গত বছর ৪৪ বিলিয়ন ডলারের এলসি খুলেছেন ব্যবসায়ীরা

বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা গত অর্থবছরে পণ্য আমদানির জন্য সবমিলিয়ে চার হাজার ৩৩৩ কোটি ৫৩ লাখ (৪৩.৩৩ বিলিয়ন) ডলারের এলসি (ঋণপত্র) খুলেছেন। এই অঙ্ক তার আগের বছরের চেয়ে দশমিক ৬২ শতাংশ বেশি। একই সঙ্গে ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সবমিলিয়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। তবে বিশ্ববাজারে দাম কম থাকায় খাদ্যপণ্য এবং জ্বালানি তেলের এলসি খোলার পরিমাণ ছিল খানিকটা কম। তবে তবে শিল্পের কাঁচামাল এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির (ক্যাপিটাল মেশিনারি) আমদানি বেড়েছে।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, পদ্মা সেতুসহ সরকারের বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নকে ঘিরে দেশে বিনিয়োগের নতুন ‘আবহ’ তৈরি হয়েছে। উদ্যোক্তারা এ সুযোগ কাজে লাগাতে চাইছেন বলেই শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতির (ক্যাপিটাল মেশিনারিজ) আমদানি বেড়ে গেছে।

পণ্য আমদানি সংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, গত ৩০ জুন শেষ হওয়া ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে পণ্য আমদানির জন্য মোট ৪৩ দশমিক ৩৩ বিলিয়ন ডলারের এলসি খোলা হয়েছে।

২০১৪-১৫ অর্থবছরে এলসি খোলার পরিমাণ ছিল ৪৩ দশমিক ০৬ বিলিয়ন ডলার। এ হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে দশমিক ৬২ শতাংশ। তথ্যে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিল্পের কাঁচামাল আমদানির জন্য এক হাজার ৬৮২ কোটি ৮০ লাখ (১৬.৮৩ বিলিয়ন) ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ বেশি। আর মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার পরিমাণ বেড়েছে ১০ দশমিক ২৭ শতংশ।

২০১৫-১৬ অর্থবছরে শিল্প স্থাপনের জন্য প্রয়োজনীয় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ৩৫৩ কোটি ৩৫ লাখ ডলারের এলসি খোলা হয়েছে। আগের অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল ৩০৯ কোটি ৬৮ লাখ ডলার।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষক জায়েদ বখত বলেন, পদ্মা সেতু, মগবাজার-মালিবাগ-মৌচাক ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল এবং কয়েকটি বড় বিদ্যুত কেন্দ্রের কাজ শুরু হয়েছে। এ সব ‘মেগা প্রকল্পের’ কাজ শেষ হলে দেশে শিল্প খাতের ব্যাপক প্রসার ঘটবে। এ সব বিবেচনায় নিয়েই আমাদের ব্যবসায়ী-শিল্পপতিরা বিদ্যমান শিল্প প্রতিষ্ঠানের পাশপাশি নতুন নতুন শিল্পের জন্য ক্যাপিটাল মেশিনারিজ আমদানি করছেন। ভবিষ্যত ব্যবসা মাথায় রেখেই তারা এটা করছেন। আর দেশে ‘স্থিতিশীল রাজনৈতিক পরিবেশে’ বিরাজ করায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে সেই আস্থা ফিরতে শুরু করেছে বলে মনে করেন তিনি। তার মতে, বিশ্ব পরিন্ডলেও বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে। আগামী বেশ কিছুদিন এই পরিবেশ থাকবে বলে সবাই ধারণা করছেন। সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশে এখন বিনিয়োগের একটা সুষ্ঠু পরিবেশ দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক খুবই কম। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুল্ক শূন্য। কোনটিরই ৩ শতাংশের বেশি নয়। এ কারণে এ ধরনের পণ্য আমদানির এলসি খুলতে শুল্ক বাবদ খুব একটা খরচ হয় না। সে সুযোগে ‘ওভার ইনভয়েসের’ মাধ্যমে ক্যাপিটাল মেশিনারিজের এলসি খোলার মাধ্যমে বিদেশে অর্থ পাচার করে থাকেন কিছু অসৎ ব্যবসায়ী।

অনেক সময় ক্যাপিটাল মেশিনারিজের নামে খালি কন্টেনারও দেশে আসছে। বন্দরে মাঝেমধ্যে এ ধরনের কন্টেনার ধরা পড়েছে। আবার কখনও কখনও ক্যাপিটাল মেশিনারিজের নামে এলসি খুলে কনজ্যুমার প্রোডাক্ট আমদানি করা হয়। এভাবে নানা প্রক্রিয়ায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির নামে অর্থ দেশের বাইরে চলে যায় বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে চাল ও গম আমদানির জন্য গত অর্থবছরে ১০৯ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ কম। আগের অর্থবছরে এই দুটি পণ্য আমদানির জন্য ১৭৪ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছিল। গত অর্থবছরে জ্বালানি তেল আমদানির জন্য ২২০ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরে ছিল ৩৩৭ কোটি ২৮ লাখ ডলার। এ হিসাবে তেল আমদানির এলসি কমেছে ৩৫ শতাংশ। এই কয়েকটি পণ্যের বাইরে অন্য সব পণ্য আমদানির জন্য ১ হাজার ৮৪২ কোটি ডলারের এলসি খোলা হয়েছে, যা আগের বছরের চেয়ে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সবমিলিয়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারের এলসি নিষ্পত্তি হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছর শেষে ৪ হাজার ৩০৬ কোটি ৮৭ লাখ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ এলসি খোলা হয়েছে। এলসি খোলার হার ২ দশমিক ৯৯ শতাংশ। ওই অর্থবছরে এলসি নিষ্পত্তি হয় ৩৮ দশমিক ৪৫ বিলিয়ন ডলার। যা ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। এর আগের ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ৪ হাজার ১৮১ কোটি ৮৫ লাখ ডলারের সমপরিমাণ এলসি খোলা হয়।