উন্নয়নে এগিয়ে যাব কাউকে পেছনে রেখে নয়

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি)-র ধারাবাহিকতায় ২০১৫-সালের সেপ্টেম্ব্বর মাসে জাতিসংঘের ৭০তম অধিবেশনে বাংলাদেশসহ ১৯৩টি সদস্য দেশ ২০১৫-পরবর্তী উন্নয়ন এজেন্ডা হিসেবে টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) অনুমোদন করেছে, যাতে ১৭টি অভীষ্ট এবং ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রা সন্নিবেশিত হয়েছে। এমডিজির পর উন্নত জীবনযাপনের আকাঙ্ক্ষা নিয়ে পুরো বিশ্ব এসডিজি ঘোষণা করে। এটি বিশ্বের ১৯৩টি দেশের নতুন বৈশ্বিক বহুমাত্রিক উন্নয়ন পরিকল্পনা যার বাস্তবায়ন চলবে আগামী দেড় দশক। এ কর্মসূচি ব্যাপক পরিসরে পুরো বিশ্বে বিস্তৃত। বিশ্বনেতারা একমত হয়েছেন, বিশ্বের সব নাগরিকের উন্নত জীবন পাওয়ার অধিকার রয়েছে।

সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার আটটি উদ্দেশ্যের বিপরীতে টেকসই উন্নয়নে অভীষ্টতে প্রণীত হয়েছে ১৭টি অভীষ্ট—১. যে কোনো ধরনের দারিদ্র্য নির্মূল; ২. ক্ষুধা দূরীকরণ, খাদ্য নিরাপত্তা অর্জন ও টেকসই কৃষি উন্নয়ন; ৩. সর্ববয়সী মানুষের স্বাস্থ্য ও কল্যাণ নিশ্চিতকরণ; ৪. অন্তর্ভুক্তিমূলক সুষম শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা; ৫. লিঙ্গসাম্য নিশ্চিতকরণ এবং সকল নারীর ক্ষমতায়ন; ৬. টেকসই জল সরবরাহ ব্যবস্থা এবং স্যানিটেশন নিশ্চিত করা; ৭. সকলের জন্য সহজলভ্য, টেকসই এবং আধুনিক জ্বালানি নিশ্চিত করা; ৮. অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং সকলের জন্য পূর্ণ ও উত্পাদনশীল কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা; ৯. কার্যকর অবকাঠামো নির্মাণ, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং টেকসই শিল্পায়ন; ১০. মানুষে মানুষে এবং আন্তঃদেশীয় বৈষম্য হ্রাসকরণ; ১১. শহর-নগর সহ মানব বসতিগুলোকে নিরাপদ করা; ১২. টেকসই উত্পাদন এবং ভোগব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ; ১৩. জলবায়ু পরিবর্তন এবং তার বিরূপ প্রভাবগুলো মোকাবিলা করার জন্য জরুরি ব্যবস্থা গ্রহণ; ১৪. সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদের সংরক্ষণ এবং পরিমিত ব্যবহার; ১৫. ভূমণ্ডলের প্রতিবেশ রক্ষা এবং টেকসই ব্যবহার, বনভূমি সংরক্ষণ, মরুকরণ মোকাবিলা, ভূমির অবক্ষয় নিরাময় করা; ১৬. টেকসই উন্নয়নের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ নির্মাণে পৃষ্ঠপোষকতা করা, সকলের জন্য ন্যায়বিচারপ্রাপ্তি সহজলভ্য করা এবং ১৭. বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব বাস্তবায়নের উপায়গুলো সুসংহত করা। এই ১৭টি অভীষ্ট (goal) কে ১৬৯টি লক্ষ্যমাত্রায় (targets) বিস্তারিতকরণ করা হয়েছে, যেগুলো অর্জন করতে হবে।

জাতিসংঘের ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনে বাংলাদেশের সামনে পাঁচটি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। এগুলো হল- দেশীয় কর্মসূচিতে এ লক্ষ্যগুলো সম্পৃক্ত করা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানো, সম্পদ ও অর্থায়ন, স্বচ্ছতার জন্য প্রয়োজনীয় পরিসংখ্যান তৈরি এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিতের কাঠামো তৈরি ও জনগণের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা।

দ্বিতীয়ত, এমডিজিতে বলা হয়েছিল ১৯৯০ সালের তুলনায় ২০১৫ সালে দারিদ্র্য গড়ে অর্ধেক নামিয়ে আনতে হবে। কিন্তু এখন বলা হচ্ছে, কেবলমাত্র গড় দেখলে হবে না। বিভিন্নক্ষেত্রে যে ফাঁক রয়ে গেছে যেমন নারী-পুরুষের মধ্যে অসমতা আছে কিনা, গ্রাম এবং শহরের মধ্যে উন্নয়নের ফারাক কতটা অথবা বিভিন্ন যে ক্ষুদ্র মানব গোষ্ঠীগুলো আছে, তারা সমঅধিকার পাচ্ছে কিনা সেই বিষয়গুলো দেখতে হবে। অর্থাত্ শুধু গড় না, উন্নয়নের ফল বণ্টন ঠিকভাবে হচ্ছে কিনা, তার সুফল বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে সমানভাবে পৌঁছাচ্ছে কিনা তার দিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। যেমন দারিদ্র্য নিরসনে এমডিজিতে আমাদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫৭ শতাংশ থেকে ২৯ শতাংশে নিয়ে আসা। বাংলাদেশে ২০১৫ সালেই দারিদ্র্যের হার ২৪.৮ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু দারিদ্র্যের হিসেব করতে গিয়ে যদি বিভিন্ন বিভাগ, যেমন রাজশাহী, খুলনা বা বরিশালের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো যে, সেখানে দারিদ্রের হার অনেক বেশি এবং আয় বৈষম্য তেমন কমেনি।

টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট বিশাল এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোর পর্যাপ্ত অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে গঠিত হয়েছে ৩০ সদস্যের আন্তঃসরকারি বিশেষজ্ঞ কমিটি। আন্তঃসরকার কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাপী ৫ থেকে ৭ ট্রিলিয়ন ডলার অতিরিক্ত বিনিয়োগ দরকার হবে। আঙ্কটাডের রিপোর্ট অনুযায়ী উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন থেকে সাড়ে ৪ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ লাগবে। তবে এ অর্থের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে তেমন কোনো তহবিল বা কোনো সহযোগিতা পাওয়া যাবে না । ফলে দেশগুলোকে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকেই এ অর্থের সংস্থান করতে হবে। এই কমিটি চিহ্নিত করেছে, টেকসই উন্নয়ন বাস্তবায়নের জন্য সরকারি অর্থ এবং সাহায্যই হবে মূল ব্যয়ের উত্স। তবে কর ব্যবস্থার পুনর্বিন্যাস এবং দুর্নীতি ও বেআইনি অর্থের পুঞ্জীভবন থেকে আহরিত বেসরকারি অর্থও এই উেসর সঙ্গে যোগ করা জরুরি। এক্ষেত্রে বিদেশি বিনিয়োগ যথা পরিমাণ না হওয়ায় অতিরিক্ত অর্থ সংস্থান বাংলাদেশের জন্য কঠিন হবে। তবে গণ অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনেক ব্যয় সাশ্রয়েরও সুযোগ আছে। উন্নয়ন সহযোগীদের দেয়া অর্থায়নকে সরকার কাজে লাগাতে পারছে না প্রশাসনিক পুরো সক্ষমতার অভাবে। বৈদেশিক সহায়তা ফেলে না রেখে সঠিক ব্যবহার করতে হবে। একই সাথে সহজ শর্তের বহুপাক্ষিক ঋণ গ্রহণে প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। বর্তমানে এসডিজি বাস্তবায়নে অর্থায়ন বিষয়ে অর্থাত্ দেশজ ও বৈদেশিক সহায়তা কত প্রয়োজন হবে এজন্য, সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ, পরিকল্পনা কমিশন সমীক্ষা পরিচালনা করছে।

২০৩০ সাল নাগাদ যদি এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাসমূহ পূরণ করা যায়, তাহলে বাংলাদেশ উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারবে। অর্থাত্ বাংলাদেশ হতে চরম দারিদ্র্য দূর হবে, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, ক্ষুধামুক্ত হবে, শিক্ষাক্ষেত্রে গুণগতমান বৃদ্ধি পাবে, শ্রমের মজুরি বাড়বে, কৃষক-শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত হবে, সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে, বিদ্যুত্ সুবিধা সর্বজনীন নিশ্চিত হবে। যার ফলে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে। এজন্য ২০৩০ সালের অভীষ্টের সঙ্গে উন্নয়ন পরিকল্পনার সমন্বয় সাধন জরুরি। এ সময়ের মধ্যে আমাদের তিনটি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হবে, যার সঙ্গে সমন্বয় রেখেই এসডিজি বাস্তবায়ন করতে হবে। উল্লেখ্য, চলমান সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় (২০১৬-২০) টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহকে বিভিন্ন অধ্যায়ে সমন্বিত করা হয়েছে। এসডিজি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশ উন্নয়ন সম্ভাবনার একটা অনুকরণীয় দেশে পরিণত হবে। যেখানে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, আয় বাড়বে। মানুষে মানুষে আয় ও ভোগ অসাম্য কমে আসবে।

এরূপ উন্নয়নের লক্ষ্যে ‘ইউনাইটেড নেশনস কনফারেন্স অন ট্রেড এন্ড ডেভেলপমেন্ট- আঙ্কটাডের’ এলডিসি রিপোর্ট-২০১৫ প্রতিবেদনে গ্রামীণ অর্থনীতি রূপান্তরের মাধ্যমে অর্থনৈতিক উন্নয়নকে গুরুত্ব দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে আমাদের এলডিসি থেকে বের হতে হলে উত্তরণকালীন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে, যেন গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন নিশ্চিত করে উন্নয়ন করা যায়। কৃষির সাথে শিল্পের সংযুক্তি বাড়াতে হবে। পাশাপাশি মানব সম্পদ উন্নয়নে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বাজেটের বরাদ্দ বাড়াতে হবে। কৃষিকে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। এর জন্য শ্রমিকের উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি, ফসলের বহুমুখীকরণ, উন্নত বাজারজাতকরণ ব্যবস্থা এবং কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের অবদান বাড়ানো না হলে আমাদের উন্নয়নের স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে যেতে পারে। কৃষিতে প্রযুক্তির ব্যবহার ও বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশ গ্রহণ বাড়াতে হবে। প্রায়োগিক কৃষি গবেষণার ওপর জোর দিতে হবে। কৃষির জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করতে হবে। কৃষি হতে হবে উচ্চ প্রযুক্তি নির্ভর বাণিজ্যিক কৃষি।

বর্তমানে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার জন্য উত্পাদনশীলতা বৃদ্ধি, কৃষি ও সামাজিক বনায়ন বিস্তৃত করার কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। দারিদ্র্য নিরসন সংক্রান্ত নীতিমালাসমূহ পিছিয়ে পড়া অঞ্চলসমূহের মানুষের প্রয়োজন অনুসারে প্রণয়ন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সীমান্তবর্তী জেলাগুলোর যোগাযোগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার মাধ্যমে বৈষম্য দূরীকরণের লক্ষ্যমাত্রা গ্রহণ করা হয়েছে। পিছিয়ে পড়া অঞ্চলসমূহের দুর্বল গ্রামীণ অবকাঠামো (বিদ্যুত্, গ্রামীণ সড়ক এবং সেচ) এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ (বন্যা এবং খরা) এর বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় খামার এবং কৃষিভিত্তিক আয় বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট বাধাসমূহ অপসারণে মনোযোগ দেয়া হয়েছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আয়বর্ধনমূলক কর্মসংস্থান, কৃষি উত্পাদন বৃদ্ধি, সমবায়ভিত্তিক ক্ষদ্র ও কুটির শিল্প স্থাপনের জন্য সহজ শর্তে মূলধন যোগান দেয়া হচ্ছে। সরকার কম সুদে দরিদ্রতম উপজেলাসমূহে কৃষি ঋণ বিতরণ করছে। কৃষি পণ্যের ন্যায্যমূল্য প্রাপ্তির জন্য দরিদ্র এবং প্রান্তিক কৃষকদের মাছ এবং কৃষিপণ্য সংরক্ষণ কার্যক্রমে সহায়তা প্রদানের উপর জোর দেয়া হয়েছে। উল্লেখ্য, চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১৭ হাজার ৫৫০ কোটি টাকার কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, যা গত অর্থবছরের তুলনায় ৭ দশমিক ০১ শতাংশ বেশি।

গ্রামীণ দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলসমূহে ক্ষুুদ্র ঋণ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানসমূহের কার্যক্রম পরিচালনায় বিশেষ সুবিধাদি প্রদানের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। পরিবেশগত ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাসমূহ যেমনঃ ঘূর্ণিঝড়প্রবণ উপকূলীয় এলাকাসমূহ, জলাবদ্ধ ও অন্যান্য বন্যাপ্রবণ এলাকাসমূহে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমকে আকর্ষণ করার জন্য নীতি সহায়তা দেয়া হচ্ছে। দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল ও দারিদ্র্যপীড়িত এলাকাগুলোতে বিশেষ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। দরিদ্র মানুষের আত্ম-কর্মসংস্থান সৃষ্টি, আয়বৃদ্ধিমূলক পেশা নির্বাচন ও বিকল্প আয়ের উত্স সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। ২০০৫-২০০৬ অর্থবছরে দেশে চালের উত্পাদন হয় ২৬.৫ মিলিয়ন মে. টন। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে চাল উত্পন্ন হয়েছে ৩৪.৯ লক্ষ মেট্রিক টন যা বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মত্স্য উত্পাদন বৃদ্ধি পেয়ে ৪৫ লাখ মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে। সার ও সেচ কাজে ব্যবহূত বিদ্যুত্ ও অন্যান্য কৃষি উপকরণে প্রণোদনা বাবদ ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ৯ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। দেশে খাদ্য মজুদ ক্ষমতা ১৪ দশমিক ৬ লাখ মেট্রিক টন থেকে বেড়ে ২০১৬ এর শুরুতে ২০ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টনে উন্নীত হয়েছে।

দারিদ্র্য হ্রাসে গ্রামীণ অর্থনীতিতে অর্জিত গতিশীলতা এবং হতদরিদ্রদের জন্য টেকসই নিরাপত্তা বেষ্টনীর মাধ্যমে জনগণের খাদ্য নিরাপত্তা, অতি দরিদ্র ও দুঃস্থদের জন্য বিনামূল্যে খাদ্য বিতরণ, কাজের বিনিময়ে খাদ্য ও টেস্ট রিলিফ, জিআর ছাড়াও সরকার উদ্ভাবিত একটি বাড়ি একটি খামার, আশ্রয়ণ, গৃহায়ণ, আদর্শ গ্রাম ,গুচ্ছ গ্রাম, ঘরে ফেরা প্রভৃতি কর্মসূচির পাশাপাশি খোলাবাজারে পণ্য বিক্রি ফেয়ার প্রাইস কার্ড, ভিজিডি, বিধবা স্বামী নিগৃহীতা, দুঃস্থ মহিলা ভাতা, মাতৃত্বকালীন ভাতা, ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা, চর জীবিকায়নসহ প্রভৃতি কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। দারিদ্র্য বিমোচনের লক্ষ্যে মহিলাদের আত্মকর্মসংস্থানের জন্য ক্ষুদ্র ঋণ, ভিক্ষাবৃত্তিতে নিয়োজিত জনগোষ্ঠীর পুনর্বাসন ও বিকল্প কর্মসংস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। সামাজিক নিরাপত্তা ও ক্ষমতায়ন কর্মসূচিতে ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ৪৫ হাজার ২৩০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ রাখা হয়েছে যা বাজেটের ১৩.২৮ শতাংশ এবং জিডিপির ২.৩১ শতাংশ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতা ও পরিমাণ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। যথা- ক) বয়স্ক ভাতাভোগীর সংখ্যা ৫ শতাংশ বৃদ্ধি করে ৩১ লক্ষ ৫০ হাজারে এবং ভাতার হার ১০০ টাকা বৃদ্ধি করে ৫০০ টাকায় উন্নীত করা; খ) বিধবা স্বামী নিগৃহীতা, দুঃস্থ মহিলা ভাতার হার ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা বাড়িয়ে ১১ লক্ষ ৫০ হাজারে উন্নীত করা; গ) ভিজিডি কর্মসূচির উপকারভোগী দুঃস্থ মহিলার সংখ্যা ২ লক্ষ ৫০ হাজার বাড়িয়ে ১০ লক্ষে উন্নীত করা; ঘ) মাতৃত্বকালীন ভাতাভোগীর সংখ্যা প্রায় ৯০ শতাংশ বাড়িয়ে ৫ লক্ষে উন্নীত করা; ঙ) দেশের সকল পৌরসভায় কর্মজীবী ল্যাকটেটিং মাদার সহায়তা কর্মসূচি সম্প্রসারণের মাধ্যমে মোট ১ লক্ষ ৮০ হাজার ৩০০ জন দরিদ্র মা’কে এ ভাতার আওতায় আনা; চ) অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতার হার ১০০ টাকা বাড়িয়ে ৬০০ টাকায় এবং ভাতাভোগীর সংখ্যা ২৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ লক্ষ ৫০ হাজারে উন্নীত করা; ছ) নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্টের তহবিলে আরো ১০ কোটি ৫০ লক্ষ টাকা বরাদ্দ প্রদান; জ) হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রমের অধীনে তাদের বিশেষ ভাতা ৫০০ টাকা হতে বাড়িয়ে ৬০০ টাকায় উন্নীত করা; ঝ) বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে তাদের ভাতা ৪০০ টাকা হতে বাড়িয়ে ৫০০ টাকায় উন্নীত করা; ঞ) চা শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচির বরাদ্দ ১০ কোটি টাকা হতে বাড়িয়ে ১৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা; ট) ক্যান্সার, কিডনি, লিভার সিরোসিস, স্ট্রোকে প্যারালাইজড ও জন্মগত হূদরোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি বরাদ্দ ২০ কোটি হতে বাড়িয়ে ৩০ কোটি টাকায় উন্নীত করা। একটি দেশের অর্থনৈতিক উত্তরণকালে প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সচরাচর অসমতা পরিস্থিতির অবনতি হয়ে থাকে। বর্তমান সরকার কর্তৃক অনুসৃত ক্রমবর্ধমান প্রগতিশীল করনীতির পাশাপাশি সমাজের অনগ্রসর ও সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণির অনুকূলে নানা ধরনের সহায়তা সুষম আয়-বণ্টনে ভূমিকা রাখছে। এছাড়া ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটের ৫০.১০ শতাংশ এবং জিডিপির ৯.২২ শতাংশ দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় বরাদ্দ নির্ধারিত হয়েছে।

দক্ষিণের ১২টি জেলার জন্য নতুন কৃষি বীজ উদ্ভাবনে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা, আর্সেনিক মুক্ত নলকূপ সহজলভ্য করা, আরো আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করা, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে খরা মোকাবিলার জন্য বিশেষ করে সেচ সুবিধা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার প্রদান করা হয়েছে।

সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় সমগ্র বাংলাদেশে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এসডিজির পাশাপাশি উপরিউক্ত কৌশলসমূহ অবলম্বন করা হয়েছে। সরকার এ সকল নীতি কৌশল ও কর্মসূচি গ্রহণ করেছে এক পরম লক্ষ্যে, আর তা হলো উন্নয়ন, কাউকেই পেছনে রেখে নয়। এটি জাতিসংঘ গৃহীত টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টসমূহেরও মূল কথা। ক্ষুধা, দারিদ্র্যমুক্ত এবং ধর্ম নিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ে তোলার জন্য আরো পথ অতিক্রম করতে হবে। বাংলাদেশের ক্রমাগত অর্থনৈতিক উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।

n লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সদস্য (সিনিয়র সচিব), সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ,