রাজশাহীর মাছ বিশ্ব বাজারে

রাজশাহীতে মাছ চাষে ঘটেছে বিপ্লব। মত্স্য অধিদফতরের সহযোগিতায় কয়েক হাজার মত্স্যচাষি জেলার নয়টি উপজেলায় মাছচাষ করেছেন। মাছচাষ লাভজনক হওয়ায় এ খাতে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থান হয়েছে। স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে মাছ রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে সম্প্রতি নেওয়া হয়েছে আরও বড় উদ্যোগ। রাজশাহীর মাছ দেশের সীমানা পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর এ লক্ষ্যে যাবতীয় প্রস্তুতি জোর কদমে এগিয়ে চলেছে। নিরাপদ বিষমুক্ত মাছ চাষে চাষিদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, এ বছরের শেষ নাগাদ রাজশাহীর মাছ বিদেশের বাজারে স্থান করে নেবে। জেলা মত্স্য সম্পদ অধিদফতর সূত্র জানায়, রাজশাহীতে বার্ষিক মাছের চাহিদা ৫৩ হাজার ৯৯৩ মেট্রিক টন। উৎপাদন হয় ৬৬ হাজার ৮২২ মেট্রিন টন। ফলে উদ্বৃত্ত থাকে ১২ হাজার ৮৮৯ মেট্রিক টন। মোট জলাশয়ের সংখ্যা ৪৮ হাজার ৪২৭টি। এর মধ্যে সরকারি পুকুর ও দিঘি আছে ৪ হাজার ৯১৫টি। এ ছাড়া আছে ৩৬ হাজার ৯৬১টি পুকুর ও দিঘি। তাছাড়া মাছচাষ হয় ধানখেত, বিল এবং নদীতে। মোট মত্স্যজীবীর সংখ্যা ১১ হাজার ৮৬৬ জন। আর মাছচাষের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীর নয়টি উপজেলার মধ্যে পবার পারিলা, দুর্গাপুর, পুঠিয়া, তানোর এবং গোদাগাড়ীর বরেন্দ্র অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি মাছচাষ হচ্ছে। উৎপাদন হওয়া মাছের মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাষ হচ্ছে রুই, কাতল, মৃগেল, সিলভার কার্প, গ্রাস কার্প ও জাপানি রুই। প্রতিদিন রাজশাহীর এসব উপজেলায় মাছ ধরছেন চাষিরা। আর এরপর বিশেষ পদ্ধতিতে জীবন্ত অবস্থায় তা ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানো হচ্ছে। রাজশাহী জেলা মত্স্যজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক পবা উপজেলার পারিলা এলাকার মত্স্যচাষি সোহরাব হোসেন বলেন, ‘আমরা এর আগে সনাতন পদ্ধতিতে মাছচাষ করতাম। আমি প্রায় ২০ বছর থেকে মাছ চাষের সঙ্গে সম্পৃক্ত। কিন্তু জেলা মত্স্য অফিস থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পরে গত ১০ বছর থেকে আধুনিক পদ্ধতিতে মাছচাষ করছি। কারণ, নিরাপদ বিষমুক্ত মাছচাষ করতে হলে সনাতন পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।’ পুঠিয়া এলাকার মাছচাষি অধ্যাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘রাজশাহীর মাছচাষিরা এখন অনেক বেশি সংগঠিত। তারা একে অপরের সঙ্গে নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময় করেন। ফলে মাছচাষিদের জ্ঞান বাড়ছে। পাশাপাশি রাজশাহীর মাছ আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা ইতিমধ্যে প্রশিক্ষণ নিয়েছি। নিরাপদ ও বিষমুক্ত মাছ বিদেশে রপ্তানির জন্য চাষের পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। যেমন আমরা এখন আর পুকুরে গোবর বা হাঁসের বিষ্ঠা দিচ্ছি না। কাপড় কাঁচা ও পুকুরে মানুষ বা গবাদি পশুর গোসল করা বন্ধ করেছি।’ জেলা মত্স্য সম্পদ কর্মকর্তা গোলাম রাব্বানী বলেন, ‘আন্তর্জাতিক বাজারে রাজশাহীর মাছ রপ্তানির জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করছি।

ইতিমধ্যে লক্ষ্যণীয় অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে। সরকারের নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে এ ব্যাপারে প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। রাজশাহীর মাছ বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইংল্যান্ড এবং আমেরিকাসহ বাঙালি অধ্যুষিত দেশগুলোতে রপ্তানি করা হবে। আর রপ্তানির ক্ষেত্রে কার্প জাতীয় মাছ প্রাধান্য পাবে।’ তিনি বলেন, ‘ইতিমধ্যে ১০০ জন চাষিকে নিরাপদ ও বিষমুক্ত মাছচাষের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে আরও ২০০ চাষিকে প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হবে। প্রশিক্ষণপ্রাপ্তরা বিদেশে মাছ রপ্তানির অংশ হিসেবে ইতিমধ্যে গুড অ্যাকুয়ার কালচার পদ্ধতিতে মাছচাষ শুরু করেছেন।

এর ফলে রাসায়নিক বিষমুক্ত নিরাপদ মাছচাষ সম্ভব হবে। আমরা আশাবাদী, এ বছরের শেষ নাগাদ রাজশাহীর মাছ আন্তর্জাতিক বাজারে স্থান করে নেবে। এর ফলে রাজশাহীর অর্থনৈতিক উন্নয়নের দ্বার উন্মোচিত হবে।’