ব্যবসায় টিকে থাকায় এগিয়ে বাংলাদেশী উদ্যোক্তারা

ব্যবসার প্রথম বছরটি সব দেশের ব্যবসায়ীদের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যবসার শুরুতেই মুখ থুবড়ে পড়তে দেখা যায় স্বল্পোন্নত, এমনকি উন্নত দেশের অনেক উদ্যোগও। যদিও বাংলাদেশ এক্ষেত্রে অনেকটাই ব্যতিক্রম। বিশ্বব্যাংকের গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে রফতানি খাতের ব্যবসা শুরুর পর ৫৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠানই টিকে থাকে।
এর কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও লড়াই করে টিকে থাকা ও ক্ষেত্রবিশেষে প্রত্যাবর্তন এ ভূখণ্ডের মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। এর প্রতিফলন দেখা যায় ব্যবসা-বাণিজ্যেও।
প্রতিকূলতার মধ্যেও রফতানিমুখী ব্যবসায় বাংলাদেশের টিকে থাকার চিত্র উঠে এসেছে বিশ্বব্যাংকের ‘স্ট্রেনদেনিং কম্পিটিটিভনেস ইন বাংলাদেশ-থিমেটিক অ্যাসেসমেন্ট, এ ডায়াগনস্টিক ট্রেড ইন্টিগ্রেশন স্টাডি’ শীর্ষক প্রতিবেদনে। বাংলাদেশসহ আটটি দেশের রফতানিকারকদের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনা করে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে। অন্য দেশগুলোর মধ্যে আছে— কম্বোডিয়া, ইথিওপিয়া, লেসোথো, নেপাল, পাকিস্তান, রোমানিয়া ও তুরস্ক।
প্রতিবেদনে আলোচ্য দেশগুলোয় এক বছরে কয়টি প্রতিষ্ঠান রফতানিমুখী ব্যবসায় প্রবেশ করছে, কয়টি বেরিয়ে যাচ্ছে ও কয়টি টিকে থাকছে তার পর্যালোচনা করা হয়েছে। ২০০৮ থেকে ২০১২ সালের রফতানিমুখী ব্যবসায় আসা প্রতিষ্ঠানগুলোর তথ্য-উপাত্ত এখানে বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। তাতে দেখা গেছে, ওই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ১ হাজার ৯২৪টি প্রতিষ্ঠান রফতানিমুখী ব্যবসায় প্রবেশ করে। এর মধ্যে প্রথম বছরে টিকে থাকার হার ৫৯ শতাংশ।
রফতানিকারকদের সংগঠন এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী বণিক বার্তাকে বলেন, বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের বিশেষ করে যারা রফতানি বাণিজ্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত, তাদের যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবেলার সক্ষমতা অনেক বেশি। অনেক বেশি কর্মক্ষমতাও তাদের রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংযোগ এ সক্ষমতার অন্যতম কারণ। এছাড়া বাংলাদেশের শিল্প ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যাবে, বহু ঘাত-প্রতিঘাত পেরিয়ে আমরা আজকের অবস্থানে এসেছি। সব মিলিয়েই বাংলাদেশের রফতানি খাতের ব্যবসায়ীদের টিকে থাকার ক্ষমতা অন্যান্য দেশের সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের তুলনায় বেশি। প্রতিনিয়ত নানা প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়াই করেই এ সক্ষমতা অর্জন করেছেন রফতানিকারকরা। সরকারের নীতিসহায়তার পাশাপাশি সার্বিক ভৌত অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করতে পারলে দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ক্রমেই অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠবে।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, কম্বোডিয়ায় ২০০৮ থেকে ২০১২ পর্যন্ত মোট ২০১টি নতুন রফতানিকারক প্রতিষ্ঠানের আবির্ভাব ঘটে। এর মধ্যে প্রথম বছরে টিকে থাকার হার ৫৬ শতাংশ। ইথিওপিয়ার ক্ষেত্রে ২০১০ থেকে ২০১২ দুই বছরে তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এ দুই বছরে দেশটিতে নতুন ৬৫৭টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা শুরু করে। এর মধ্যে প্রথম বছরে টিকে ছিল ৫১ শতাংশ। পাকিস্তানের ক্ষেত্রে চার বছরে নতুন ৪ হাজার ৫৩টি রফতানিকারক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা শুরু করে প্রথম বছরে টিকে
ছিল ৫৬ শতাংশ। আর তুরস্কে চার বছরে আবির্ভাব হয় নতুন ১৩
হাজার ৮২৬ রফতানিকারকের। এর মধ্যে প্রথম বছরের ব্যবসায় টিকেছিলেন ৫৫ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রেও ব্যবসার শুরুতেই ঝরে পড়ার হার অনেক বেশি থাকে। বাংলাদেশের রফতানি খাত এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম, যার মূল কারণ পোশাক শিল্পনির্ভরতা। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সংযোগের কারণে এ খাতের একটি তৈরি বাজার আছে এবং এর সম্প্রসারণও হচ্ছে। এছাড়া তৈরি পোশাকের মূল উত্পাদক চীন এ ব্যবসা থেকে সরে আসছে। আবার পোশাক শিল্পনির্ভর রফতানি খাতে শ্রমও সাশ্রয়ী। সব মিলিয়ে ব্যবসা শুরু করে চালিয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বাংলাদেশে অনেকটা কম।
সরকারের নানামুখী সহায়তাও ব্যবসায় টিকে থাকার ক্ষেত্রে অন্যতম নিয়ামক, এমন মন্তব্য করে তিনি বলেন, তার পরও বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতিকূল পরিবেশ বা প্রতিবন্ধকতা অনেক বেশি মাত্রায় রয়েছে। তবে সেগুলো নতুন খাতের ব্যবসায়ীদেরই বেশি মোকাবেলা করতে হচ্ছে। আর ব্যবসা-বাণিজ্য বহুমুখী না হওয়াও দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকার অন্তরায় হতে পারে।
আশির দশকে পোশাক শিল্পের হাত ধরে রফতানি খাতে সুবাতাস বইতে শুরু করে। এর পর নিয়মিত বিরতিতে নানা প্রতিকূল পরিবেশের মুখোমুখি হতে হয় ব্যবসায়ীদের। এর মধ্যে রাজনৈতিক প্রতিকূলতা ছিল সবচেয়ে বেশি। ছিল প্রাকৃতিক দুর্যোগজনিত সমস্যাও। তবে প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব ছিল মূলত অঞ্চলভিত্তিক। সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় কর্মপরিবেশ নিয়ে। যার মূলে ছিল নিয়মিত বিরতিতে ধারাবাহিক শিল্প দুর্ঘটনা। তবে সব সমস্যার মতো এ সমস্যাও অনেকটা কাটিয়ে উঠেছেন বলে দাবি ব্যবসায়ীদের।
বিশ্বব্যাংকের ডুয়িং বিজনেস প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান স্থাপনে জমি কিনলে তার নিবন্ধনে সময় লাগে ১৮৫ দিন। আর সে জমিতে অবকাঠামো নির্মাণের অনুমতি পেতে লেগে যায় ২৬৯ দিন। আবার বিদ্যুত্ সংযোগ পেতে সময় লাগে গড়ে ৪২৯ দিন। এসব সেবার অনুমোদন প্রক্রিয়াতেই বিনিয়োগকারীদের ব্যয় করতে হয় কোটি টাকার বেশি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পণ্য আমদানি-রফতানি প্রক্রিয়ায়ও পোহাতে হয় নানা জটিলতা। এর মধ্যে রফতানির নথিপত্র প্রক্রিয়াকরণে সময় লাগে ১৪৭ ঘণ্টা (৬ দিনের বেশি), ব্যয় করতে হয় ৮৩০ ডলার। আর আমদানিতে ব্যয় করতে হয় ১ হাজার ৮৬১ ডলার ও সময় লাগে ১৪৪ ঘণ্টা (৬ দিন)। এর ওপর সড়কপথে পণ্য পরিবহনে সময়ের অপচয় তো আছেই। আমদানি-রফতানির পণ্য পরিবহনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম করিডোর পেরোতে সময় লাগে প্রায় ২০ ঘণ্টা।
রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মাফরুহা সুলতানা জানান, বাংলাদেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের নিরবচ্ছিন্ন পরিবেশ যেমন ছিল, তেমনি এটাও ঠিক যে, অনেক উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে ব্যবসায়ীদের। তার পরও ব্যবসায়ীরা নিজস্ব সক্ষমতা ও দক্ষতার মাধ্যমে ব্যবসায় টিকে গেছেন। আর সরকারের সহায়তা নিয়ে টিকে থাকার চেষ্টায় তারা সহযোগিতা দিয়ে গেছেন।
ইপিবির তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছর রফতানি খাত থেকে বাংলাদেশের আয় ৩ হাজার ৪০০ কোটি ডলার ছাড়িয়েছে। চলতি ২০১৬-১৭ অর্থবছরে আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৭০০ কোটি ডলার। ২০২১ সালে শুধু পোশাক রফতানি খাত থেকেই আয়ের লক্ষ্য ৫ হাজার কোটি ডলার।