‘সবচেয়ে নিরাপদ প্রযুক্তি’তে হচ্ছে রূপপুর পরমাণু বিদ‌্যুৎ কেন্দ্র

এরপরও কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে তাতেও প্রকল্প এলাকার বাইরের মানুষকে সরাতে হবে না বলে আশ্বস্ত করেছেন তিনি।

হিরোশিমা-নাগাসাকি দিবস উপলক্ষে মঙ্গলবার পরমাণু শক্তি কমিশনে এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের প্রথম পরমাণবিক বিদ‌্যুৎ কেন্দ্রের সুরক্ষা নিয়ে কথা বলেন জুলকারনাইন।

‘স্টার ট্রেক ড্রিম’ নামে একটি সংগঠনের উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নঈম চৌধুরী।

রুশ সহযোগিতায় ১ লাখ কোটি টাকায় পাবনার রূপপুরে পরমাণু বিদ‌্যুৎ কেন্দ্র হচ্ছে, যার দুটি ইউনিট থেকে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ‌্যুৎ উৎপাদন হবে।

২০২১ সালের মধ্যে একটি ইউনিট চালুর আশা করে ২০১৩ সালে এই পারমাণবিক বিদ‌্যুৎ কেন্দ্রের ভিত্তিস্থাপন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পরমাণু কেন্দ্রের দুর্ঘটনার ভয়াবহতা দেখে বাংলাদেশের এই প্রকল্প নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে বিভিন্ন জনের; তবে সরকার বলছে, সব সুরক্ষা নিশ্চিত করেই এটি করা হচ্ছে।

মো. আলী জুলকারনাইন

জুলকারনাইন রূপপুর প্রকল্পের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে বিদ‌্যুতের ক্রমবর্ধমান চাহিদার বিষয়টি তুলে ধরেন আলোচনা অনুষ্ঠানে।

“আমাদের গ্যাস শেষ হয়ে যাচ্ছে। সুতরাং আমাদেরকে পরমাণু জ্বালানিতে যেতেই হবে।”

পরমাণু বিদ‌্যুত কেন্দ্রের শুরুতে খরচ বেশি হলেও দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদন পাওয়ায় সার্বিক খরচ কমে আসে বলে জানান তিনি।

চীন ও ভারতের পরমাণু বিদ‌্যুতে জোর দেওয়ার কথাও বলেন জুলকারনাইন।

“ভারতে এখন পরমাণু জ্বালানির উৎপাদন কত? ৬ হাজার থেকে ৭ হাজার। তারা এটাকে ৬৪ হাজার মেগাওয়াট করতে চায়। চীনের এখন আছে ২০ হাজার মেগাওয়াট। ২০৩০ সালে এটাকে তারা ২ লাখ মেগাওয়াট করতে চায়।”

তিনি বলেন, এখন সারাবিশ্বে ৭০টি পরমাণু চুল্লী চালু, এর মধ্যে ৮৪ ভাগই সর্বশেষ প্রযুক্তির।

“আমরা সঠিক প্রযুক্তিটাই গ্রহণ করেছি। নানা দুর্ঘটনার অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এই প্রযুক্তির ডিজাইন করা হয়েছে।”

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নকশা দেখছেন প্রধানমন্ত্রী (ফাইল ছবি)

দুর্ঘটনায় ক্ষতি এড়াতে চুল্লীর পুরুত্ব বাড়ানোর পাশাপাশি এর চারপাশে যে কনক্রিটের কাঠামো থাকবে বলে জানান তিনি।

“যে সকল দুর্ঘটনা ঘটেছে, সে সব ক্ষেত্রে রিঅ্যাক্টরের পুরুত্বের চেয়ে বেশি পুরুত্ব আমাদের এখানে। তার উপর এটা দুই স্তরের রাখা হয়েছে। দুই স্তরের মাঝে ফাঁকা রাখা হয়েছে। ফলে এখানে অ্যাক্সিডেন্ট হলেও বাউন্ডারির বাইরের লোকজনকে সরাতে হবে না।”

“এখন জেনারেশন থ্রি চলছে। সেখানে আমরা এখানে জেনারেশন থ্রি প্লাস রিঅ্যাক্টর পাচ্ছি। গত ৫ তারিখে রাশিয়াতে এটা গ্রিডে যুক্ত হয়েছে,” বলেন তিনি।

পরমাণু বিদ‌্যুতে লাভের বিষয়টি তুলে ধরে জুলকারনাইন  বলেন, “নিউক্লিয়ার কর্মসূচিতে গিয়ে গরিব হয়েছে-এমন দৃষ্টান্ত একটাও নাই। ভারতের তো অনেক বড় প্রোগ্রাম। তাও ১৪ সালে ২ হাজার কোটি টাকার বেশি প্রফিট ছিল।

“এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করতে সেরা কয়লা আনলে বছরে ৩০ লাখ টন কয়লা লাগবে। আর পরমাণু বিদ্যুতে লাগে ২৫ টন। ২৫ টন বহন করা কোনো বিষয় না।”

পরমাণু বিদ‌্যুৎ কেন্দ্র পরিচালনায় দক্ষ জনবল তৈরিতে তিন বছর ধরে বাংলাদেশ থেকে রাশিয়ায় ২০ জন করে শিক্ষার্থী পাঠানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।

নঈম চৌধুরী

পরমাণু শক্তি নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান নঈম চৌধুরী বলেন, “যারা বোমা নিয়ে খেলা করছেন, একদিন তাদের উপরই এটা বুমেরাং হয়ে যেতে পারে। আমরা এর (পারমাণবিক প্রযুক্তি) শান্তিপূর্ণ ব্যবহারের পক্ষে। বোমা বানানোর বিরুদ্ধে। যারা বোমা তৈরি করে আমাদের প্রতিবাদ তাদের বিরুদ্ধে চলবে।”

রূপপুর নিয়ে সমালোচনার বিষয়ে তিনি বলেন, “প্রযুক্তির একটি ভালো দিক হচ্ছে, এটা নিয়ে যত কথা হয়, তখন এটা নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেয়। ফুকুশিমা (জাপানের) দুর্ঘটনার পরের বোঝাপড়াও অনেক কাজে দিয়েছে। আমাদের চুক্তিতেও এর প্রভাব আছে।

“দুর্ঘটনা হবে বলে কোনো প্রযুক্তি থেমে থাকে না। প্রযুক্তি আরও নতুন নতুন উদ্ভাবনে এগিয়ে যায়।”

অনুষ্ঠানের আলোচকরা

মনোরঞ্জন দাস

অনুষ্ঠানে এবিসি রেডিও’র উপদেষ্টা মনোরঞ্জন দাস পরমাণু বিদ‌্যুতের পক্ষে যুক্তি দেখিয়ে বলেন, “আমরা যে বলি দুর্ঘটনা হতে পারে, অন্যগুলো এটার চেয়ে কম মারাত্মক না। ভারতে গ্যাসে অনেক মানুষ মারা গেছে। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে,  ফসিল ফুয়েল ব্যবহার বন্ধ না করলে গ্রহটাই বাঁচবে না।

“অনেকে বলেন, ক্লিন এনার্জির আরও তো উৎস আছে, সোলার পাওয়ার, বায়ু পাওয়ার। এগুলো নিতান্ত অকার্যকর। সোলারের সবচেয়ে এফিসিয়েন্ট ব্যবহার হয় কাপড় শুকানোতে। কাজেই সোলার দিয়ে হবে না।”

অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আমিনুর রশীদ, প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক আব্দুল কাইয়ুম, মণি সিংহ-ফরহাদ স্মৃতি ট্রাস্টের সভাপতি শেখর দত্ত, স্টার ট্রেক ড্রিমের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক রুশো তাহের।