমাণ কলম্বো লেবু উৎপাদন করেছে এবং তারা তাদের উৎপাদিত লেবুর কাঙ্ক্ষিত মূল্যও পেয়েছেন। তিনি বলেন, দেশে এবং বিদেশে বিশেষ করে ইউরোপের দেশসমূহে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতের লেবুর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। চলতি মওসুমে লেবু চাষ এবং বিক্রয় করে চাষি ও ব্যবসায়ীরা বেশ খুশি। কলম্বো লেবু স্থানীয় বাজারে আকার ও মান ভেদে দুই হাজার টাকা থেকে তিন হাজার টাকা মণ দরে বিক্রয় হচ্ছে।উপ-পরিচালক বলেন, জেলা থেকে এ বছর প্রায় আড়াই হাজার টন কলম্বো লেবু বিদেশে রপ্তানি করা হচ্ছে। এছাড়া প্রতিদিন ঢাকা, চট্টগ্রাম ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিপুল পরিমাণ লেবু সরবরাহ হচ্ছে।জেলার শিবপুর উপজেলার দত্তরগাঁও গ্রামের খন্দকার মাহবুব বলেন, এ বছর তিনি ১২০ ডেসিমেল জমিতে লেবু চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন। এ জমিতে ২২০ মণ লেবু উৎপাদিত হয়েছে এবং এই লেবু তিনি বিক্রয় করে ৪ লাখ টাকা আয় করেছেন।জেলার রায়পুর উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের চাষি বাবুল চৌধুরী এ বছরে ৪০০ ডেসিমেল জমিতে লেবু চাষ করে ভালো ফলন পেয়েছেন। তিনি বলেন, এ বছর তিনি ৮ লাখ টাকা লেবু বিক্রয় করেছেন।জেলায় মাহাবুব ও বাবুলের মতো অনেকেই লেবু চাষ করে ভাগ্য ফিরিয়েছেন।বাড়ছে পাহাড়ি কদর : জেলার পটিয়া, বোয়ালখালী ও চন্দনাইশ উপজেলার বিস্তীর্ণ পাহাড়ি জমিতে উৎপন্ন ‘কাগজি লেবু’ এখন দেশ ছাড়িয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। বেশ জনপ্রিয় এবং ভিটামিন-সি সমৃদ্ধ এ লেবুর চাহিদা বিদেশেও দিন দিন বাড়ছে। তবে পুষ্টি, অপেক্ষাকৃত বড় ও দেখতে সুন্দর_ এমন লেবুর রপ্তানি সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। তাই রপ্তানিযোগ্য মানসম্পন্ন লেবু উৎপাদনের জন্য সরকারের কাছে ‘বিশেষায়িত অঞ্চল’ প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়েছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা।চলতি মৌসুমে লেবুর বেশ ভালো ফলন হয়েছে। বর্ষার শুরুতে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় লেবুর বাম্পার ফলন হয়েছে বলে জানিয়েছেন চাষিরা। অন্যদিকে লেবুর ন্যায্য দাম পেয়ে কৃষকেরাও মহাখুশি। রমজান, ঈদ ও আবহাওয়া গরমের কারণে লেবুর চাহিদা থাকায় চাষি ও খুচরা বিক্রেতারা আর্থিকভাবে লাভবান হয়েছেন।তিন উপজেলার প্রায় ২৫ হাজার একর পাহাড়ি জমিতে বাণিজ্যিকভাবে ‘কাগজি লেবু’ নামের বিশেষ জাতের এ লেবুর চাষ সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে। এছাড়া পাতি, এলাচি, বাতাবি ও সিডলেস_ এ ৪ জাতের লেবুও চাষ হয়। চৈত্র-বৈশাখ মাসে লেবুর ফুল আসে। আষাঢ়-শ্রাবণে লেবুর ভরা মৌসুম। চাষি ও পাইকারি ব্যবসায়ী ছাড়াও ৭-৮ হাজার খুচরা ব্যবসায়ী লেবু বিপণনের সঙ্গে জড়িত। সবমিলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের লেবু চাষে প্রায় ১০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে।আশির দশকে দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাহাড়ি এলাকায় কাগজি লেবু চাষ শুরু হয়। ধীরে ধীরে পটিয়া উপজেলার খরনা, হাইদগাঁও, কেলিশহর, চন্দনাইশ উপজেলার কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, বোয়ালখালী উপজেলার করলডেঙ্গা, জ্যৈষ্ঠপুরা ও কানুনগো পাড়ার পাহাড়ি এলাকার লাভজনক লেবুচাষ সমপ্রসারণ হতে থাকে। বাণিজ্যিকভাবে লেবু উৎপাদনে সাফল্যের কারণে উলি্লখিত গ্রামগুলোকে লেবু গ্রামও বলে থাকেন অনেকে। লেবু মৌসুমে পটিয়ার কমলমুন্সির হাট এবং বোয়ালখালী-চন্দনাইশে পাইকারি লেবু বিক্রির হাট বসে।শ্রীমঙ্গলের কাগজি লেবু রপ্তানি : কাগজি লেবুর চাষাবাদ লাভ জনক হওয়ায় সিলেটের শ্রীমঙ্গলসহ মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলায় কাগজি লেবু চাষের প্রতি চাষিদের উৎসাহ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সিলেট বিভাগের বাণিজ্যিক কেন্দ্র শ্রীমঙ্গলে এখন কাগজি লেবুর ব্যাপক সমারোহ। এখান থেকে লাখ লাখ কাগজি লেবু ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ট্রাক বোঝাই করে নিয়ে যাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা।বিভিন্ন প্রসাধনী ও কেমিক্যাল কোম্পানিগুলো কিনে নিচ্ছে কাগজি লেবু। তাছাড়া বেভারেজ কোম্পানিও লেমন কোল্ড ড্রিঙ্কসের জন্য বিপুল পরিমাণ কাগজি লেবু ক্রয় করছে। বছরের সব সময় কাগজি লেবু উৎপাদন হলেও মৌসুমে উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে যায় কয়েকগুণ। ফলে মৌসুমে কাগজি লেবুর দামও অনেক হ্রাস পায়। প্রতি বছরে শ্রীমঙ্গলে কমপক্ষে ৫০ কোটি টাকার কাগজি লেবু বেচাকেনা হয়ে থাকে। দেশের চা শিল্পাঞ্চল মৌলভীবাজার জেলার প্রধান অর্থকরী ফসল চায়ের পরেই কাগজি লেবুর স্থান। টিলা ও সমতল ভূমিতে কাগজি লেবুর বাগান দিগন্ত বিস্তৃত। উঁচু-নিচু পাহাড়ি টিলা, পাহাড়ের ঢালু, ফসলি জমির মাঠ, বাড়ির আঙিনাসহ আনাচে কানাচে গড়ে উঠেছে কাগজি লেবুর বাগান।