পান চাষে ঘুরেছে ভাগ্যের চাকা

দিনাজপুরের খানসামা উপজেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে পান চাষ বাড়ছে। এ পান চাষ করে ঘুরেছে অনেক কৃষকের ভাগ্যের চাকা। বাপ-দাদার সময় থেকেই পান বরজকে অনেকটা আশীর্বাদ মনে করে চাষ করে আসছেন এই উপজেলার পান চাষিরা। উপজেলার চাহিদা মিটিয়ে উৎপাদনের ৮৫ ভাগ পান যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন স্থানে। কম খরচে লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ঝুঁকছেন পান চাষে। ১০ বছর পূর্ব থেকে বর্তমানে উপজেলায় পানের আবাদ বেড়ে দ্বিগুণ হয়েছে। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, এ বছর উপজেলায় বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ১০ একর জমিতে পানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে উপজেলার দুবলিয়া গ্রামেই ৯৫ ভাগ পান চাষ করা হয়। বর্তমানে উপজেলার ৩০টি পরিবার এই পান চাষের সঙ্গে জড়িত। পান চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভাদ্র-আশ্বিন মাসে দোঁয়াশ মাটিতে আগাছা পরিষ্কার করে তিনবার চাষ দিয়ে প্রতি এক শতক জমিতে ২ কেজি ফসফেট, ১ কেজি চুন ও ২০০ গ্রাম লিজেন্ট মাটির সঙ্গে ভালো করে মিশিয়ে দিয়ে দেড় ফুট দূরত্বে সারি বেঁধে মাটি উঁচু করে ১ ফুট দূরত্বে পানের গাছ লাগিয়ে দিতে হয়। প্রতিটি পানের লতা থেকে ১২-১৫টি চারা লাগানো যায় এবং বাঁশ, পাটকাঠি, জিআই তার, কাশবন, সুপারি পাতা ও সুতা দিয়ে পানের বরজ বানাতে হয়। জমির চারদিকে বাঁশ ও সুপারি পাতা দিয়ে বেড়া দিতে হয় এবং জমির উপরে জিআই তার ও কাশবন দিয়ে চাল বানানো হয়। মাটি থেকে পানের লতা যখন ৪-৫ ইঞ্চি লম্বা হয় তখন পাশে ১টি ৫-৬ ফুট লম্বা পাটকাঠি পুঁতে দেয়া হয়। পানের লতাটি ধীরে ধীরে বড় হয় এবং পাটকাঠি বেয়ে উপরে উঠতে থাকে। ৫-৬ মাস পর থেকে পান বিক্রির উপযোগী হয় এবং এরপর প্রতি ৮-১০ দিন পরপর পান বাজারে নেয়া যায়। ১টি বরজ থেকে সর্বনিম্ন ১৫ বছর একাধারে পান পাওয়া যায়। যদি পানের ফাপ পচা রোগ না হয় তাহলে বরজটি ৫০-৬০ বছর থাকে। আষাঢ়-শ্রাবণ মাসে পানের ফাপ পচা রোগ হয়। এটি পানের সবচেয়ে বড় রোগ। এ রোগ দমনে ফ্লোরি, এডমা ও কাফেডার- এ তিনটি ওষুধ ব্যবহার করা হয়। শীতের সময় একপ্রকার বিষাক্ত কুয়াশা পান গাছে লাগলে পান পাতা ঝরে যায়। এতে চাষিদের মারাত্মক ক্ষতি হয়। এটা প্রতিরোধে কোনো ওষুধ না থাকায় বিপাকে পড়েন চাষিরা। অনেক চাষি কুয়াশা ঠেকানোর জন্য বরজের চারপাশ পলিথিন দিয়ে ঢেকে দেয়। পানচাষি রণজিৎ রায় জানান, খানসামা উপজেলায় দুই প্রকার পান চাষ হয়, মিষ্টি পান ও সাচি পান। তবে উপজেলায় মোট চাষের ৮০ ভাগই মিষ্টি পান। একই কথা জানালেন লতা রানী রায়। তিনি বলেন, পান চাষ করেই আমাদের সংসার চলে। আমি এবং আমার স্বামী দুজনেই বরজে কাজ করি। ২৭ বছর ধরে পানের বরজ করে আসছি। বর্তমানে ২৩ শতক জমিতে পানের বরজ রয়েছে। প্রতিহাটে সপ্তাহে (দুই দিন) ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার পান বিক্রি করি। এখান থেকেই আয় করে সংসারের খরচসহ সন্তানদের লেখাপড়া করানো হয়। দুবলিয়া গ্রামের পানচাষি রমনি রায় জানান, এখানকার সব পরিবার এক সময় ব্যবসা আর শখের বশে শতাধিক পানের বরজে পান চাষ শুরু করেন। গ্রাম কিংবা শহরে অতিথি আপ্যায়নে এ পানের এখনো চাহিদা রয়েছে। চুন ছাড়া পানপাতার রস আর কাঁচা সুপারির রস হার্টের উপকারিতা ছাড়াও ছাঁচি পানের রস দিয়ে যৌনরোগের ওষুধ তৈরি করে চিকিৎসা ক্ষেত্রে গ্রামের কবিরাজরা বেশ নাম রেখেছে। রংপুর থেকে দুবলিয়া গ্রামে পান কিনতে আসা এক পান ব্যবসায়ী বলেন, এখানকার পান সুস্বাদু হওয়ায় এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। আমাদের লাভও ভালো হয়। খানসামা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ এজামুল হক পানের বরজ পরিদর্শন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের জানান, খানসামার মাটি পান চাষের জন্য বেশ উপযুক্ত হওয়ায় এখানে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন প্রজাতির পানের চাষ করে চাষিরা। বর্তমানে বিভিন্ন গ্রামের চাষিরা বাণিজ্যিক ভিত্তিতে অনেক পানের চাষ করেছে। প্রতিবছর পানের আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে কৃষকদের সকল প্রকার পরামর্শসহ সার্বিক সহযোগিতা প্রদান করা হচ্ছে। এলাকার সচেতন মহল মনে করেন, সরকারের নজরদারি থাকলে পান চাষে আগ্রহী এসব পরিবার আর্থিক লাভবানের মধ্য দিয়ে তাদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারবে বলে আশা প্রকাশ করেন পান চাষিরা।