দেশের উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অবদান

দিন বদলের যে প্রতিশ্রæতি দিয়ে বতর্মান সরকার ২০০৮ সালে অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতায় এসেছিল তার সিংহভাগই বাস্তবায়ন করেছে। মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দল হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আপামর জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নে প্রত্যেকটি খাতে যেমন বিদ্যুৎ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, নারীর ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থান, আইসিটিসহ প্রতিটি খাতে যথাযথ কর্মপরিকল্পনার মাধ্যমে উন্নয়নকে গতিশীল করছে। জনগণের আশা-আকাক্সক্ষা পূরণে সরকার তার দেয়া প্রতিশ্রæতি রক্ষা করেছে এবং ভবিষ্যতে রক্ষা করে চলবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। মৌলিক চাহিদার মধ্যে খাদ্য অন্যতম। আর বর্তমান সরকার খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের ক্ষেত্রে শতভাগ সফল। ২০১২ সালের পর বাংলাদেশকে চাল আমদানি করতে হয়নি বরং এখন রপ্তানি করছে।
বিদ্যুৎ খাতে সফলতা
বর্তমান সরকার ২০০৮ সালে যখন দায়িত্ব গ্রহণ করে তখন বিদ্যুতের অবস্থা রাতের অন্ধকারের মতোই ছিল। ২০০৯ সালে বিদ্যুৎ প্ল্যান্টগুলোর বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ছিল ৪৯৩১ মেগাওয়াট। বর্তমান সরকারের পদক্ষেপে ২০১৬ সালে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮৫ ভাগ বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে প্রায় ৯ হাজার মেগাওয়াট। সরকার প্রায় নতুন ৩৫ লাখ সংযোগ দিতে সক্ষম হয়েছে। ৬৫টি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু হয়েছে। বেশ কিছু নতুন বিদ্যুৎ প্রকল্প অচিরেই জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে এবং বিদ্যুৎ সমস্যা থাববে না আশা করা যায়।
শিক্ষাক্ষেত্রে সফলতা
বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে বর্তমান পর্যন্ত শিক্ষা ব্যবস্থায় নজিরবিহীন সাফল্য এনেছে। বছরের প্রথম দিনে সকল প্রাইমারি, মাধ্যমিক স্কুল ও মাদ্রাসায় বিনামূল্যে বই বিতরণ সারা বিশ্বে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। সরকার দেশের প্রায় সব প্রাথমিক বিদ্যালয়কে সরকারি করেছে। পিএসসি ও জেএসসি পরীক্ষা পদ্ধতি প্রণয়নের মাধ্যমে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার মান বৃদ্ধি পেয়েছে। সবার মতামতের ভিত্তিতে জাতীয় শিক্ষানীতি প্রণয়নের ব্যবস্থা করে সরকার হচ্ছে শিক্ষা আইন। ২৪ হাজার স্কুল-কলেজ-মাদ্রাসায় ল্যাপটপ ও মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করে দেয়া হয়েছে। সব শিক্ষাস্তরে তথ্যপ্রযুক্তিকে আলাদা বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ছাত্রীদের জন্য প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা তহবিল গঠন করে স্নাতক পর্যন্ত উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে। উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে এসেছে পরিবর্তন। বর্তমানে দেশে ৩৭টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী ঘোষণা করেছেন প্রত্যেক জেলায় বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করা হবে।
যোগাযোগ খাতে সফলতা
সড়ক যোগাযোগ সেতু মন্ত্রণালয়ের অধীনে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, ঢাকা যানবাহন সমন্বয় বোর্ড, বিআরটিসি, বিআরটিএ এবং সেতু বিভাগের মাধ্যমে দেশের সার্বিক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছে। তিস্তা সেতু, বরিশালে আব্দুর রব সেরনিয়াবাত সেতু, শহীদ আহসান উল্লাহ মাস্টার উড়াল সেতু, শীতলক্ষ্যা নদীর ওপর সুলতানা কামাল সেতু, শাহ আমানত শাহ সেতু, শহীদ বুদ্ধিজীবী সেতু, বান্দরবানে রুমা ও থানচি সেতু, রংপুরে যমুনেশ্বরী সেতুসহ আরো বেশ কয়েকটি সেতু যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয়েছে।
মিরপুর থেকে সেনানিবাসের ওপর দিয়ে বিমানবন্দর সড়কে ফ্লাইওভার, কুড়িল ফ্লাইওভার, মেয়র হানিফ ফ্লাইওভার, মগবাজার ফ্লাইওভার ও বনানী রেলক্রসিংয়ের ওভারপাস নির্মাণ এই সরকারের একটি বড় সাফল্য। জয়দেবপুর-দেবগ্রাম-ভুলতা-মদনপুর হয়ে ঢাকা বাইপাস সড়ক নির্মিত হয়েছে। সাভার-নবীনগর মহাসড়ক, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ, ঢাকা-ময়মনসিংহ, রংপুর বিভাগীয় শহরের সড়ক, চট্টগ্রাম-রাঙ্গামাটি মহাসড়ক, নারায়ণগঞ্জ সংযোগ সড়ক এবং নবীনগর-চন্দ্রা সড়ক চার লেনে উন্নীতকরণের কাজ চলমান রয়েছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার দীর্ঘ চট্টগ্রাম বন্দর সংযোগ উড়ালসেতু নির্মাণ করা হয়েছে। সংযুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ এশিয়ান হাইওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে। সড়কের ক্ষয়ক্ষতি এবং দুর্ঘটনা হ্রাসে ৬টি ওভারলোড কন্ট্রোল স্টেশন কার্যকর করাসহ ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের ১১টি দুর্ঘটনাপ্রবণ স্থানে সড়ক বাক প্রশস্তকরণ ও সরলীকরণসহ ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-কক্সবাজার সড়কের আরো ৬টি স্পট সরলীকরণের কাজ চলমান রয়েছে। কাঁচপুর-আমিন বাজার ব্রিজের নিচে সার্কুলার ডাইভার্সন সড়ক নির্মিত হয়েছে। যা যানজট নিরসনে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে।
নিজস্ব অর্থয়নে পদ্মা সেতু
দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ২১ জেলার মানুষের আশা আকাক্সক্ষা আর স্বপ্ন পদ্মা সেতু। যা বার বার দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রের শিকার। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে নিজস্ব অর্থায়নে শুরু হয়েছে ৬.১৫ কিলোমিটারের দীর্ঘ পদ্মা সেতু। যার প্রায় ৩৫ শতাংশ কাজ ইতোমধ্যেই শেষ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেখিয়ে দিয়েছেন আমরা কারো কাছে মাথা নোয়াবার জাতি নয়। আমরা সেই জাতি, যে জাতি সম্পর্কে জাতির পিতা বলেছিলেন, ‘কেউ দাবায়া রাখতে পারবা না’। অর্থনীতিবিদদের মতে, পদ্মা সেতু চালু হলে দেশের প্রবৃদ্ধি ১ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
স্বাস্থ্য খাতে সফলতা
স্বাস্থ্য খাতে ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এর মান উন্নয়নেও জোর দিয়েছে সরকার। সংবিধানের মাধ্যমে এ দেশের মানুষের স্বাস্থ্য অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। শেখ হাসিনার নির্দেশে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তারদের কমপক্ষে দুই বছর নিজ এলাকায় চিকিৎসাসেবা প্রদান করতে হবে। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুহার অনেক হ্রাস পেয়েছে। গড় আয়ু ৭০.৭ বছর হয়েছে। মাতৃত্বকালীন ছুটি বাড়িয়ে ৬ মাস করা হয়েছে। ১২৭৭৯ কমিউনিটি ক্লিনিক প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। হাসপাতালের সংখ্যা ১৬৮৩টি থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫০১টি। ১৫টি শিশু বিকাশ কেন্দ্র স্থাাপন করা হয়েছে। শিশুমৃত্যু উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস করার কারণে এমডিজি পুরস্কার লাভ করে বাংলাদেশ।
বিবিধ
বর্তমান বাংলাদেশ সরকার তার রাষ্ট্রের প্রাপ্য অধিকার সম্পর্কে সচেতন। যার ফলে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আদালতে আবেদনের মাধ্যমে ভারত ও মায়ানমারের কাছ থেকে প্রাপ্য বিরাট জলরাশির ওপর কর্তৃত্ব স্থাপিত হয়েছে। ফলে ব্লু-ইকোনোমিতে নতুন দিগন্ত সূচিত হয়েছে। ভারতের সঙ্গে ছিটমহল সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে নতুন ৪৭ বর্গ কি.মি. এলাকা মূল ভূখণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে। আইসিটি পার্ক গঠন হয়েছে গাজীপুরে। দেশে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৬.৩০ কোটি ছাড়িয়েছে। আইসিটি খাত থেকে অচিরেই ডলার আয়ের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জাতীয় তথ্য বাতায়ন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। এই সরকারের আমলে প্রায় ৭৫ লাখের অধিক বেকার লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেয়া হয়েছে। শ্রমিকদের ন্যূনতম বেতন কাঠামো করা হয়েছে।
নারীর ক্ষমতায়নে বর্তমান সরকার বদ্ধপরিকর। প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেত্রী এবং সংসদের স্পিকার নারী। নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম নারী ভিসি। পুলিশ, সেনাবাহিনী বর্ডার গার্ড নারী সদস্য নিয়োগ দেয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংক রিজার্ভ ২৯ কোটি বিলিয়ন ছাড়িয়েছে। যা রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। সরকারি ব্যাংকসমূহে চাকরি আবেদন বিনামূল্যে করে দিয়েছে সরকার। এসব উন্নয়নের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ’ ‘সাউথ-সাউথ এওয়ার্ড’ ইত্যাদি পুরস্কার লাভ করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
পরিশেষে বলছি, সফলতা অর্জনে এগিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশ। তাই সরকারের উন্নয়ন সম্পর্কে আমাদের জনগণকে জানাতে হবে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরতে হবে জনসাধারণের কাছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় নেতৃত্বে পৃথিবীর অন্যান্য বড় বড় দেশের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সব ক্ষেত্রে বাংলাদেশ নিজেদের যোগ্যতার জানান দিয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। তার বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আমাদের ছোট্ট এই দেশকে পৃথিবীর বুকে বারবার করেছে সম্মানিত। সরকারের উন্নয়নের এই ধারাকে অব্যাহত রাখতে আমাদের সবাইকে সচেতন হতে হবে এবং হাতে হাত রেখে কাজ করে যেতে হবে।
মুহাম্মদ ফারুক খান এমপি : আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ; সাবেক মন্ত্রী, বাণিজ্য, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়।