বঙ্গমাতা যেন এক প্রেরণাদাত্রী সর্বংসহা নারীর প্রতিচ্ছবি

আটচল্লিশ, বায়ান্ন, ছেষট্টি, উনসত্তর, সত্তর এবং একাত্তরের উত্তরাধিকারী হিসেবে যখনই বাঙালির ইতিহাসের সংগ্রাম, ত্যাগ, অর্জনের পাতাগুলোতে চোখ বুলাই তখনই পাতায় পাতায় ভেসে ওঠে এক প্রেরণাদাত্রী, আপসহীন, দূরদর্শী, কষ্টসহিষ্ণু, প্রত্যয়ী, দৃঢ়চেতা, নিরহংকারী, আদর্শ বধূ, আদর্শ মাতার প্রতিচ্ছবি। মাত্র তিন বছর বয়সে পিতা ও পাঁচ বছর বয়সে মাতাকে হারানো রেণু নামের শিশুটি যখন সাধারণ মানুষের অধিকার আদায়ে লিপ্ত এক সংগ্রামী যুবকের স্ত্রী হিসেবে নিজেকে উপলব্ধি করতে শুরু করলেন তখন থেকে তিনি হলেন যুবক শেখ মুজিবের বিকশিত হওয়ার অনুঘটক।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’তে বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব সম্পর্কে লিখেছেন, ‘আব্বা, মা, ভাই-বোনদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রেণুর ঘরে এলাম বিদায় নিতে। দেখি কিছু টাকা হাতে করে দাঁড়িয়ে আছে। ‘অমঙ্গল অশ্রুসজল’ বোধ হয় অনেক কষ্টে বন্ধ করে রেখেছে। বলল, ‘একবার কলকাতা গেলে আর আসতে চাও না। এবার কলেজ ছুটি হলেই বাড়ি এস।’ একজন স্ত্রী তাঁর স্বামীর পড়াশোনা ও ছাত্র রাজনীতির জন্য নিজের জমানো টাকা স্বামীর হাতে তুলে দিচ্ছেন বিদায়বেলায়, এই টাকার যে বিপুল অনুপ্রেরণা শক্তি তা পরিমাপযোগ্য নয়।

১৯৪৭ সালের দেশ বিভক্তির চূড়ান্ত সময়ের প্রাক্কালে ও অব্যবহিত পরে যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা চলছিল সেই দাঙ্গার সময় যুক্ত বাংলার প্রধানমন্ত্রী হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছাত্রলীগ ও মুসলিম লীগ ন্যাশনাল গার্ডের একটা ভলান্টিয়ার কোর গঠন করে বর্ডারে গিয়ে শরণার্থীদের আসা-যাওয়ার বিষয়টি তদারকি করার দায়িত্ব দেন শেখ মুজিবকে। কিন্তু সেই সময় আমাদের প্রিয় নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনা মাতৃগর্ভে। যে সময় স্বামী মুজিবকে স্ত্রী রেণুর পাশে থাকা উচিত এবং যে সময় প্রত্যেক স্ত্রীই তাঁর স্বামীকে পাশে দেখতে চায় সবচেয়ে বেশি, ঠিক সেই সময়ই শেখ মুজিব স্ত্রীর কাছে কলকাতার বিরাজমান পরিস্থিতি বর্ণনা করে চিঠি লিখলেন।

স্বামীর চিঠির প্রত্যুত্তরে ফজিলাতুন্নেসা মুজিব লিখেছিলেন, ‘আপনি শুধু আমার স্বামী হওয়ার জন্য জন্ম নেননি, দেশের কাজ করার জন্যও জন্ম নিয়েছেন। দেশের কাজই আপনার সবচাইতে বড় কাজ। আপনি নিশ্চিন্ত মনে আপনার কাজে যান। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। আল্লাহর ওপরে আমার ভার ছেড়ে দিন।’ বেগম মুজিবের এই প্রেরণা, এই প্রত্যয়, এই দৃঢ়চিত্ত শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু মুজিব বানিয়েছে। কেননা, শেখ মুজিবকে কখনও শেখ হাসিনা, শেখ কামাল, শেখ রেহানা, শেখ জামাল, শেখ রাসেলের পিতা হিসেবে সাংসারিক দায়িত্বের মধ্যে নিজেকে আবদ্ধ রাখতে হয়নি, তিনি সুযোগ পেয়েছিলেন নিপীড়িত মানুষের জন্য, শেকলেবন্দি জাতির জন্য নিজেকে সঁপে দিতে। এখানেই স্বামীকে দেশের জন্য উৎসর্গ করা একজন কষ্টসহিষ্ণু, সর্বত্যাগী নারীর প্রতিবিম্ব ফুটে উঠেছে।

আমরা আমাদের প্রিয় নেত্রীর মুখে শুনেছি, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব যখন কারাগারে থাকতেন তখন বঙ্গমাতাই ছাত্রলীগকে সহযোগিতা ও নির্দেশনা দিতেন। ছাত্রলীগকে সহযোগিতা করার জন্য তাঁর মা নিজের সোনা-গহনা বিক্রি করতেও কুণ্ঠাবোধ করেননি। কারাগারে বন্দি মুজিব বঙ্গমাতার মাধ্যমেই যাবতীয় নির্দেশনা ছাত্রলীগ নেতাদের কাছে পাঠাতেন। উনসত্তরের উত্তাল দিনগুলোতে বঙ্গমাতা বাজারের টাকা বাঁচিয়ে নিজের আঁচলে বেঁধে রাখা টাকা তুলে দিতেন তোফায়েল ভাই, রাজ্জাক ভাইদের হাতে।

১৯৬৯ সালের আগরতলা মামলায় গ্রেফতার বঙ্গবন্ধুকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসার আইয়ুব সরকারের প্রস্তাব যে আসলেই একটা কূটকৌশলী প্রস্তাব বেগম মুজিব অন্দরমহলে থেকেও তা বুঝতে পেরেছিলেন। তাই তো বঙ্গমাতা বেগম মুজিব তাঁর কন্যা শেখ হাসিনা এবং জামাতা এমএ ওয়াজেদ মিয়াকে দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন, ‘জনগণ তোমার সঙ্গে আছে। তুমি কিছুতেই প্যারোলে মুক্তি নেবে না। তোমাকে বীরের বেশে মাথা উঁচু করে বেরিয়ে আসতে হবে।’

খুব কড়া ভাষায় এই গৃহবধূর আরেকটি বার্তা ছিল, ‘হাতে বঁটি নিয়ে বসে আছি, প্যারোলে মুচলেকা দিয়ে আইয়ুবের দরবারে যেতে পারেন; কিন্তু জীবনে ৩২ নম্বরে আসবেন না।’ বঙ্গমাতার নির্দেশই সেদিনের ইতিহাস। পাকিস্তানি সামরিক জান্তারা মাথা নত করেছিল বঙ্গবন্ধুর দৃঢ়তার কাছে। বঙ্গবন্ধুর নিঃশর্ত মুক্তি বাঙালি জাতিকে মুক্তির সংগ্রামে আরও বেশি অনুপ্রাণিত করেছিল।

১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। দেশ তখন উত্তাল। জনসমুদ্র প্রবহমান রেসকোর্স ময়দানের দিকে। সারাদেশ আজ অপেক্ষমাণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের নির্দেশনার জন্য। বেগম মুজিব বঙ্গবন্ধুকে দশ মিনিট বিশ্রাম নিতে বললেন। প্রিয় নেত্রী দেশরত্ন শেখ হাসিনার ভাষায়, ‘আমি মাথার কাছে বসা, মা মোড়াটা টেনে নিয়ে আব্বার পায়ের কাছে বসলেন। মা বললেন, মনে রেখো তোমার সামনে লক্ষ মানুষের বাঁশের লাঠি। এই মানুষগুলোর নিরাপত্তা এবং তারা যেন হতাশ হয়ে ফিরে না যায় সেটা দেখা তোমার কাজ। কাজেই তোমার মনে যা আসবে তাই তুমি বলবা, আর কারো কোনো পরামর্শ দরকার নাই। তুমি মানুষের জন্য সারা জীবন কাজ করো, কাজেই কী বলতে হবে তুমি জানো। এত কথা, এত পরামর্শ কারো কথা শুনবার তোমার দরকার নেই। এই মানুষগুলোর জন্য তোমার মনে যেটা আসবে, সেটা তুমি বলবা।’ বঙ্গবন্ধুর সেদিনের সেই ভাষণ আজ বিশ্বের সবচেয়ে অনুপ্রেরণামূলক ভাষণগুলোর মধ্যে অন্যতম।

একটি মানচিত্রের জন্য, একটি পতাকার জন্য, সার্বভৌমত্বের জন্য যে সংগ্রাম ও আন্দোলনের অগ্রভাগে নেতৃত্ব দিয়েছেন শেখ মুজিব সে সংগ্রাম ও আন্দোলনের অন্তরালে ছিলেন বেগম মুজিব। এ যেন কবি কাজী নজরুলের ‘কোনোকালে একা হয়নিকো জয়ী, পুরুষের তরবারী;/প্রেরণা দিয়েছে, শক্তি দিয়াছে, বিজয়ালক্ষ্মী নারী’ পঙ্ক্তির পরিপূর্ণ চিত্ররূপ।

বাংলাদেশ স্বাধীন হলো। বাঙালি জাতি একটি মানচিত্র পেল। একটি লাল-সবুজের পতাকা পেল। বঙ্গবন্ধু স্বাধীনতা ও স্বাধিকার সংগ্রামে বিজয়ী হয়ে আবারও নেমে পড়লেন ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত স্বপ্নের সোনার বাংলা বিনির্মাণের লড়াইয়ে। বেগম মুজিব সে সংগ্রামেও বঙ্গবন্ধুর ছায়া-যোদ্ধা হিসেবে নিজেকে নিবেদন করলেন। সদ্য ভূমিষ্ঠ দেশটিতে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধান ও উচ্চ পর্যায়ের কর্তা-ব্যক্তিরা সফর করা শুরু করলেন। বেগম মুজিব রাষ্ট্রীয় অতিথিদের নিজ হাতে রান্না করে আপ্যায়ন করতেন। তদানীন্তন বিশ্বের সবচেয়ে সিংহ হৃদয়ের ব্যক্তিত্ব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের স্ত্রী নিজ হাতে রান্না করে আপ্যায়ন করছেন, এর চেয়ে আন্তরিক আতিথেয়তা আর কী হতে পারে? বঙ্গমাতার এই গুণ বাংলাদেশের সঙ্গে অন্যান্য দেশের বৈদেশিক সম্পর্কেও অবদান রাখতো।

পান এবং পানের বাটা ছিল বেগম মুজিবের জীবন যাপনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ইন্দিরা গান্ধী যেবার ঢাকায় এলেন সেবার রেসকোর্স ময়দানে ‘ইন্দিরা মঞ্চ’-এ উপস্থিত হয়েছিলেন আমাদের বঙ্গমাতা তাও আবার বঙ্গবন্ধুর প্রচ- জোরাজুরিতে এবং তাঁর জীবনে প্রথমবারের মতো কোনো রাজনৈতিক মঞ্চে। আটপৌরে শাড়ি পরে অভ্যস্ত বেগম মুজিব সেদিন একটি অভিজাত কাতান শাড়ি পরেছিলেন। বিলাসী জীবন-যাপনে অনভ্যস্ত বেগম মুজিব মঞ্চে দাঁড়িয়ে একহাতে তাঁর কাতান শাড়ির ঠিক করছিলেন বারবার, আরেক হাতে পানের বাটাটি আঁচল তলে লুকিয়ে রাখছিলেন। এক সময় বঙ্গবন্ধু মৃদুস্বরে ধমকে উঠলেন, বললেন, ‘ওটা আবার নিয়ে আসলা ক্যান?’ প্রত্যুত্তরে বঙ্গমাতার মুখে অপ্রস্তুত হাসি। তারপর পানের বাটাটি আঁচলের তলে ভালো করে লুকিয়ে রাখলেন। আমাদের বঙ্গমাতা ছিলেন এমনই সহজ, সরল ও সর্বান্তকরণে গ্রাম্যবধূ।

এই সর্বংসহা নারী জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত জাতির পিতার পাশে থেকে দেশ ও জাতির সেবা করে গেছেন। বেছে নিয়েছেন সহমরণের পথ। নারী জাগরণের উজ্জ্বলতম ও অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব আমাদের নারী সমাজকে এক নব দিগন্ত দেখিয়েছেন। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে জানাই মণিদীপ্ত শ্রদ্ধা।

জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
জয় হোক বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেসা মুজিবের।

লেখক :শেখ ফয়সল আমীন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।