রাণিসম্পদ উৎপাদনে সমৃদ্ধির পথে বাংলাদেশ

দেশে পোলট্রিশিল্পের ক্রমবর্ধমান বিকাশ হচ্ছে। এর ফলে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে এগিয়েছে দেশ। বেড়েছে মাংসের উৎপাদন ও ভোগ। দুধ ও ডিমের উৎপাদন এবং ব্যবহার বাড়ছে মাছের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে।

খাদ্য মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে (মনিটরিং রিপোর্ট-২০১৬) এসব তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কৃষিজমি কমে আসছে দেশে। এতে পিছিয়ে না থেকে দেশের প্রান্তিক জনগণ প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে ঝুঁকছে। এতে প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে সমৃদ্ধির পথে হাঁটছে বাংলাদেশ।

প্রতিবেদন অনুসারে, এক সময় ভাতের সঙ্গে মাছই ছিল বাঙালির আমিষের চাহিদা পূরণের প্রধান উৎস। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তন হচ্ছে বাংলাদেশের মানুষের খাদ্যাভ্যাসে। মাছের পাশাপাশি আমিষের আরেক উৎস মাংসেও অভ্যস্ত হয়েছে এ দেশের মানুষ। তবে সেখানেই থেমে নেই খাদ্য গ্রহণের প্রকৃতি। বরং দুধ ও ডিমের প্রতিও আকর্ষণ বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে দেশে বাড়ছে দুধ, ডিম ও মাংসের উৎপাদনও। ফলে প্রাণিজ আমিষে বাংলাদেশ ক্রমেই সমৃদ্ধ হচ্ছে।

২০০৭-০৮ অর্থবছরের তুলনায় দেশে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ডিম ও দুধের উৎপাদন বেড়ে দ্বিগুণ এবং মাংসের উৎপাদন সাড়ে চার গুণ হয়েছে। ২০০৭-০৮ অর্থবছর থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছর দেশে মাংসের উৎপাদন বৃদ্ধির বার্ষিক গড় হার ২৯ শতাংশ। একইভাবে এ সময়ের ব্যবধানে দেশে ডিমের উৎপাদন বেড়েছে ১৬ শতাংশ আর দুধের উৎপাদন বেড়েছে ১৪ শতাংশ।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে পোলট্রিশিল্পের ক্রমবর্ধমান বিকাশের ফলে প্রাণিজ আমিষ উৎপাদনে এ উল্লম্ফন হয়েছে। এ ক্ষেত্রে ব্যক্তি খাতের ক্ষুদ্র ও বৃহৎ খামারিদের অবদান সবচেয়ে বেশি। কৃষিজমি কমে আসায় দেশের প্রান্তিক জনগণ প্রাণিসম্পদ উৎপাদনে ঝুঁকছে।

প্রতিবেদনের তথ্যমতে, ২০০৭-০৮ অর্থবছরের দেশে প্রাণিজ মাংসের উৎপাদন ছিল ১০ লাখ ৪০ হাজার টন, যা বেড়েছে প্রতিবছরই। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় ৫৮ লাখ ৬০ হাজার টন।

উল্লিখিত পাঁচ বছরে দেশে দুধের উৎপাদন হয়েছে দ্বিগুণের কিছুটা বেশি। ২০০৮-০৯ সালে দেশে দুধের উৎপাদন হতো ২৬ লাখ ৫ হাজার টন, তা ২০১৪-১৫ সালে এসে দাঁড়ায় ৬৯ লাখ ৭০ হাজার টনে। এ সময়ের ব্যবধানে ডিমের উৎপাদন ৫৬৫ কোটি ৩০ হাজার লাখ পিস থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৯৯ কোটি ৫১ লাখ পিসে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টিবিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. খালেদা ইসলাম বলেন, এটি সরকারের একটি বড় অর্জন। তবে বড় অর্জনের পেছনে চ্যালেঞ্জটিও বড়। এখন সময় এসেছে এ অর্জনের সুষ্ঠু বণ্টনের। পুষ্টিহীন মানুষ, বৃদ্ধ এবং মা ও শিশু পর্যায়ে এ আমিষের সঠিক বণ্টন করতে হবে। নয়তো দেশের এ অর্জনটি শুধু অর্জনই থেকে যাবে। আর ক্রমাগত উৎপাদন বৃদ্ধি থেকে বড় বিষয় জনসংখ্যার ভিত্তিতে তার প্রাপ্যতা কতটুকু, সে বিষয় দেখা।

প্রতিবেদনে দেশের প্রাণিজ আমিষের বৃদ্ধির কয়েকটি কারণ উল্লেখ করা হয়েছে। যার মধ্যে পোলট্রিশিল্পের বিষয়টি উঠে এসেছে। বিগত কয়েক বছরে পোলট্রি খাতে বাচ্চার মৃত্যুর হার কমেছে, হয়েছে পদ্ধতি ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, নতুন ভ্যাক্সিন ও প্রতিষেধক ব্যবহার বেড়েছে।

দেশে প্রাণিজ কৃত্রিম প্রজনন সক্ষমতায় এসেছে বড় সুফল। দেশে ২০০৮-০৯ সালে কৃত্রিম প্রজননের হার ছিল ১ দশমিক ৫৬ শতাংশ। শেষ ২০১৪-১৫ সালে এর প্রজনন হার এসে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ২৮ শতাংশে। এতে একদিকে যেমন কমছে প্রাণীর মৃত্যুহার, অন্যদিকে নিশ্চিত হচ্ছে নিরাপদ মাতৃত্ব।

২০১৪-১৫ সালের দেশে গরুর সংখ্যা ২ কোটি ৩৬ লাখ ৩৬ হাজার আর ছাগলের সংখ্যা ২ কোটি ৫৬ লাখ ২ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। গরু ও ছাগল উভয়ের সংখ্যাই ২০০৮-০৯ সালের তুলনায় অনেক বেড়েছে।