আমার সফটওয়্যার আমার দেশ

খুব সাম্প্রতিককালে আমরা বাংলাদেশের সফটওয়্যার নিয়ে বেশ কিছু আলোচনা করেছি। আলোচনাটিকে আরো একটু বিস্তৃত করা প্রয়োজন বিধায় দুই পরে আরো একটি নিবন্ধ আমাকে লিখতে হচ্ছে। বাংলাদেশের মানুষের একটি গর্বের বিষয় হচ্ছে যে, আমরা নিজের অর্থে পদ্মা সেতু বানাচ্ছি। মিথ্যা দুর্নীতির অজুহাতে বিশ্বব্যাংক যখন এই সেতু প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়ায়, সঙ্গে যখন অন্যরাও যোগ দেয়, তখন সারা দুনিয়াই ধরে নিয়েছিল যে আমাদের স্বপ্নের সেতু বুঝি আর হলো না। কিন্তু আমরা প্রমাণ করলাম যে বিশ্বব্যাংক নয়, যে কেউ সরে দাঁড়ালেও বাংলাদেশ তার নিজের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে। তার সন্তানদের মেধাই তার দেশের জন্য যথেষ্ট। ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা আমাদের সাহসী নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে। তিনি যদি এই সময়ে দেশটির নেতৃত্ব না দিতেন তবে হয়তো এমনটি হতো না। ১৯৭২ সালে হেনরি কিসিঞ্জার যে বাংলাদেশকে তলাহীন ঝুড়ির দেশ বলেছিলেন সেটিরও দাঁতভাঙা জবাব দিলাম আমরা এই পদ্মাসেতু বানিয়ে। এজন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা কেনিয়ায় গিয়ে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষা নেয়ার কথা বলেছেন। একইভাবে আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ ঘোষণাকে অনুসরণ করে ভারতে ডিজিটাল ইন্ডিয়া ঘোষণা দিল এবং মোদি নিজে বাংলাদেশকে অনুসরণ করার ঘোষণা দিলেন। সেই অনুষঙ্গকে মাথায় রেখেই আমি আমাদের নিজেদের ও বিশ্বাবাসীকে জানাতে চাই যে, ১৯৬৪ সালে এই দেশে দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম কম্পিউটার এসেছিল এবং আমরা পদ্মা সেতু বানানোর বহু আগে সুইডেনের ভলবোর জন্য বাংলাদেশ থেকে সফটওয়্যার বানিয়ে দিয়েছি। আমরা কেবল দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম কম্পিউটার প্রোগ্রামার মো. হানিফউদ্দিন মিয়ার উত্তরসূরি নই, আমরা এখন বিশ্বের ১৮০টি দেশে সফটওয়্যার ও সেবা রপ্তাানি করি। আমাদের এখন নিজের দেশেও নজর দেয়ার সময় হয়েছে। আমরা বিদেশি যেকোনো প্রতিষ্ঠানের সমকক্ষ বা উন্নতমানের সফটওয়্যার বানাতে পারি। অনুগ্রহ করে গুলশানের হামলা বা শোলাকিয়ার সন্ত্রাস দেখে আমাদের জঙ্গিবাদী মনে করবেন না। আমরা জঙ্গি বানাই না, প্রোগ্রামার বানাই। বাঙালিরা জঙ্গিবাদকে একাত্তরে কবর দিয়েছে। আমরা দুঃখিত যে জাপানি, ইতালীয় ও ভারতীয়দের সঙ্গে বাংলাদেশিদের রক্ত একসঙ্গে মিশেছে। আমরা এটাও স্মরণ করাতে চাই যে, আমরা জাপানের অর্থনীতিতে অবদান রাখছি। জাপানের জন্য দেশ থেকে আমাদের কম্পিউটারবিদরা যেমন কাজ করছে তেমনি আমরা জাপানে অন্তত সাাড়ে তিনশ প্রোগ্রামার বসিয়ে জাপানিদের জন্য কাজ করছি। এমন অসংখ্য দেশের জন্য অবদান রাখার দৃষ্টান্ত আছে আমাদের। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে নিজের বাড়িতে আমাদের সেই কদর দেখছি না। একটু অন্দরের কথা বলতে চাই।

রেজা সেলিমকে আমি অনেক স্নেহ করি। ওর মতো লড়াকু মানুষ সচরাচর চোখে পড়ে না। এমন প্রযুক্তিমনষ্ক মানুষ এবং তৃণমূলের সঙ্গে তথ্যপ্রযুক্তিকে সম্পৃক্ত করার মতো যোদ্ধাও বিরল। বাগরেহাটে প্রযুক্তি ব্যবহার করে সাধারণ মানুষের জীবন পাল্টে দিতে সে অসাধারণ কাজ করে চলেছে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে গ্রামের নারীদের ক্যান্সারের চিকিৎসা-ছাত্রছাত্রী ও সাধারণ মানুষদের জন্য তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষা বা শিশুদের জন্য ডিজিটাল শিক্ষার আয়োজনে রেজার অবদানের খবর দেশের অনেকেই রাখেন না। আমিও হয়তো পুরোটা জানি না। তবে ওর ডাকে আমি খুলনা-বাগেরহাট-রামপাল-শ্রীফলতলা ঘুরেছি বহুবার। সেই রেজা সেলিম গত ৩০ জুন ২০১৬ আমাকে একটি মেইল পাঠিয়েছিল। সেদিনই সরকারের টেলিকম বিভাগ মাইক্রোসফটের সঙ্গে একটি সমঝোতা স্মারক সই করেছে দেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে। রেজা সেলিম সেই প্রসঙ্গে কিছু কথা বলেছে। তার মেইলটি পাঠ করার আগে আমি স্মরণ করতে পারি যে, ২৫ জুন ১৬ অনুষ্ঠিত বেসিস (বাংলাদেশ এসেসিয়েশন অব সফটওয়্যার এন্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস) নির্বাচনে আমার নেতৃত্বাধীন ডিজিটাল ব্রিগেড প্যানেলে আমরা স্লোগান দিয়েছিলাম, দেশের পক্ষে, দেশের সফটওয়্যার ও সেবা খাতের পক্ষে। সেই নির্বাচন সমাপ্ত হওয়ার পর আমাদের নিজেদের কাছে দেশের সফটওয়্যার ও সেবা খাতের মানুষরা কিভাবে তার একটি দিকনির্দেশনা পৌঁছেছে। বেসিসের ৯টি পরিচালক পদের ৭টিতে আমরা জয়ী হয়েছি বিধায় আমরা মনে করতেই পারি যে, আমাদের ঘোষণার সঙ্গে বেসিসের ভোটাররা সংহতি প্রকাশ করেছেন। নির্বাচনের পরপরই দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনের জিন্নাতুন নুর আমার সঙ্গে কথা বলে, যার ভিত্তিতে ২৯ জুন ২০১৬ পত্রিকাটির প্রথম পৃষ্ঠায় আমার কিছু কথা প্রকাশিত হয়েছে। যদি সম্ভব হতো তবে পুরো আলোচনাটিই আমি তুলে ধরতাম। তবে সেই পরিমাণ ঠাঁই না থাকায় আমি সেখান থেকে অংশ বিশেষ তুলে ধরছি।

‘রপ্তানিবাজার দখল করতে পারাটা নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য একটি অর্জন হবে। কিন্তু আমাদের কাছে মনে হচ্ছে যে, বাইরের দিকে তাকাতে গিয়ে নিজের ঘর আমি অন্যের দখলে দিয়ে দিচ্ছি। আমরা বাংলাদেশে ব্যাংকিং সফটওয়্যারের বাজার তৈরি করেছি। কিন্তু সে বাজার দখল করেছে বিদেশিরা। এভাবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমরা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। আমাদের প্রধান চ্যালেঞ্জ হবে আমাদের দেশের বাজার ও আমাদের দেশের সফটওয়্যার বাণিজ্যে রপ্তানি শক্তিশালীকরণ। আমরা নিজেদের মেধা দিয়েই যেন এ বাজার সুরক্ষা করতে পারি।’

আমি স্মরণ করিয়ে দিতে পারি যে, আজকের প্রধানমন্ত্রী যখন প্রথমবারের মতো দেশের প্রধানমন্ত্রী হন এবং আজকের বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমদ যখন প্রথমবারের মতো বাণিজ্যমন্ত্রী হন তখন ‘হাও টু এক্সপোর্ট সফটওয়্যার ফ্রম বাংলাদেশ’ নামক একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়। তার নেতৃত্ব দিয়েছেন ড. জামিলুর রেজা চৌধুরী। আমি তার সদস্য ছিলাম। আমরা সরকারের কাছে ৪৫টি সুপারিশ পেশ করেছিলাম। বেসিসের জন্মও সেই প্রতিবেদনের একটি সুপারিশের ভিত্তিতে। সেই থেকে শেখ হাসিনার সরকার দেশ থেকে সফটওয়্যার রপ্তানি করার জন্য সহায়ক সব কাজ করে যাচ্ছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত রপ্তানির ক্ষেত্রে আমরা যাই করে থাকি না কেন, নিজের দেশের বাজারে আমাদের অবস্থা মোটেই ভালো নয়। জিন্নাতুন নুরের কাছে দেয়া সাক্ষাৎকারে আমি বিষয়টি স্পষ্ট করেছি। আমি বলেছি, আমাদের ডিজিটাল ব্রিগেড প্যানেলের নির্বাচনী স্লোগানের মধ্যে (আমরা দেশের পক্ষে, দেশের সফটওয়্যার ও সেবাখাতের পক্ষে) আমাদের দায়িত্ব সম্পর্কিত দিকনির্দেশনা আছে।

আমরা বেসিসের জন্ম থেকে আন্তর্জাতিক সফটওয়্যার মার্কেট ও সফটওয়্যার রপ্তানির বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে আসছি। এ গুরুত্ব আমরা ধরে রাখব। অন্যদিকে বাংলাদেশে এখন যে বড় কাজগুলো হচ্ছে, তা দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো করতে পারছে না। এসব কাজ বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো করছে। এমনকি আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলো টেন্ডারেও অংশ নিতে পারে না। সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশের স্লোগান দিয়ে বাংলাদেশের ১৬ কোটি মানুষের জীবনযাপন থেকে শুরু করে শিক্ষাব্যবস্থা সবকিছু ডিজিটাল করে চলেছে। এই হিসাব বিবেচনা করলে ১৬ কোটি বাংলাদেশির বাজার ইউরোপের প্রযুক্তি বাজারের চেয়ে বড়। আর বাংলাদেশে কেবল আমরা যাত্রা শুরু করেছি। অন্যরা এ বাজার অনেকটা নিঃশেষ করে দিয়েছে। সেদিক দিয়ে আমাদের বাজার অনেক বড়। আর আমরা নিজের বাড়ির বাজার যদি সুদৃঢ় করতে পারি তবে তা হবে আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন। এজন্য সরকারের নীতি ও অবকাঠামোগত ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন করতে হবে। আমাদের দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে সরকারি কাজ করতে পারে, সে ধরনের আইন-কানুন সংশোধন করতে হবে। আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সঙ্গে আমাদের যে মেধাসম্পদ আছে তার জন্য মেধা সংরক্ষণ, চর্চা ও বিকাশের জায়গাগুলোকে অব্যাহতভাবে সমৃদ্ধ করতে হবে।

আমি মনে করি, সরকার ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার জন্য যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, এর প্রাথমিক কাজগুলো সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু বড় মাপের কাজগুলো এখনো বাকি আছে। এর মধ্যে বড় মাপের কাজ বলতে দুটো কাজ চিহ্নিত করা যায়। এর একটি, সরকারের নিজের ডিজিটাইজেশন। অর্থাৎ সরকারি কাজগুলো সব ডিজিটাল পদ্ধতিতে হতে হবে। আরেকটি কাজ হচ্ছে শিক্ষার ডিজিটাল রূপান্তর। এ দুটো জায়গায় যদি ট্রান্সফরমেশন করা যায় তাহলে ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন পূরণ হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ বির্নিমাণে আমাদের অগ্রগতি হয়েছে। কিন্তু চ্যালেঞ্জ অনেক বড়। এ দেশে চার কোটির মতো ছাত্রছাত্রী আছে। তাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে ডিজিটাল করার জন্য সামগ্রিক পরিবর্তন; যেমন শিক্ষাদান পদ্ধতি, শিক্ষকের পরিবর্তন, পাঠ্যক্রমের পরিবর্তন, পাঠদান পদ্ধতির পরিবর্তন এবং তাদের হাতে ডিজিটাল ডিভাইস পৌঁছানো এ ধরনের অনেক ব্যয়বহুল ও বিশাল কাজ আমাদের করতে হবে। আর এটি সংশ্লিষ্টদের কাছেও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে শিশুশ্রেণি থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত ডিজিটালি পরিবর্তন আনা বড় চ্যালেঞ্জ। সরকার হাতির মতো। দ্রুত ঘুরতে পারে না। কিন্তু সরকারের এই রূপান্তরটাও দ্রুত করা দরকার। আমরা আরো লক্ষ্য করছি যে, এ সরকার সাত বছর পার করেছে। কিন্তু এখনো একটি মন্ত্রণালয় বলতে পারবে না যে আমরা কাগজ ছাড়া কাজ করি। কাজটা এত সহজে চুটকি বাজিয়ে করে ফেলার মতোও নয়। এ কথা ঠিক যে, কিছু ওয়েব পোর্টালের মাধ্যমে মানুষের সেবার জন্য কিছু তথ্য পৌঁছে দেয়া হচ্ছে। কিন্তু এর মাধ্যমে আমরা কেবল যাত্রা শুরু করেছি, যা পুরো কাজের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে প্রকৃতপক্ষে গোটা দুনিয়ার চিত্র বদলে গেছে। শ্রমবাজারেও এর পরিবর্তন এসেছে। শ্রমবাজার দুই ধরনের। একটি হচ্ছে কায়িক শ্রমনির্ভর, অন্যটি মেধানির্ভর। এতদিন ধরে আমাদের শ্রমবাজার ছিল কায়িক শ্রমনির্ভর। কিন্তু এখন প্রতিযোগিতায় টিকতে হলে আমাদের মেধাভিত্তিক শ্রমবাজারকে গুরুত্ব দিতে হবে। আর এজন্য আমাদের শ্রমশক্তিকে তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ে প্রশিক্ষিত করতে হবে।

দেশের সাইবার অপরাধ রোধে বেসিস কাজ করছে। বিশেষ করে এ ব্যাপারে ইন্টারনেট ব্যবহাকারীদের যেমন সচেতন হতে হবে, তেমন করে আমরাও গ্রাহকদের সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করছি। পাশাপাশি সরকারের সাইবার অপরাধ দমনে আইনগত ক্ষেত্রে অবকাঠামো ও জনগণের সচেতনতা তৈরি করতে হবে। আমরা আশা করছি ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন দ্রুত পাস হবে। কারণ আমাদের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা সেভাবে তৈরি হয়নি। আমাদের ডিজিটাল সিকিউরিটির জন্য এ খাতে আরো অর্থ বরাদ্দ করতে হবে।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট।