বাংলাদেশের মানুষ জাগবে, রুখবে

দুঃসময় এসেছে বটে কিন্তু এর মধ্যে আশাব্যঞ্জক অনেক ঘটনাও ঘটছে। খোদ হলি আর্টিজানে নারকীয় হত্যাযজ্ঞের ভেতরেই কিশোর ফারাজ আইয়াজ হোসেন মানবতার সুউচ্চ মূল্যবোধের দৃষ্টান্ত রেখেছে। ধর্মের ও উন্নত নৈতিকতার আদর্শের প্রকাশ ঘটেছে তার সাহসী আত্মত্যাগে। সমাজের প্রতিক্রিয়ার মধ্যেও হত্যা, ধ্বংস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে আন্তরিক উচ্চারণ শোনা যাচ্ছে। যে দেশের ইতিহাসে মাওলানাদের পারস্পরিক বাহাস, তর্কযুদ্ধ, এমনকি হানাহানির ঘটনা বেশি, যেখানে মসজিদে-মসজিদে, মাদ্রাসায়-মাদ্রাসায়, পীরে-পীরে মতানৈক্য থেকে চরম দ্বন্দ্ব, এমনকি হানাহানি হতে দেখা যেত, সে দেশে লক্ষাধিক মাওলানা এক হয়ে জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিতে পেরেছেন। বর্তমান সংকটই এমন বিরল ঐক্য সম্ভব করে তুলেছে।

সুস্থ চিন্তা ও সঠিক ধর্মীয় চেতনার অধিকারী মাওলানারা এখানেই থামেননি। তারা একমত হয়ে জুমার নামাজে একটি খুতবা পাঠে একমত হয়েছেন, যাতে কোরআন ও হাদিসের নিরিখে ইসলামের উদার মানবিক কল্যাণময় রূপটি ফুটে উঠেছে। কোরআন ও হাদিসের আলোকে রচিত খুতবার বিরুদ্ধতা করে হেফাজতে ইসলামের আমির কি কোরআন-হাদিসের বিরুদ্ধে দাঁড়ালেন? যারা তরুণদের কামার্ত করে তুলে তাদের যৌন আকাক্সক্ষাকে পুঁজি করে ধর্মের কথা শোনাতে চান ও ধর্মের পথে আনতে চান তারা নিশ্চয় ইসলামের বাণী সঠিকভাবে জানেন না।

কিছুসংখ্যক মাওলানা দীর্ঘকাল ধরে খুতবা ও ওয়াজে ইসলামের এক অনুদার অমানবিক রূপ দাঁড় করিয়ে অন্য ধর্ম ও ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে ইংরেজিতে যাকে বলে হেইট স্পিচ বা ঘৃণামূলক ভাষণ দিয়ে আসতেন। এতে ইসলাম ধর্মের উদার মানবিক রূপটি সম্পূর্ণ ঢাকা পড়ে যায়। এ বাস্তবতায় ইসলামি ফাউন্ডেশনের তৈরি করে দেওয়া খুতবা ইসলাম সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা মোচনে সহায়তা করবে।

আশার কথা কিছু চিহ্নিত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মানুষ উল্লিখিত খুতবার বিরুদ্ধতা করলেও বিপুলসংখ্যক মসজিদের ইমাম এটি গ্রহণ করেছেন। এটি পড়লে সবাই বুঝবেন ইসলামি জ্ঞানে আলোকিত আলেমরাই এ খুতবা প্রণয়ন করেছেন।

আমরা এ-ও লক্ষ করছি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মাদ্রাসা শিক্ষকদের যে সমাবেশ হয়েছে তাতেও জঙ্গিবাদ ও ভিন্নধর্মী মানুষ হত্যার বিরুদ্ধে ঐকমত্যের অঙ্গীকার ব্যক্ত হয়েছে। এটাও স্পষ্ট আজ মুষ্টিমেয় কিছু বিপথগামী মানুষ ছাড়া দেশের জনগণ জঙ্গিবাদবিরোধী চেতনায় ঐক্যবদ্ধ। এই ঐক্যকে আমরা স্বাগত জানাই এবং সরকারের কাছে দাবি জানাব এটিকে কাজে লাগাতে। ইংরেজি প্রোভার্ব বলে হিট দ্য আয়রন হোয়েন ইট ইজ হট। অর্থাৎ লোহাকে কোনো কাজের জিনিসে রূপান্তর করতে হলে তা গরম থাকতেই ঘা দিয়ে কাজটা করতে হবে। কারণ গরম লোহাকে পিটিয়েই কিছু বানাতে হয়। আবার বাংলা বাগধারা বলেÑ সময়ের এক ফোঁড় অসময়ের দশ ফোঁড়। সঠিক সময়ে এক ফোঁড়েই কাজ হয়, সময় পেরিয়ে গেলে দশ ফোঁড় লাগে, এমনকি তাতেও কাজ না হতে পারে। বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমনের এটিই উপযুক্ত সময়। মানুষ আজ সন্তানদের নিয়ে, তাদের ও দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তিত। সবাই সুন্দর ভবিষ্যতের সঠিক পথরেখা জানতে চায় এবং তা বাস্তবায়নে দায়িত্ব পালনে আগ্রহী। তাদের এ ইচ্ছা এবং ঐক্যকে আজ কাজে লাগানোই হলো মূল কাজ।

কে দেবেন এ কাজে নেতৃত্ব?

ষাটের দশকে বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন এবং একাত্তরের মুক্তিসংগ্রামে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব ঐক্যবদ্ধ জাতির আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তার সাহস, আত্মত্যাগ এবং দূরদর্শিতা মিলে তিনি সেদিন হয়ে উঠেছিলেন জাতির মুক্তির মহানায়ক।

আজ জাতি তারই যোগ্য উত্তরসূরি খুঁজছে। যে কোনো বিচারেই এই দায়িত্বটি বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার ওপরই এসে পড়েছে। ইতিহাস সেভাবেই জাতির এবং তার ভাগ্য নির্ধারণ করেছে। আশার কথা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন করছেন। এ ব্যাপারে তার আন্তরিকতা, সদিচ্ছা এবং দৃঢ়প্রত্যয় সম্পর্কে জাতিও নিঃসন্দিগ্ধ।

এখন চাই সঠিক কর্মসূচি এবং তা বাস্তবায়নে যথাযথ কর্মপরিকল্পনা। জঙ্গিবাদবিরোধী জাতীয় ঐক্য নিছক রাজনৈতিক ঐক্যও নয়, দলীয় বিষয়ও নয়, এটি সর্বসাধারণের সদিচ্ছার ঐক্য। এর মধ্যে নানা বিষয়ে মত-পথের পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু আপাতত ঐক্য হবে কেবল জঙ্গিবাদ ইস্যুতে। এ দানবকে পরাস্ত করা অত্যন্ত জরুরি। তা না হলে উন্নয়ন যেমন ব্যাহত হবে, তেমনি বাধাগ্রস্ত হবে গণতন্ত্র, নষ্ট হবে আমাদের হাজার বছরের মানবতাবাদী ঐতিহ্য।

জঙ্গিবাদের যে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট আছে সেটিও আমাদের বিবেচনায় নিতে হবে। আমাদের ভুললে চলবে না, পশ্চিমের পুঁজিবাদী দেশগুলো বিশ্বব্যাপী তাদের অর্থনৈতিক কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক আধিপত্য বজায় রাখার বিষয়ে কখনো ছাড় দেয় না। এই আর্থ-রাজনৈতিক এজেন্ডা পূরণ করতে গিয়েই তারা আফগানিস্তানে ধর্মান্ধ তালেবানদের মদদ দিয়েছে, ইরাকে মিথ্যা ছুতা ধরে প্রত্যক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করে সে দেশে নারী-শিশুসহ এযাবৎ প্রায় পনেরো লাখ বেসামরিক নাগরিক হত্যায় পিছপা হয়নি। তারাই তেলসমৃদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা তৈরি ও নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখার জন্য আল কায়েদা সৃষ্টি করেছে। যখন তালেবান ও আল কায়েদার প্রয়োজন ফুরিয়েছে তখন তাদের বিনাশে সর্বাত্মক হামলা চালিয়েছে। তারা এ কাজে দোসর হিসেবে সৌদি আরব, কুয়েত, পাকিস্তানসহ তাঁবেদার মুসলিম রাষ্ট্রের সহযোগিতা নিয়েছে।

বিশ্লেষকদের ধারণা, সিরিয়া ও ইরাকে খেলাফত প্রতিষ্ঠার নামে যে জঙ্গি সংগঠন আইএস গড়ে উঠেছে এটিরও পেছনে পুঁজিবাদী বিশ্বের হাত রয়েছে। প্রতিটি জঙ্গি সংগঠনের মতোই আইএসও এক পর্যায়ে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনে পরিণত হয়েছে। এখন তারা প্রতিবেশী মুসলিমদের হত্যা করার পর ইরাক ও সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে একটা আঞ্চলিক শক্তি হয়ে উঠেছে। আমরা জানি সাম্রাজ্যবাদ-পুঁজিবাদ সহজে সামনে আসে না। আইএসের কাছে সাহায্য এসেছে সৌদি আরব ও তুরস্কের মাধ্যমে। এখন পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠেছে। পশ্চিমা শক্তি তাদের আঞ্চলিক আধিপত্য ধরে রাখার জন্য এবার আইএসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়। তারা আইএসবিরোধী যুদ্ধ কিছুটা জোরদার করায় আইএসের পক্ষে অধিকৃত ভূখ-গুলো রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ছে। ইতোমধ্যে ইরাকে মসুল শহরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চল তাদের হস্তচ্যুত হয়েছে। পরিস্থিতি এভাবে পরিবর্তিত হওয়ার ফলে আইএস এখন দুভাবে অস্তিত্ব রক্ষা ও প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। একদিকে পশ্চিমে সন্ত্রাসী হামলা ও গুপ্তহত্যা চালিয়ে তাদের কাছে নিজেদের শক্তি ও ক্ষমতার পরিচয় দিতে চায়। অন্যদিকে কাজে লাগাতে চায় বাংলাদেশের মতো মুসলিমপ্রধান দেশের পশ্চিমের প্রতি বিক্ষুব্ধ তরুণদের। তারা পশ্চিমের আর্থ-রাজনৈতিক আগ্রাসনকে কেবল ধর্মীয় বিচারে মুসলিমবিরোধী ভূমিকা হিসেবে দেখিয়ে ইসলামি জিহাদের ডাক দিচ্ছে। যদিও আমরা জানি পশ্চিমের পুঁজিবাদী বিশ্ব আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার দেশেও একইভাবে প্রভাব ও আধিপত্য বিস্তারের কাজ করে যায়। কিন্তু রাজনৈতিক বিবেচনা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে মুসলিম মানসে ধর্মীয় জিহাদের পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে এবং বিক্ষুব্ধ মুসলিম তরুণরা এতে সাড়া দিচ্ছে।

সবাই স্বীকার করবেন বিশ্বায়ন আর বাজার অর্থনীতির চরম ভোগবাদিতার এ যুগে তরুণদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনা ও বিচক্ষণতার অভাব ঘটেছে। সর্বত্র এবং সর্বস্তরে আজ আদর্শবাদের চরম দুর্দিন চলেছে। আদর্শহীন রাজনীতির দাপটে বিশ্ব আজ এক রাজনৈতিক অবক্ষয়ের কালে এসে পড়েছে। এ সময়ে অন্ধশক্তির বিকার বাড়াই স্বাভাবিক। কারণ নীতি ও আদর্শ মানুষের চেতনার বিকাশ ঘটায়, জ্ঞানচক্ষুর উন্মীলন ঘটায়। তাতে আজ সংকট চলছে। নেমে আসছে অন্ধকার যুগ।

তবে মনে হয় দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার পর মানুষ যেন চৈতন্য ফিরে পাচ্ছে। বাংলার হাজার বছরের মানবতার ঐতিহ্য যেন মানুষের চেতনার দ্বারা করাঘাত করেছে। তাই ঘনায়মান অন্ধকারের মধ্যেও আমরাÑ অন্তত বাংলাদেশের মানুষ আশার আলো দেখতে পাচ্ছি।

এ দেশে জঙ্গিবাদ অবশ্যই পরাস্ত হবে, অবশ্যই পিছু হটবে। তার আলামত শোলাকিয়া, কল্যাণপুরে আমরা দেখেছি। আমরা আস্থার সঙ্গে বলতে পারি অকারণে প্রাণহানি ও রক্তপাতের মধ্যে যে কাপুরুষতা ও অমানবিকতা রয়েছে তা এ দেশের তরুণ সমাজ উপলব্ধি করবে, এ যে ধর্ম নয়, চরম অধর্ম তাও তারা বুঝতে পারবে।

লেখক : কবি, প্রাবন্ধিক