বিনিয়োগে ঝুঁকছে বড় করপোরেটরা

জমি, গ্যাস ও বিদ্যুতের নিশ্চয়তায় বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলের দিকে ঝুঁকছে বড় করপোরেটরা। এর মাধ্যমে বিনিয়োগ সম্প্রসারণের পরিকল্পনা করছে তারা। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) থেকে এরই মধ্যে প্রাক-যোগ্যতা (প্রি-কোয়ালিফিকেশন) লাইসেন্সও নিয়েছে এ ধরনের বেশকিছু বড় করপোরেট। লাইসেন্স নেয়ার অপেক্ষায় আছে আরো কিছু প্রতিষ্ঠান।

বেজার তথ্য অনুযায়ী, সাতটি শিল্প গ্রুপ এরই মধ্যে প্রি-কোয়ালিফিকেশন লাইসেন্স সংগ্রহ করেছে। এগুলো হলো— এ কে খান, আবদুল মোনেম, আমান, মেঘনা, বে, মাইশা ও ইউনাইটেড গ্রুপ। আজ লাইসেন্স সংগ্রহের কথা রয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের। দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করবে শিল্প গ্রুপটি।

বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রাক-যোগ্যতা লাইসেন্স গ্রহণকারী সাত প্রতিষ্ঠান এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে ৪৫ কোটি ৭০ লাখ ডলার। স্থানীয় মুদ্রায় এর পরিমাণ ৩ হাজার ৫৬৪ কোটি ৬০ লাখ টাকা। অধিকাংশ অর্থই খরচ হয়েছে জমি অধিগ্রহণ বাবদ।

বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বিনিয়োগের জন্য উদ্যোক্তারা যেসব সুযোগ-সুবিধা চান, তার প্রায় সবই বেজার মাধ্যমে নিশ্চিতের চেষ্টা করছে সরকার। এর মধ্যে আছে— শুল্কমুক্ত, নীতি, ইউটিলিটি ও সার্বিক অবকাঠামো সুবিধা। আবার বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘ প্রত্যাশিত ওয়ান স্টপ সেবাও নিশ্চিত করার পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়েছে। সব মিলিয়ে বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চলকে গুরুত্ব দিচ্ছে দেশের প্রায় সব বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান।

মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় লাইসেন্স নিয়েছে আবদুল মোনেম লিমিটেড। প্রাথমিকভাবে ১৯৭ একর জমির ওপর আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দিয়েছে বেজা। অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে ৬ কোটি ৬ লাখ ডলার বা ৫১৪ কোটি ৮০ লাখ টাকা বিনিয়োগও করেছে আবদুল মোনেম লিমিটেড।

জানতে চাইলে আবদুল মোনেম ইকোনমিক জোনের পরিচালক এ গফুর বলেন, বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশের শিল্প তথা ব্যবসা-বাণিজ্যে আরো পেশাদারিত্বের প্রয়োজন। এ কারণে পরিকল্পিত বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো এ ধরনের বিনিয়োগ পরিবেশের সুযোগ করে দিচ্ছে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায়ও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আমরা মনে করছি। এসব কারণেই আমরাসহ দেশের বড় প্রতিষ্ঠানগুলো বিনিয়োগ সম্প্রসারণে অর্থনৈতিক অঞ্চল বেছে নিচ্ছে।

নারায়ণগঞ্জের পলাশিতে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বেজার কাছ থেকে লাইসেন্স নিয়েছে এ কে খান গ্রুপ। প্রাথমিকভাবে ২০০ একর জমির ওপর অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠা করবে তারা। এরই মধ্যে শিল্প গ্রুপটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় ৩ কোটি ৫০ লাখ ডলার বা ২৭৩ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে বলে জানা গেছে।

দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করছে মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ। এর একটি মেঘনা ইন্ডাস্ট্রিয়াল ইকোনমিক জোন। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় ৬৭ একর জমির ওপর এটি স্থাপনের লাইসেন্স দিয়েছে বেজা। এরই মধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে ৩১২ কোটি টাকা। নারায়ণগঞ্জেরই মেঘনাঘাটে ৮০ একর জমির ওপর গ্রুপটি প্রতিষ্ঠা করছে মেঘনা ইকোনমিক জোন। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটিতে মেঘনা গ্রুপ এখন পর্যন্ত বিনিয়োগ করেছে ৪৩৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা।

নারায়ণগঞ্জে ৯০ একর জমির ওপর আমান ইকোনমিক জোন স্থাপনের লাইসেন্স পেয়েছে আমান গ্রুপ লিমিটেড। নারায়ণগঞ্জে এ অর্থনৈতিক অঞ্চলটি স্থাপনে এরই মধ্যে ৫৩০ কোটি ৪০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছে তারা। বস্ত্র, নির্মাণ, কৃষিতে বিনিয়োগ থাকা এ গ্রুপের বার্ষিক টার্নওভার বর্তমানে ৪ হাজার কোটি টাকা। নারায়ণগঞ্জে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে তা ১৫ হাজার কোটি টাকায় নিয়ে যেতে চায় শিল্প গ্রুপটি।

আমান গ্রুপ লিমিটেডের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার রবিউল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগে অবকাঠামো, গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানি সুবিধার নিশ্চয়তা পাওয়া যায়। সার্বিক প্রেক্ষাপটে পরিকল্পিত বিনিয়োগ ধারণা বাস্তবায়নে আমরা অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপন করছি। সিমেন্ট, খাদ্য, মোড়কসহ বিভিন্ন শিল্প এ অঞ্চলে গড়ে তুলব আমরা। অন্য উদ্যোক্তারাও আমাদের অঞ্চলটিতে বিনিয়োগ করবে।

মাইশা গ্রুপের অর্থনৈতিক অঞ্চল আরিশা ইকোনমিক জোন স্থাপন হবে ঢাকার বসিলায়। প্রাথমিকভাবে ৫০ একর জমির ওপর এটি স্থাপনের লাইসেন্স নিয়েছে গ্রুপটি। এটি স্থাপনে এরই মধ্যে বিনিয়োগ হয়েছে ১৩ কোটি ডলার বা ১ হাজার ১৪ কোটি টাকা।

অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বেজার প্রাক-যোগ্যতা সনদ পেয়েছে চামড়া ও ফুটওয়্যার খাতের বে গ্রুপ। অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য এরই মধ্যে তারা জমি নিয়েছে ৫৫ একর। এখন পর্যন্ত গ্রুপটি বিনিয়োগ করেছে ৬ কোটি ২০ লাখ ডলার বা ৪৮৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা।

ইউনাইটেড গ্রুপের ইউনাইটেড সিটি ইকোনমিক জোনটি স্থাপিত হবে বিশেষায়িত আইটি পার্ক হিসেবে। এজন্য প্রাথমিকভাবে ২ দশমিক ৪৩ একর জমি নেয়া হয়েছে।

দুটি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে বসুন্ধরা গ্রুপের। বসুন্ধরা স্পেশাল ইকোনমিক জোন লিমিটেড নামে অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠা করা হবে ২২৩ একর জায়গার ওপর দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে। ইস্ট-ওয়েস্ট ইকোনমিক জোন লিমিটেড প্রতিষ্ঠা করা হবে ২১৮ একর জমির ওপর। অর্থনৈতিক অঞ্চল দুটির জন্য আজ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রাক-যোগ্যতা লাইসেন্স

হস্তান্তর করবে বেজা। এছাড়া লাইসেন্স নেয়ার পরিকল্পনায় আছে আকিজ, সিটি, টিকে, বেঙ্গলসহ দেশের বড় করপোরেটরা।

বেজা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের পাশাপাশি এর নিরাপত্তাকেও অনেক বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তারা। বেজাও নিরাপত্তা নিশ্চিতে যথাসম্ভব চেষ্টা করছে। ওয়ান স্টপ সার্ভিস থেকে শুরু করে সার্বিক ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলার বিষয়ে সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা হচ্ছে বেজার মাধ্যমে। এ কারণেই বিনিয়োগের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনে আগ্রহী হয়ে উঠছে দেশের প্রায় সব প্রতিষ্ঠান। সক্ষমতার আলোকে এতে এগিয়ে থাকছে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো।

আগামী ১৫ বছরের মধ্যে ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। অর্থনীতির চাকা গতিশীল করতে বিশ্বব্যাপী জনপ্রিয় এ ধারণা বাস্তবায়নে রয়েছে সরকারের সর্বোচ্চ তত্পরতা। আশির দশকে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে ঈর্ষণীয় উন্নতি করেছে চীন। একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করছে ফিলিপাইন, থাইল্যান্ড ও ভারত।

এদিকে বাংলাদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় এখনো দৃশ্যমান কিছু চোখে পড়েনি বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণা পরিচালক ড. জায়েদ বখ্ত। তিনি বলেন, সার্বিক বিনিয়োগ পরিবেশের প্রতিকূলতা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ধারণাকে জনপ্রিয় করছে। অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অন্যতম দুর্বলতা নির্বাচিত স্থানের পার্শ্ববর্তী ভৌত অবকাঠামো। এখন পর্যন্ত বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা যে ধরনের স্থান চাইছেন, তার বেশির ভাগই ঢাকার কাছাকাছি। সার্বিক সফলতা আসা এখনো সময়সাপেক্ষ।