পাহাড়ে লোভনীয় পেয়ারা

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পটিয়া, চন্দনাইশ, বোয়ালখালী, সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও লোহাগাড়া উপজেলায় অন্তত ১৫-২০ হাজার একর পাহাড় ও পাহাড়ের পাদদেশে কয়েক হাজার পেয়ারা বাগান রয়েছে। তবে পটিয়া উপজেলার খরনা, কেলিশহর, হাইদগাঁও শ্রীমাই এলাকা, চন্দনাইশ উপজেলার হাশিমপুর, জঙ্গল হাশিমপুর, ছৈয়দাবাদ, লট এলাহাবাদ, কাঞ্চননগর, দোহাজারী, ধোপাছড়ি এলাকার উৎপাদিত পেয়ারা সর্বোকৃষ্ট। কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ জানায়, মৌসুমে পেয়ারা বাগানগুলোতে হেক্টরপ্রতি গড়ে ১৫-১৬ টন করে পেয়ারা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়। মৌসুমে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশ ঘেঁষে গড়ে ওঠা দোহাজারী, বাগিচাহাট, খানহাট, কাঞ্চননগর, চক্রশালা, হামিশমুর, বাদামতল, রৌশনহাট ও পটিয়া কমলমুন্সীরহাট, দারোগা হাট, হাইদগাঁও সাতগাউছিয়া মাজার গেইট, পান বাজার, ভট্টাচার্য হাট, এলাকায় রীতিমতো বসে পাইকারি পেয়ারার হাট। সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়, পটিয়া উপজেলার খরনা, কেলিশহর, হাইদগাঁও পাহাড়ি এলাকায় পার্শ্ববর্তী উপজেলা চন্দনাইশে কাঞ্চননগর, লর্ট এলাহাবাদ, ধোপাছড়ি, হাশিমপুর পেয়ারা বাগানের গাছে গাছে প্রচুর ফলন হয়েছে। প্রতিটি গাছে ঝুলে থাকা থোকায় থোকায় রঙিন পেয়ারা পাহাড়টিকে ভিন্ন ভিন্ন রূপে সাজিয়েছে। সবুজপাতার ডালগুলো যেন রঙিন পেয়ারার ভারে হেলে পড়েছে। এসব এলাকার অসংখ্য মানুষ পেয়ারা চাষ করে লাভবান হচ্ছে। এসব পেয়ারার সাথে এলাকার বেকার যুবসমাজ জড়িয়ে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলেছে। এভাবে চলবে তিন মাস। পেয়ারা চাষ সৌভাগ্যের যাদু লাগিয়ে দিয়েছে চন্দনাইশের প্রায় ২০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকায়। কিছু বিপণন সমস্যা ও প্রক্রিয়াজাতকরণের সমস্যা রয়েছে। কোল্ড স্টোরেজ না থাকায় উৎপাদিত ফলমূলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন কৃষকরা। পটিয়া উপজেলায় প্রায় দুই হাজার একর এলাকায় পাহাড়ি ও সমতল ভূমিতে পেয়ারা চাষ হয়ে থাকে। বেসরকারিভাবে তা ৪ হাজার একরেরও বেশি।
এসব এলাকায় ২৫ হাজারের অধিক বাগান রয়েছে বলে চাষিরা জানান। এসব উৎপাদিত পেয়ারা বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট কোনো জায়গা না থাকায় চট্টগ্রাম-কক্সবাজার মহাসড়কের পাশে রওশনহাট, বিজিসি ট্রাস্ট মেডিকেল গেইট, বাদামতল, বাগিচাহাট, খানহাট রেলস্টেশন, গাছবাড়িয়া কলেজ গেট, চা-বাগান রাস্তার মাথা, কমল মুন্সির হাট এসব এলাকার রাস্তার দুই পাশে চাষিরা পেয়ারা এনে বিক্রি করতে দেখা যায়। প্রতি বছর আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত তিন মাস এ বাজার নিয়মিত বসে। এ সময় প্রতিটি হাট-বাজারে প্রায় অর্ধ লক্ষাধিক টাকা নিলাম ডাকা হয়। উপজেলার বিভিন্ন হাট-বাজারে প্রচুর পরিমাণে পেয়ারা বিক্রি হয়ে থাকে। পেয়ারা চাষিদের মতে, কুদৃষ্টি পড়লে ফলন ভালো হয় না এবং স্বাদ ও সুগন্ধ কমে যায়। তাই লালসালুতে করে পেয়ারা বাজারে আনা হয়ে থাকে। পেয়ারা বাগান মালিক ও পাইকারি পেয়ারা বিক্রেতারা জানান, এখানকার সুস্বাদু পেয়ারা এখন চট্টগ্রামের গড়ি পেরিয়ে সৌদি আরব ও আরব আমিরাতসহ বেশ কয়েকটি দেশে রীতিমতো রপ্তানি হচ্ছে। এসব পেয়ারা গেরস্তির বাড়িভিটা, শঙ্খ, পটিয়ার শ্রীমাই, খরনা খালের দুই তীরবর্তী পাহাড় ঘেঁষে ব্যাপক হারে পেয়ারা জন্মে। এছাড়াও চন্দনাইশের কাঞ্চননগর, হাশিমপুর, ছৈয়দাবাদ, পূর্ব এলাহাবাদ, লট এলাহাবাদ, দোহাজারী রায়জোয়ারা, লালুটিয়ায় ৩০ কি.মি. এলাকায় ২০ হাজারের বেশি বাগানে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে চাষ হয়। গুণগতমানে চন্দনাইশে ১৩ রকমের পেয়ারা উৎপাদিত হয়। তম্মধ্যে দুই ধরনের পেয়ারা খুবই পরিচিত এবং সুস্বাদু। পেয়ারাগুলোর মধ্যে রয়েছে কাঞ্চননগর ও মুকুন্দপুরী। বারি পেয়ারা-২ ও ৩, বাউ পেয়ারা-১, ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৮, ৯ ও ইপ্সা পেয়ারা। কাজী পেয়ারা ও কাঞ্চন পেয়ারা খুবই সুস্বাদু এবং স্বনামধন্য। কাঞ্চন পেয়ারা সাইজে বড় এবং সুস্বাদু। এছাড়া সাহেব পেয়ারা ও মাথা পেয়ারাও রয়েছে। গুণগতমানের দিক দিয়ে এসব পেয়ারার সুনাম রয়েছে দেশব্যাপী। চন্দনাইশের কাঞ্চন পেয়ারা সর্বোচ্চ ১ কেজি ও সর্বনিম্ন ২৫ গ্রাম পর্যন্ত হয়ে থাকে। অনেকে এ পেয়ারাগুলোকে দেশীয় আপেল বলে থাকে। কৃষি অধিদপ্ততর চট্টগ্রামের উপপরিচালক আমিনুল হক জানান, জুলাই থেকে শুরু করে অক্টোবর মাস পর্যন্ত একটানা চার মাস সুস্বাদু এই পেয়ারা পাওয়া যায়। এখানে প্রতি হেক্টরে ২০ টন পেয়ারা উৎপাদিত হয়। এই অঞ্চলের চাষিরা পেয়ারা গাছে রাসায়নিক সার প্রয়োগ ও কীটনাশক ছিটায় না। তাছাড়া পেয়ারা সংরক্ষণেও কোনো ধরনের ফরমালিন বা কোনো মেডিসিন ব্যবহার করে না বলে তিনি এ অঞ্চলের উৎপাদিত পেয়ারাকে খুবই স্বাস্থ্যসম্মত বা অর্গানিক বলে জানিয়েছেন।