‘মাটি’ থেকে ‘সোনা’র পদক, বগুড়ার জলকন্যাদের গল্প

ভোরের আলো তখনো ফোটেনি। ট্রাকস্যুট পরে একদল কিশোরী ছুটছে উদ্যানের দিকে। সকালে হাঁটতে বেরোনো কেউ কেউ তাদের দিকে তাকাচ্ছেন বিস্ময় নিয়ে। লিকলিকে গড়ন সবার। মলিন চেহারা। বয়স ১২ থেকে ১৬। কৌতূহলী ফিসফাস—এই পাতলা শরীরেও ‘মর্নিং ওয়াক’! একটু পর ঘোর কাটে তাঁদের। কৌতূহলী চোখ যায় পার্কের পুকুরঘাটে। সাঁতারের পোশাক পরে তারা দল বেঁধে পুকুরে নামছে। পুকুরের এপার-ওপার আগে থেকেই সাঁতারের জন্য আড়াআড়ি শোলা দিয়ে লাইন টানা রয়েছে। এক পাশের লাইনে প্রস্তুত মেয়েরা। অন্য পাশে একদল কিশোর সাঁতারু। মাঝখানে কোচ মাসুদ রানা বাঁশিতে ফুঁ দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল মেয়েরা। অন্যের রেকর্ড ভাঙতে ছেলেদের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাঁতার শুরু করল তারা।
সকালে আর বিকেলে প্রত্যন্ত গ্রাম, শহরের পাড়া-মহল্লা থেকে আসা মেয়েদের এই সাঁতারচর্চার দৃশ্য দেখা যায় বগুড়া শহরের এডওয়ার্ড পার্কের পুকুরে। কোচ মাসুদ রানা বিনা পয়সায় প্রশিক্ষণ দেন সাঁতার শিখতে আসা মেয়েদের। গ্রাম-মহল্লা ঘুরে ঘুরে সাঁতারের জন্য মেয়েদের উৎসাহও দেন তিনি। সাঁতারের প্রতি আগ্রহ বাড়াতে প্রথম দিকে কাদা-মাটির তৈরি ক্রেস্ট দেওয়া হতো মেয়েদের। এখন মাটির ক্রেস্টের বদলে মেয়েদের ঘরে ‘সোনার পদক’। বয়সভিত্তিক সাঁতারে জাতীয় পর্যায়ে বেশ কয়েকজন সোনাজয়ী হয়েছে। সাফল্যের ঝুড়িতে কারও কারও এক থেকে দুই ডজন সোনার পদক। বাংলাদেশ আনসার ও নৌবাহিনীর হয়েও সাঁতরায় কেউ কেউ। এই বয়সেই মাস গেলে বেতন পাচ্ছে। সাঁতারের সুবাদে দেশ-বিদেশ ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ পাচ্ছে মেয়েরা।
সাঁতারপাগল কোচ মাসুদ রানার বয়স ৪০ পেরিয়েছে। বগুড়া শহরের সূত্রাপুরে শৈশব কেটেছে তাঁর। পড়তেন সেন্ট্রাল হাইস্কুলে। পড়াশোনার চেয়ে সাঁতারেই ঝোঁক ছিল তাঁর বেশি। বড় তিন ভাইয়ের মতো তিনিও সোনাজয়ী সাঁতারু ছিলেন। কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে রেকর্ড গড়তে পারেননি। তবে সাঁতারের নেশা কাটেনি মাসুদ রানার। এখনো সাঁতার শেখাতে ছেলেমেয়েদের খুঁজে বেড়ান তিনি। কেউ আগ্রহ দেখালে শহরে এনে সাঁতার প্রশিক্ষণ দেন। বেশির ভাগ ছেলেমেয়ের শহরে থাকার মতো সামর্থ্য থাকে না। মাসুদ রানা থাকার ব্যবস্থাও করে দেন। বর্তমানে তাঁর কাছে ১৯ জন মেয়ে সাঁতার প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। এর মধ্যে সাতজনই একাধিক সোনা ও রুপার পদক জয় করেছে। মাসুদ রানা বলেন, ‘দেশসেরা সাঁতারু হওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। সেই স্বপ্ন পূরণ হয়নি। এখন সাঁতারে বগুড়ার মেয়েরা বিশ্বজয় করবে বলে স্বপ্ন দেখছি।’
প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বয়সভিত্তিক জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতায় ২৪টি সোনাজয়ী মরিয়ম আকতার এবং তার ছোট বোন তিনটি সোনাজয়ী রোকেয়া আকতার। এই দুই বোনের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার বালিয়াদীঘি গ্রামে। বাবা ইউনুস আলীর অসচ্ছল সংসার। তিন মেয়ে ও এক ছেলের মধ্যে মরিয়ম আকতার সবার বড়। ২০০৭ সালে মরিয়ম তখন বাড়ির পাশে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। ইউনুস আলী বললেন, ‘হঠাৎ একদিন বাড়িতে হাজির মাসুদ রানা। নিজেকে সাঁতারের কোচ পরিচয় দিলেন। মরিয়মকে সাঁতার শেখাতে চান। আকাশ থেকে পড়লাম। গ্রামের মানুষ। আমার মেয়ে মানুষের সামনে ছোট পোশাক পরে পুকুরে সাঁতার কাটবে! প্রথমে রাজি ছিলাম না। কিন্তু মেয়েটার ইচ্ছার কারণে না করতে পারলাম না। মরিয়মকে শহরের ইশকুলে ভর্তি করালেন মাসুদ রানা। নিজের বাসায় তাঁর মেয়ের কাছে রেখে দিলেন। এরপর ঘরে সোনা আনতে থাকল মেয়েটা। বড়টার সাফল্যে ছোট মেয়েটাকেও পাঠালাম তাঁর বাসায়।’
মরিয়ম বলল, ‘বগুড়ায় সেন্ট্রাল উচ্চবিদ্যালয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হলাম। সকাল-বিকেলে পার্কের পুকুরে মাসুদ রানা স্যারের কাছে অনুশীলন করতাম। ২০০৯ সালে ছয়টি রৌপ্যপদক দিয়ে সাফল্যের খাতা খুললাম। ২০১০ সালে রৌপ্যসহ প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় হলাম। ২০১১ সালে ১০০ মিটার সাঁতারে দুটি সোনা ও দুটি ব্রোঞ্জ এবং ২০০ মিটারে দুটি সোনা ও দুটি ব্রোঞ্জ পেয়ে বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতায় সেরা হলাম। ২০১২ সালে দুটি সোনা, ২০১৩ সালে আটটি সোনাসহ তিন বিভাগে রেকর্ডসহ চ্যাম্পিয়ন হলাম। ২০১৪ সালে ১০টি স্বর্ণসহ ছয়টিতে রেকর্ড গড়ে ফের চ্যাম্পিয়ন হলাম।’ ২০১৪ ও ২০১৫ সালে কাতার ও চীনে প্রশিক্ষণ নিয়েছে মরিয়ম আকতার। এখন মেয়েদের জাতীয় সাঁতার প্রতিযোগিতার জন্য অনুশীলন করছে। পাশাপাশি বগুড়া মহিলা মহাবিদ্যালয়ে উচ্চমাধ্যমিকে পড়ছে। বাংলাদেশ নৌবাহিনীর দলের সাঁতারু সে।
রোকেয়া আকতারও মাসুদ রানার বাসায় থেকে সাঁতার শিখছে। পড়াশোনা করছে সেন্ট্রাল উচ্চবিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে। ২০১৫ সালে জাতীয় বয়সভিত্তিক ২০০ মিটার বুকসাঁতারে ৩ মিনিট ৮ সেকেন্ড সময় নিয়ে দুটি স্বর্ণ জয় করেছে।
বগুড়ার সেউজগাড়ি মহল্লার ফলের দোকানি রহেদুল ইসলামের তিন মেয়ের মধ্যে সবার ছোট রাশেদা খাতুন সাত বছর বয়স থেকেই পুকুরে ভাসছে। সাঁতারের পোশাক পরে পুকুরে সাঁতার কাটতে পরিবারের বাধা ছিল। কিন্তু শেষমেশ সেই বাধা অতিক্রম করেছে রাশেদা। রাশেদা বয়সভিত্তিক সাঁতারে ১৪টি সোনার পদক জয় করেছে। সাঁতরায় আনসার বাহিনীর দলের হয়ে।
বগুড়া শহরের জামিলনগরের মেয়ে মিতু আকতার পড়ে বগুড়ার সরকারি মুজিবুর রহমান মহিলা কলেজে উচ্চমাধ্যমিকে। বয়সভিত্তিক সাঁতারে এ পর্যন্ত ১৩টি স্বর্ণ জিতেছে মিতু।
তিনটি সোনাজয়ী বগুড়া সেন্ট্রাল হাইস্কুলের নবম শ্রেণির ছাত্রী রুমি আকতারও এডওয়ার্ড পার্কের পুকুরে নিয়মিত অনুশীলনে আসে। ২০১২ সালে মহিলা গেমসে চ্যাম্পিয়ন ও পাঁচটি সোনাজয়ী শাহিনূর আকতারও কোচ মাসুদ রানার কাছে নিয়মিত সাঁতার প্রশিক্ষণ নিয়েছেন। এ ছাড়া রৌপ্যজয়ী নিশি আকতার এখনো নিয়মিত সাঁতার শিখছেন।
কোচ মাসুদ রানা বলেন, ‘বগুড়ার মেয়েরা বিশ্ব সাঁতার প্রতিযোগিতায় যেদিন বাংলাদেশের লাল-সবুজের জয়ের পতাকা ওড়াবে, সেদিনই নিজেকে ধন্য মনে করব। ১৯ জন মেয়েকে প্রশিক্ষণ দিচ্ছি। একজন দেশসেরা হলেও আমার প্রচেষ্টা সার্থক হবে। মেয়েদের পাশাপাশি নয়ন ইসলাম নামের এক কিশোর সাঁতারু এখন পর্যন্ত ১৯টি স্বর্ণ জয় করেছে।