সিরাজদিখানের পাটি শিল্প

বাংলাদেশের লোকাচারে জীবনঘনিষ্ঠ ও ঐতিহ্যবাহী লৌকিক উপাদান পাটি। একটা সময় ছিল যখন গ্রামের বাড়িতে অতিথি এলে পাটিতে বসতে দেওয়া হতো। গৃহকর্তার বসার জন্যও ছিল বিশেষ ধরনের পাটি। হিন্দুদের বিয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ শীতলপাটি। গরমকালে শীতলপাটির কদর একটু বেশিই। বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের দুপুরে এই পাটি দেহ-মনে শীতলতা আনে।

মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের পাটির সুনাম তাই দীর্ঘদিনের। কিন্তু কালের আবর্তে দিন দিন পাটিশিল্প হারিয়ে যাচ্ছে। আগে সিরাজদিখান উপজেলার বিভিন্ন গ্রামে পাটিকরদের নান্দনিক কারুকার্যে ব্যস্ত থাকতে দেখা যেত। এখন হারিয়েছে তাদের জৌলুস। এখন অনেকেই শুধু বাপ-দাদার পেশাকে টিকিয়ে রাখার জন্য পাটিশিল্পের কাজে বা পাটি বুননের পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।

বর্তমানে সিরাজদিখান উপজেলার ১৪৪টি পরিবার পাটিশিল্পকে তাদের বাঁচার একমাত্র অবলম্বন হিসেবে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। গৃহবধূদের নিপুণ হাতের ছোঁয়ায় নানা নকশায় উপজেলার ইছাপুরা ইউনিয়নের পশ্চিম রাজদিয়া, জৈনসার ইউনিয়নের ভাটিমভোগ, মালখানগর ইউনিয়নের আরমহল ও বয়রাগাদি ইউনিয়নের পাউলদিয়া গ্রামে তৈরি করা হয় শীতলপাটি, পাটি, বড় চট, ছোট চট প্রভৃতি।রফতানি পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি না পেলেও শৌখিন ব্যবসায়ী, বেড়াতে আসা অতিথিদের মাধ্যমে শীতলপাটি যাচ্ছে কলকাতা, মধ্যপ্রাচ্য, ব্রিটেন, যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে।

অনেকে আবার নকশা করা শীতলপাটি দেয়ালে টাঙিয়ে রাখেন বসার ঘরের শোভা বাড়াতে।পাটি তৈরি শিল্পীরা নিজেদের স্বপ্নের পাশাপাশি গ্রামের অন্য নারীদের পাটি তৈরির প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। মাঘ-ফাল্গুন হচ্ছে পাটি বুননের সবচেয়ে ভালো সময়। আর বৈশাখে সেই পাটির চাহিদা থাকে ব্যাপক। বছরে ২-৩ বার সিলেট থেকে পাটির কাঁচামাল বর্ষজীবী উদ্ভিদ ‘মোতরা’ বা ‘পাইত্রা’ আসে। সারা বছরের জন্য পাটির কাঁচামাল পাইত্রা/মোতরা কিনে নেওয়া হয়।

সেখান থেকে প্রক্রিয়াজাত করে আনতে সময় লেগে যায় ২-৩ মাস। এছাড়া মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর, টঙ্গিবাড়ি, লৌহজং উপজেলাসহ সিরাজদিখান উপজেলার ইছাপুরা, কুসুমপুর, চন্দনধূল, আবিরপাড়া গ্রাম ও সিরাজদিখানের হাট থেকে কিনে আনা হয়। গ্রাম থেকে ১ পোজা পাইত্রা/মোতরা ৫০-১০০ টাকা আর হাট থেকে ৩০০-৩৫০ টাকায় কেনা হয়।

একটা পাটি বানাইতে ৩ পত্তন টাকা লাগে। পাইত্রা/মোতরা কেনা, বেতি বের করা ও পাটি বুননোর জন্য। ১ পোজা পাইত্রা/মোতরাকে প্রক্রিয়াজাত করলে ৩ ভাগ হয়। যার মধ্যে ১ ভাগ বেতি যা পাটি তৈরিতে ব্যবহার হয়, ১ ভাগ আতি যা ধানের মোঠা ও পানের বিড়া বাঁধার কাজে ব্যবহার করা হয় এবং ১ ভাগ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ১ পোজা পাইত্রা/মোতরা থেকে ২ কেজি ৫০০ গ্রাম আতি বের হয়। স্থানীয় হাটে ৫০ টাকা কেজি দরে ২৫০ টাকা বিক্রি হয় এ আতি। ১ পোজা পাইত্রা/মোতরা দিয়ে ১টি পাটি হয়। ওই পাটিটি ৫০০-৫৫০ টাকা দরে বিক্রি হয়।

পাটির সাইজ অনুযায়ী বুননের মজুরি হয়ে থাকে। ৩ হাত বাই ৪ হাত ৯০ টাকা, সাড়ে ৩ বাই সাড়ে ৪ হাত ১২০ টাকা ও ৪ হাত বাই ৫ হাত ১৪০ টাকা। মান অনুযায়ী প্রতিটি পাটি বুনতে ২-৬ দিন লেগে যায়। উন্নতমানের পাটিকে ডালার বলা হয়। এটি বুনতে ৯-১০ দিন লেগে যায়। ১টি পাটিতে বুননি খরচ হয় ৬০০ টাকা। পাইকারি বাজারে এর মূল্য ২৫০০-৩০০০ টাকা। এ জেলার পাটি বিক্রির অন্যতম বাজার টঙ্গিবাড়ি উপজেলার বেতকা ও আব্দুল্লাপুর।

এ হাটে ঢাকা, ফরিদপুর, চাঁদপুর, নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদী থেকে পাইকাররা পাটি কিনতে আসে। এছাড়া স্থানীয়ভাবে ও সিরাজদিখান বাজারেও বিক্রি করা হয়। শীতলপাটির কারুপল্লীগুলোতে তিন-চারজনের একেক দল রং-বেরংয়ের বেত দিয়ে তৈরি করে বিভিন্ন রকমের ফুল করা পাটি।

আবার কেউ অন্যদের নতুন পাটির জো তুলে দেয়। শৈল্পিক উপস্থাপনা এবং নির্মাণ কুশলতার কারণে দক্ষ ও সুনিপুণ একজন পাটিকর নারীর কদরও রয়েছে সর্বত্র।হাতেবোনা পাটির মধ্যে আড়াই থেকে ৩ হাত পাইকারি বাজারে ২৫০ টাকা, ৩-৪ হাত ৪০০ টাকা, ৪-৫ হাত ৫০০ টাকা এবং ৫-৬ হাত ৯০০-১২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়ে থাকে।

সিরাজদিখান উপজেলার ভাটিমভোগ গ্রামের পাটিকর অতুল দে (৬০) ছোট থেকেই এ কাজ করে আসছেন। ১ ছেলে ২ মেয়ে নিয়ে বর্তমানে তিনি খুব একটা ভালো নেই। পশ্চিম রাজদিয়া গ্রামের মনীন্দ্র চন্দ্র দে’র ৪ ভাইয়ের মধ্যে ৩ ভাইই এ কাজে জড়িত। বুঝ-জ্ঞান হওয়ার পর থেকেই তারা এ কাজ করে আসছেন। তাদের সংসারও কোনোভাবে চলছে। গ্রামের বিয়েতে পাটির খুব চাহিদা। বাড়িতে এসেই তারা নিয়ে যান।

সরকার তাদের সহযোগিতা করলে হয়তো পাটিশিল্পকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে।পশ্চিম রাজদিয়ার মায়ারাণী দে, ইতি, শোভা দে, অর্চনা দে’র মতো সিরাজদিখানের বিভিন্ন এলাকায় কয়েকশ নারী পাটি বিক্রি করে সংসারের বাড়তি খরচের যোগান দেন। তারা নিজেদের পাশাপাশি এলাকার বেকার অন্য নারীদেরও স্বাবলম্বী হবার স্বপ্ন দেখান।

পাটিশিল্পের বিকাশে বড় সমস্যা হলো অর্থনৈতিক সমস্যা। শীতলপাটি তৈরির জন্য পাটি শিল্পীদের সরকারি, বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কোনো ঋণ দেয় না। সরকার শীতলপাটি রফতানির উদ্যোগ নিলে পাটিশিল্পীদের দিন ঘুরে যেত।