বরিশাল-পায়রাবন্দর রেলপথ বাস্তবায়নের উদ্যোগ

বাস্তবায়নের পথে এগুচ্ছে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল হয়ে পায়রাবন্দর পর্যন্ত রেলপথ। এর মাধ্যমে পূরণ হতে যাচ্ছে বরিশালবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা। দীর্ঘদিন ঝুলে থাকার পর অবশেষে এ রুটে একটি ব্রড গেজ রেললাইন স্থাপনের জন্য সম্ভাব্য বিস্তারিত সমীক্ষার প্রস্তুতির চূড়ান্ত পর্যায়ে পেঁৗছেছে। সরকারের অনুমোদন পেলে শিগগিরই তা শুরু হবে।
এ অঞ্চলের লোকজনের দীর্ঘদিনের দাবি_ বরিশালকে রেলওয়ে নেটওয়ার্কের আওতাভুক্ত করা। তবে বিভিন্ন সরকারের সময়ে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা হয়ে বরিশাল পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিলেও তার বাস্তবায়ন দেখা যায়নি। বর্তমানে এ অঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম মাধ্যম নৌ ও সড়কপথ। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রাবন্দরকে সরকারের অগ্রাধিকার প্রকল্পের তালিকায় যুক্ত করেন। তারপর থেকেই রেলপথ স্থাপনের বিষয়টি বেশ গতি পায়।
এ নিয়ে সম্প্রতি পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সদস্য খোরশেদ আলম চৌধুরীর সভাপতিত্বে ‘নকশা প্রণয়ন ও দরপত্র সেবাসহ ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণের জন্য সম্ভাব্য সমীক্ষা’ শীর্ষক প্রকল্পের ওপর প্রাক মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বরিশাল পর্যন্ত সমীক্ষা করার কথা থাকলেও সভায় তা বাড়িয়ে পায়রাবন্দর পর্যন্ত রুটের সমীক্ষার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আগামী এক বছরের মধ্যে এ কাজ শেষ হবে। এজন্য শুরুতে সমীক্ষা ব্যয় ২৪ কোটি টাকা ধরা হলেও এখন তা বাড়িয়ে ৪০ কোটি টাকা করা হচ্ছে।
সভায় জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত রেলপথ নির্মাণে নির্দেশনা দিয়েছেন। পায়রাবন্দর নির্মিত হলে এ অঞ্চল দিয়ে দেশের আমদানি-রপ্তানি বিপুল পরিমাণে বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি ভাঙ্গা জংশন থেকে বরিশাল হয়ে পটুয়াখালীর পায়রা পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ করা হলে দেশের ব্যবসায়-বাণিজ্যেও যোগাযোগের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন ঘটবে।
পরিকল্পনা কশিনের কর্মকর্তারা জানান, দেশের অর্থনীতির জন্য দক্ষিণাঞ্চল ও পায়রাবন্দরসহ সংশ্লিষ্ট এলাকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ। কেননা পায়রা দেশের তৃতীয় সমুদ্রবন্দর। আবার পটুয়াখালীতে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন স্পট কুয়াকাটার অবস্থান। মৎস্যসম্পদ আহরণেও এ এলাকার গুরুত্ব অনেক। আবার এখানেই একটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের কথা রয়েছে। সব মিলিয়ে এ অঞ্চলে সহজে যোগাযোগের জন্য রেল সংযোগের বিকল্প নেই। ভবিষ্যতে পায়রা হয়ে কুয়াকাটায় রেল স্থাপনের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এ ছাড়া এ অঞ্চলে রেল যোগাযোগ হলে তা শুধু আমদানি-রপ্তানিই নয় বরং কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতে গমন আরো সহজ হবে। এতে এ অঞ্চলের পর্যটনও সমৃদ্ধ হবে। পর্যটন ও স্থানীয় আয়ও বাড়বে।
এদিকে পায়রাবন্দর, কুয়াকাটা পর্যন্ত রেললাইন স্থাপনে কয়েকটি দেশ বিনিয়োগে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। সম্প্রতি নিজেদের ইচ্ছার কথা জানায় যুক্তরাজ্য। গত বৃহস্পতিবার বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত অ্যালিসন ব্লেইকের সঙ্গে বৈঠকে দেশটির এ আগ্রহের কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদ। তারা পায়রা সমুদ্রবন্দরকে আরো কার্যকর করা এবং পদ্মা সেতু থেকে কুয়াকাটা পর্যন্ত রেল সংযোগে বিনিয়োগ করতে চায় বলে জানান মন্ত্রী।
সমীক্ষা প্রকল্প সম্পর্কে বাংলাদেশ রেলওয়ের সূত্রে জানা গেছে, ঢাকার সঙ্গে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম ও দক্ষিণ অঞ্চলে সরাসরি যোগাযোগ স্থাপনের জন্য পদ্মা সেতু নির্মাণ হচ্ছে। পদ্মা সেতুতে রেললাইন স্থাপনের জন্য চলতি বছরের ৩ মে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্প অনুমোদন হয়। যা রেল যোগাযোগের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে প্রথম ধাপে ঢাকা থেকে ভাঙ্গা এবং দ্বিতীয় ধাপে ভাঙ্গা থেকে যশোর পর্যন্ত রেললাইন নির্মাণ করা হবে। ঢাকা থেকে বরিশাল হয়ে নির্মাণাধীন পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর পর্যন্ত সরাসরি রেললাইন (ব্রড গেজ) স্থাপনের পরিকল্পনা করা হয়েছে। ফলে বরিশাল বিভাগীয় শহর, ঢাকা, খুলনা রাজশাহীসহ অন্যান্য স্থান রেল সংযোগের আওতায় আসবে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ফরিদপুরের ভাঙ্গা থেকে বরিশাল পর্যন্ত রেল সংযোগের জন্য সম্ভাব্য সমীক্ষা প্রকল্পটি নেয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে।
জানা গেছে, এ প্রকল্পে মাধ্যমে রেললাইন স্থাপনের সম্ভাব্য, সেফগার্ড পলিসি সমীক্ষা, প্রকল্পের আর্থিক ও অর্থনৈতিক উপযোগিতা নির্ণয়, বিস্তারিত ইঞ্জিনিয়ারিং ড্রয়িং ও ডিজাইন, ড্রয়িংয়ের ভিত্তিতে প্রস্তাবিত ব্যয় নির্ধারণ এবং সে আলোকে দরপত্রের দলিল প্রস্তুত করা হবে।
এদিকে স্বল্পপরিসরে পায়রার বাণিজ্যিক অভিযাত্রা শুরু হয়েছে ৩০ জুলাই। পদ্মা সেতু প্রকল্পের পাথর নিয়ে পায়রাবন্দরে নোঙর করেন চীনা জাহাজ। তবে এই গভীর সমুদ্রবন্দর পুরোপুরি চালু হবে ২০১৮ সালে। পুরো তৈরি হলে পায়রাতে ২৫০ মিটার দৈর্ঘ্য জাহাজ আসতে পারবে। আর চট্টগ্রাম বন্দরে সর্বোচ্চ ১৮৬ মিটার দৈর্ঘ্যের জাহাজ আসে। মাদার ভ্যাসেল বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজে এই বন্দরে পণ্য আসা-যাওয়া করবে। পায়রাবন্দর ব্যবহারে ব্যবসায়ীদের উৎসাহিত করতে পণ্য আমদানিতে শুল্ক ছাড়ের বিশেষ সুবিধাও দিতে যাচ্ছে সরকার।
রেল যোগাযোগ হলে এটি দেশের ব্যস্ততম বন্দরে পরিণত হবে। এ বন্দরকে ঘিরে জেটি, কন্টেইনার টার্মিনাল, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ, এলএনজি টার্মিনাল নির্মাণ, ‘পায়রা কাস্টমস হাউস’সহ বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকা- শুরু হবে। সমুদ্রবন্দরের পাশে প্রায় ৫০০ একর জমির ওপর স্থাপিত হচ্ছে আধুনিক শেরেবাংলা আবুল কাশেম ফজলুল হক নৌঘাঁটি। এ এলাকায় গড়ে উঠবে বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সার কারখানা, বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (এসইজেড) জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও মৎস্য প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল। উপকূলজুড়ে সবুজ বেষ্টনী তৈরি করবে ইকো-ট্যুরিজমের সুবর্ণ সুযোগ।