মীরসরাইয়ের পাহাড়ি ঝরনা মুগ্ধ পর্যটক

প্রকৃতির অপূর্ব এক সৃষ্টি মীরসরাইয়ের খৈয়াছরা, নাপিত্তাছরা ও মহামায়া ঝরনা। টলমলে স্বচ্ছ পানির ধারা গড়িয়ে পড়ছে শক্ত পাথরের মতো পাহাড়ের শরীর লেপ্টে। নির্জন-শান্ত পাহাড়ের প্রায় আটটা ধাপ পেরিয়ে আছড়ে পড়া স্রোতধারা কলকল শব্দে বয়ে যাচ্ছে সমতলে। নাম না জানা লতাপাতা-গুল্ম, বাঁশবন, বুনোফুল ও ফলের গাছ আগলে রেখেছে পরম মমতায় সৃষ্টির বিস্ময় এই ঝরনাটিকে। যে বুনো ঝরনার অপরূপ সৌন্দর্য থেকে চোখ ফেরানো যায় না সহজে। সৃষ্টির সৌন্দর্য্য আর প্রকৃতির মাধুর্য্য- এই দুই মিলে যখন তৈরি হয় এক অপরূপ মিশ্রন, তখন তার দর্শনে বেঁচে থাকার ইচ্ছে হয়ে ওঠে আরেকটু প্রবল। প্রকৃতির পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে চলেছে ঝরনা। দূর থেকে বাংলার প্রতি প্রান্তঘেরা সবুজ-শ্যামল মিলন যেন প্রকৃতির রূপের এক বিশাল ক্যানভাস। উঁচু-নিচু অসংখ্য পাহাড় আর পাহাড়ের গায়ে নাম না জানা নানা রকম গাছের সবুজ পাহাড়কে মনে হয় যেন এক সবুজের অভয়ারণ্য। আর এই সবুজ পাহাড়ের বুক চিরে কলকল ধ্বনিতে নেমে আসছে বুনো ঝরনা খৈয়াছরা। মীরসরাইয়ের ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বড়তাকিয়া এলাকার খৈয়াছরা উচ্চ বিদ্যালয়ের উল্টো দিকের মূল রাস্তা থেকে পিচঢালা পথ চলে গেছে রেললাইন পর্যন্ত। সেখান থেকে মেঠোপথ আর খেতের আইলের শুরু। তারপর চলতে চলতে হঠাৎ করেই যেন মাটি সরে গিয়ে উদয় হবে একটা ঝিরিপথের। টলটলে শান্ত পানির চুপচাপ বয়ে চলার ধরনই বলে দিবে এর উৎস অবশ্যই বিশাল কিছু থেকে। স্থানীয় লোকদের খেতের আইলের পাশে বেড়ে উঠেছে আম, নারকেল আর পেঁপের বাগান। এরপরে শুধু ঝিরিপথ ধরে এগিয়ে যাওয়া। কিছুক্ষণের মধ্যেই পর্যটকরা আবিষ্কার করবেন লাল আর নীল রঙের ফড়িংয়ের মিছিলে! যত দূর পর্যন্ত ঝিরিপথ গেছে তত দূর পর্যন্ত তাদের মনমাতানো গুঞ্জন শোনা যায়। হাঁটতে হাঁটতেই শুনতে পাওয়া যায় পানি পড়ার শব্দ। চারপাশে মন ভালো করে দেয়া সবুজ দোল খাচ্ছে ফড়িংয়ের পাখায়। মাঝে মাঝে এখানে হরিণের ডাক শোনা যায়। কিছু দূর হেঁটে একটা মোড় ঘুরলেই চোখের সামনে নিজের বিশালতা নিয়ে হাজির হবে খৈয়াছরা ঝরনা। অনেক ওপর থেকে একটানা পানি পড়ছে। সৌন্দর্যের শুরু এখান থেকেই, পর্যটকরা এখান পর্যন্ত এসেই চলে যায়, উপরের দিকে আর যায় না। এই ঝরনার উপরে আছে আরো আটটা ধাপ। এখানকার নয়টা ধাপের প্রতিটিতেই রয়েছে প্রশস্ত জায়গা, যেখানে তাঁবু টানিয়ে আরাম করে পূর্ণিমা রাত পার করে দেয়া যায়। একটু চুপচাপ থাকলেই বানর আর হরিণের দেখা পাওয়া যায়। অদ্ভুত সুন্দর এই সবুজের বনে একজনই সারাক্ষণ কথা বলে বেড়ায়, বয়ে যাওয়া পানির রিমঝিম ঝরনার সেই কথা শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়া যায় নিশ্চিন্তে। পাহাড়ের সবুজ রং আর ঝরনার স্বচ্ছ জল মিলেমিশে একাকার হয়েছে মীরসরাইয়ের প্রাকৃতিক জলপ্রপাত খৈয়াছরা ঝরনায়। প্রকৃতির নান্দনিক তুলিতে আঁকা এ ছবি দেখে মুগ্ধ হচ্ছে দেশের ভ্রমণপিয়াসী মানুষ। যারা একবার খৈয়াছরা ঝরনা দেখেছেন তাদের মনে একটিই প্রশ্ন উঁকি দেয় বারবার ‘দেশে এমন সৌন্দর্যের ঝরনা দ্বিতীয়টি আর আছে কিনা।’ এমনই এক নান্দনিক ঝরনা পর্যটকদের আকর্ষণ করছে যা খৈয়াছরা ঝরনা নামেই পরিচিত। খৈয়াছরা এলাকার পাহাড়ে অবস্থান বলে এর নামকরণ করা হয়েছে খৈয়াছরা ঝরনা। আর এই ঝরনা দেখতে এসে বিমুগ্ধ হচ্ছে দেশ বিদেশের পর্যটকরা। যাতে সত্যিই হতবাক হচ্ছে না কেউ এখন। কারণ ঝরনার পাশে গেলে দর্শনার্থীরা অবাক হচ্ছে এজন্য যে, এখানকার পাহাড়ি অরন্যে এতকাল লুকিয়ে ছিল এমন নান্দনিক অপরূপ সুন্দর ঝরনা। দেশের ভ্রমণপিপাসুদের মধ্যে তাই এই খৈয়াছরা ঝরনা এক নামেই পরিচিত। একবার খৈয়াছরা ঝরনা দেখেছেন তাদের মনে একটিই প্রশ্ন উঁকি দেয় বারবার ‘দেশে এমন সৌন্দর্যের ঝরনা দ্বিতীয়টি আর আছে কিনা।’ এখানে আসা অনেক পর্যটকের মতে, ‘দেশের মাধবকুণ্ড ও শুভলং ঝরনার থেকেও বেশি রূপ এটির।’ তাদের কথায়, ‘শুধু সরকারের অবহেলায় এটি সর্বত্র অপ্রকাশিত রয়ে গেছে।’ চট্টগ্রাম জেলার মীরসরাই উপজেলার খৈয়াছরা ইউনিয়নের বড়তাকিয়া বাজারের উত্তর পাশে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের ৪.২ কিলোমিটার পূর্বে ঝরনার অবস্থান। এর মধ্যে ১ কিলোমিটার পথ গাড়িতে যাওয়ার পর বাকি পথ যেতে হবে পায়ে হেঁটে। বাঁশের সাঁকো, আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথ, ছরা এবং ৪টি সু-পাহাড় পেরিয়ে যেতে হবে প্রকৃতির এই বিস্ময় সান্নিধ্যে। এবার ঈদের পর থেকে এখানে পর্যটকের ঢল নেমেছে অনেকটা। তাদের অনেকেই এসেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ঝরনার অপরূপ দৃশ্যের ছবি দেখে। খুলনার আবদুল্লাহ আল মামুন, বগুড়ার আহমেদ জাকি জিমি, ঢাকার রাসেল পাটোয়ারী, যশোরের আবদুল্লাহ গাজী, একেএম রনি ফেসবুকে খৈয়াছরা ঝরনার ছবি দেখে মুগ্ধ হয়েছেন। তাই সবাই মিলে এসেছেন এখানে। আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘দেশের বিখ্যাত অনেক প্রাকৃতিক ঝরনা আমি দেখেছি। খৈয়াছরা ঝরনার যে সৌন্দর্য তা দেশে দ্বিতীয়টি আর আছে কি-না আমার জানা নেই।’ প্রকৃতি এখানে খেলা করে আপন মনে, গহিন বনে ছলাৎ-ছলাৎ শব্দে বয়ে চলা ঝরনাধারা এখানে ছুটেই চলছে অবিরত। এখানে গা ভিজিয়ে মানুষ যান্ত্রিক জীবনের অবসাদ ধুয়ে যেন সজীব করে নিজেদের। পাহাড়ি এই ঝরনা ভ্রমণপিপাসু পর্যটকদের হাতছানি দিয়ে কাছে ডাকছে প্রতিনিয়ত।