বিদেশিদের পায়ে বাংলাদেশি জুতা

ইউরোপের সবচেয়ে বড় জুতা বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ডাইচম্যান। ওই অঞ্চলের বিভিন্ন দেশ ও যুক্তরাষ্ট্রে তাদের তিন হাজার আটশরও বেশি শোরুম রয়েছে। জার্মানিভিত্তিক এ প্রতিষ্ঠানটির জন্য সিনথেটিক ও চামড়ার জুতা তৈরি হচ্ছে অ্যাপেক্স, বেঙ্গল, আর্থ, ফরচুনা, জিল ওয়্যার ও ল্যান্ডমার্ক ফুটওয়্যারের কারখানায়। এসব কারখানায় ডাইচম্যানের জনপ্রিয় ফিফথ এভিনিউ, এএম সুজ, ফিলা, গ্রেসল্যান্ড, ল্যান্ডলোভার, আগাক্সি, বারেনসচু, ক্যাটওয়াক, ক্লাউডিও কন্টি, কাপকেক কউট্রু, ভেনিস, ভিক্টরি, ভিটিওয়াই ও গালুসের মতো ব্র্যান্ডের জুতা তৈরি হচ্ছে। কারখানাগুলোয় কাজ করছেন লাখো কর্মী।

বাংলাদেশি চামড়ার মান ভালো; তাই শুরু থেকেই বিদেশের বাজারে চাহিদা ছিল। সস্তা শ্রম ও নিজস্ব চামড়ার কারণে দেশে তৈরি চামড়ার পণ্যও অল্প দিনেই বিদেশি ক্রেতাদের নজর কাড়ে। চামড়াপণ্যের মধ্যে ইতিমধ্যে বিশ্ববাজারে শক্ত অবস্থান সৃষ্টি করেছে জুতা। ইউরোপ-যুক্তরাষ্ট্রের সেরা ব্র্যান্ডের জুতার শোরুমে স্থান পাচ্ছে দেশে তৈরি জুতা। শুধু চামড়ারই নয়, রয়েছে সিনথেটিক জুতাও। দেশের কারখানাগুলোয় বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠানগুলোর জুতা তৈরি হওয়ায় প্রতি বছরই বাড়ছে রফতানি। এরইমধ্যে রফতানির শীর্ষ দশ পণ্যের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে জুতা। সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন, বিশ্ব জুতাশিল্পে শিগগিরই নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ। তারা এও বলছেন, সুযোগ ও সম্ভাবনাগুলো যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারলে দেশের জুতা শিল্প পাঁচ বছরেই দেড়শ’ কোটি ডলারে নেওয়া যাবে।

অন্যদিকে এইচঅ্যান্ডএম ও নোভির মতো ব্র্যান্ডের জুতা প্রস্তুত করে ফরচুনা ফুটওয়্যার। চট্টগ্রামে অবস্থিত কোরিয়ান কোম্পানি ইয়াঙ্গনে তৈরি হচ্ছে টিম্বারল্যান্ড, পুমা, ডেকাতেলান, নর্থ ফেস ও পাটাগোনিয়া ব্র্যান্ডের জুতা। তামারিজ ও এস্প্রিট ব্র্যান্ডের জুতা হচ্ছে

বল্গু ওশানে।

বিডটজেডডট মোডা, হিউম্যানিক, রিগ্যালের ব্র্যান্ডের জন্য জুতা প্রস্তুত করে লেদারেক্স। এ ছাড়া রফতানিকারক জুতা কারখানার মধ্যে বে, এবিসি, আকিজ, অ্যালায়েন্স, হ্যামকো, জেনিস, লালমাই, ফরচুনা, ম্যাফ, পতেঙ্গা, রিমেক্স, রয়্যাল, স্কারপি ই মোদা, সোনালি আঁশ ইন্ডাস্ট্রি, পিকার্ড ও বিএজি ফুটওয়্যার অন্যতম। এফবি ফুটওয়্যারে তৈরি হচ্ছে এনা, অ্যারোমা, টোকার্স, এইচঅ্যান্ডএম, তামারিজসহ আরও কয়েকটি নামি ব্র্যান্ডের জুতা।

ডাইচম্যানের বাংলাদেশ প্রতিনিধি সাইফুল ইসলাম সমকালকে জানান, বাংলাদেশে গত বছরে তাদের প্রতিষ্ঠানের ৩৪ লাখ জোড়া জুতা তৈরি হয়েছে। চলতি বছর বাড়ছে। তিনি বলেন, ‘আমরা পর্যালোচনা করে দেখেছি, উন্নত মান ও উৎপাদন খরচ কম হওয়ায় বাংলাদেশে জুতা শিল্পের ভবিষ্যৎ খুব ভালো। তাই এখানে অর্ডার বাড়ানো হচ্ছে।’ কিছু দুর্বলতা আছে জানিয়ে তিনি বলেন, সব জুতা কারখানায় এখনও পর্যাপ্ত অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি। অনেক ক্ষেত্রে আমরা সরাসরি ব্যবসা করতে পারছি না। বাইরের এজেন্টের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। নির্ভরতা কমানো গেলে বাংলাদেশের জুতা শিল্প আরও লাভবান হবে। প্রতিনিয়ত জুতার ফ্যাশনে পরিবর্তন আসছে উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এর জন্য প্রতিটি কারখানায় শক্ত ডেভেলপমেন্ট টিম গড়ে তুলতে হবে। প্রয়োজনে তাদের বিদেশে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করতে হবে।

এফবি ফুটওয়্যারের জেনারেল ম্যানেজার সৈয়দ আসাদুজ্জামান সমকালকে জানান, বৈশ্বিক নানা সমস্যায় বাজারে মন্দাভাব রয়েছে; এর মধ্যেও জুতা রফতানি থেমে নেই। বিদেশি ক্রেতারা বাংলাদেশে প্রস্তুত জুতা পছন্দ করছে, তাই অর্ডার বাড়ছে। গত বছরের তুলনায় এবার তাদের প্রতিষ্ঠানে অর্ডার বেড়েছে প্রায় দেড়গুণ। তিনি বলেন, তৈরি পোশাকের মতো জুতা শিল্পেও কিছু বিশেষ সুবিধা দেওয়া উচিত। পাশাপাশি জুতার জন্য পৃথক রফতানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকা গড়ে তুলতে হবে; যেখানে থাকবে পরীক্ষাগার থেকে শুরু করে সবকিছু। সরকারের উচিত হবে আগামীতেও বিদ্যমান সকল সুযোগ-সুবিধা বজায় রাখা। আরও ভালো করতে আমাদের ঐক্যবদ্ধভাবে চেষ্টা করতে হবে।

জুতা প্রস্তুতকারক কোম্পানির কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে জার্মানি, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, ইতালি, পোল্যান্ড, পর্তুগাল, স্পেন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য, জাপান, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, অস্ট্রিয়া, বেলজিয়াম, ফিনল্যান্ডসহ আরও কয়েকটি দেশে জুতা রফতানি হচ্ছে।

লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ১১৫টি রফতানিমুখী কারখানায় সিনথেটিক ও চামড়ার জুতা তৈরি হয়। প্রতিবছর জুতা শিল্পে বিনিয়োগও বাড়ছে; গড়ে উঠছে নতুন কারখানা। বিদেশিরাও এই শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত হচ্ছেন। নিরাপত্তার বিষয়টি ঠিক থাকলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের পরবর্তী গন্তব্য হচ্ছে বাংলাদেশ।

সংশ্লিষ্টরা জানান, জুতা কারখানার প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ, তৈরির যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়ে আসছে সরকার। এক লাখ ডলারের বেশি রফতানিতে সরকার ১৫ শতাংশ নগদ সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি আছে ট্যাক্স হলিডে সুবিধা। জুতার ইনসোল, ব্যবহৃত গ্গ্নুসহ ছোটখাটো অন্যান্য সরঞ্জাম আমদানিতেও শুল্ক কমানো হয়েছে। আগে চীন ও ভারত থেকে জুতার বক্স আমদানি করা হলেও সে নির্ভরতাও কিছুটা কমেছে। বর্তমানে নিক্সন, প্যারাগনসহ দেশীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠান জুতার বক্স তৈরি করছে।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএ) তথ্যে জানা যায়, প্রতি বছর দেশে ২২ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদিত হয়। জুতা ও অন্যান্য পণ্য তৈরিতে উৎপাদিত সেই চামড়ার মাত্র ৫০ শতাংশ ব্যবহৃত হয়। জুতার বিশ্ববাজার বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ব্যবহারকারীদের ৫৫-৬০ শতাংশই সিনথেটিকের জুতা পরেন। এ বিষয়টিও মাথায় এনে বাংলাদেশি কারখানার মালিকরা সিনথেটিক জুতা তৈরির দিকে দৃষ্টি দেন। ওইসব কারখানায় এখন নামি-দামি ব্র্যান্ডের সিনথেটিক জুতা তৈরি হচ্ছে। তাদের অর্ডারও ভালো।

রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরে জুতা রফতানি থেকে আয় হয় ৪১ কোটি ৯৩ লাখ ডলার। আগের বছরের তুলনায় প্রবৃদ্ধি ছিল ২৫ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে রফতানির পরিমাণ প্রায় ১৩ কোটি বেড়ে দাঁড়ায় ৫৫ কোটি ডলার। পরের দুই অর্থবছরেও জুতা রফতানি বেড়েছে। ২০১৪-১৫ ও ২০১৫-১৬ অর্থবছরে জুতা রফতানির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ৬৭ কোটি ২০ লাখ ও ৭১ কোটি ৪০ লাখ ডলার। চলতি অর্থবছরেও এই পরিমাণ বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন মাহমুদ মাহিন সমকালকে বলেন, আমাদের জুতা বিশ্ববাজারে নিজস্ব অবস্থান তৈরি করেছে_ এটা ঠিক, তবে সামগ্রিকভাবে কিছু নেতিবাচক ধারণাও আছে। সব মিলিয়ে আমরা এখন ট্রানজিট পয়েন্টে আছি। সমস্যগুলো কাটিয়ে উঠলেই বাংলাদেশ বিশ্ববাজারে নেতৃত্ব দেবে। জুতা রফতানি বাড়ছে, তবে আরও বাড়াতে অবকাঠামোগত ও কৌশলগত উন্নয়ন জরুরি। সাভারে ট্যানারি স্থানান্তর হলে অবস্থার আরও উন্নতি হবে। এর জন্য সব পক্ষেরই সহযোগিতা প্রয়োজন।