রফতানি আয়ের ইতিবাচক ধারা অব্যাহত রাখাটাই এখন চ্যালেঞ্জ

রেজাউল করিম খোকন: পণ্য রফতানি আয়ে নতুন মাইলফলকে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। সদ্যসমাপ্ত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩ হাজার ৪২৪ কোটি ১৮ লাখ ডলারের রফতানি আয় করতে সক্ষম হয়েছে। দেশীয় মুদ্রায় যা প্রায় ২ লাখ ৭৩ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকার সমান। দেশের ইতিহাসে এক অর্থবছরের হিসাবে এটাই সর্বোচ্চ পণ্য রফতানি আয়। গত ২০১৪-১৫ অর্থবছরে রফতানি আয় হয়েছিল ৩ হাজার ১২১ কোটি ডলার। সেই হিসাবে সর্বশেষ অর্থবছরে রফতানি আয় বেড়েছে ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ। গত অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৩৫০ কোটি ডলার। তবে শেষ পর্যন্ত লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে রফতানি আয় বেড়েছে ২ দশমিক ২১ শতাংশ। মোট রফতানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশই তৈরি পোশাক খাত থেকে এসেছে। এই খাতটি ভালো প্রবৃদ্ধি করায় সামগ্রিক রফতানি আয়ে ইতিবাচক ধারা বজায় রয়েছে।
২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথম মাস জুলাইয়ে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ছিল নেতিবাচক। সে মাসে আয় কমে গিয়েছিল ১১ দশমিক ৯৬ শতাংশ। তবে আগস্টে অবস্থার উন্নতি হতে শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় গত নভেম্বরের শেষে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ। জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি, মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে এ ধারা অব্যাহত ছিল। সর্বশেষ জুন মাসে রফতানিতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৭০ শতাংশ। অনেক বাধা-বিপত্তি, প্রতিকূলতা উপেক্ষা করে গত ২০১৫-১৬ অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হয়েছে। যদি এভাবে রফতানি খাতে প্রবৃদ্ধির ইতিবাচক ধারা অব্যাহত থাকে তাহলে ২০২১ সালে যে ৬০ বিলিয়ন ডলারের রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে, তা অর্জন করা সম্ভব হবে সহজেই। তবে এজন্য গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করে ধাপে ধাপে এগিয়ে যেতে হবে।
রফতানি বাণিজ্যের সব সূচক ইতিবাচক ধারায় ফিরেছে বলে এক ধরনের স্বস্তিবোধ হলেও সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা আশঙ্কার সূচনাও করেছে। রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি অর্জন করার ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। রফতানির প্রধান খাত তৈরি পোশাক শিল্পের ভালো প্রবৃদ্ধির জন্য ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান, অ্যাকর্ড এবং অ্যালায়েন্স গার্মেন্টস খাতের মান উন্নয়নে গৃহীত কর্মসূচিতে অনেক ভূমিকা রেখেছে।
এদিকে রফতানিতে ভালো প্রবৃদ্ধি হলেও অনেক পণ্যে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হয়নি। এর মধ্যে রয়েছে সিমেন্ট, ফলমূল শাকসবজি, চামড়া, পশমি জাতীয় পণ্য, ইলেকট্রনিক প্রোডাক্ট, হিমায়িত মাছ, চিংড়ি, চা, তামাকজাত পণ্য, প্লাস্টিক পণ্য, হ্যান্ডিক্রাফ্ট, সিল্ক, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং বাইসাইকেল। চিংড়ি ও হিমায়িত মাছ রফতানি আয়ে আগামীতে বড় ধরনের ধস নামার আশঙ্কা রয়েছে, যার প্রধান কারণ ইউরোপে মুদ্রার অবমূল্যায়ন। এ খাতে প্রায় ৮৫ শতাংশ রফতানি আয় আসে ইউরোপ থেকে।
২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশের রফতানি আয়ের পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১২১ কোটি ডলার। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৩ হাজার ১৮ কোটি ডলার এবং ২০১২-১৩ অর্থবছরে ছিল ২ হাজার ৭০২ কোটি ডলার। বাংলাদেশের রফতানি আয়ের পরিমাণ প্রতি বছরেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতিবাচক ধারায় রফতানি খাত এগিয়ে গেলেও সাম্প্রতিক সময়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ব্রিটেনের বের হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এবং গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গি হামলায় বিদেশি নাগরিক হত্যাযজ্ঞের ঘটনায় রফতানি খাতে মারাত্মক ঋণাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সাধারণত বাংলাদেশের রফতানির ৬০ শতাংশের বেশি যায় ইইউভুক্ত দেশগুলোতে। ইইউ দেশগুলোর মধ্যে জার্মানির পরে ব্রিটেনেই সবচেয়ে বেশি পণ্য রফতানি করে বাংলাদেশ। গত অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে (জুলাই-মে) ব্রিটেনে ২৭ হাজার কোটি টাকার পণ্য রফতানি হয়েছে, যার বেশিরভাগই তৈরি পোশাক। স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে ইইউতে সব পণ্য রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা পায় বাংলাদেশ। ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর বাংলাদেশ ব্রিটেনের কাছ থেকে সেই সুবিধা পাবে কি না তা নিয়ে সংশয়, শঙ্কার মধ্যে পড়ে গেছে বাংলাদেশের রফতানিকারকরা। ব্রিটেনে প্রায় ৫ লাখ বাংলাদেশি বসবাস করে। ব্রিটেনে প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাঠানো বড় অঙ্কের রেমিট্যান্স আসে দেশে। গত অর্থবছরে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা পাঠিয়েছে ব্রিটেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কিন্তু পাউন্ডের দরপতনের কারণে তারা আগের চেয়ে কম পরিমাণ রেমিট্যান্স পাঠাবে দেশে, তেমন আশঙ্কা ব্যক্ত করেছে বিশেষজ্ঞ মহল। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকার গুলশানে আর্টিজান রেস্তোরাঁয় জঙ্গিদের হামলায় নিহত হয়েছে ৯ জন ইতালির নাগরিক। যাদের সবাই বাংলাদেশ থেকে তৈরি পোশাক রফতানি ব্যবসা এবং পোশাক শিল্প প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত ছিলেন। এ ঘটনার পর বাংলাদেশের পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারী প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত বিদেশি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক এবং অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আগামীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রফতানি বাণিজ্যে এর অনাকাঙ্ক্ষিত ঋণাত্মক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের রফতানির যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে তার প্রায় অনেকটা অংশ তৈরি পোশাক রফতানির ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয়েছে। অন্যান্য খাতে গত বছরের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থতা সহজেই চোখে পড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে ব্রিটেনের বেরিয়ে যাওয়ার ধাক্কা পড়বে আমাদের তৈরি পোশাক রফতানি খাতে-এমন আশঙ্কার মধ্যে এখন গুলশান ট্র্যাজেডির মন্দ প্রভাব নিয়ে নতুন করে দুশ্চিন্তা যুক্ত হয়েছে। আমাদের তৈরি পোশাকের শীর্ষ গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। মূল্য সংযোজন বিচারে বাংলাদেশ নিম্ন ও মধ্যম মানের পোশাক রফতানি করে। অর্থনীতিতে মন্দা থাকলেও এসব পণ্য ভোক্তা বা গ্রাহক ব্যবহার করে। যে কারণে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পোশাক রফতানি খাতে আয় কিছুটা বেড়েছে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে। পরিমাণ ও আয় উভয় বিবেচনায় বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বস্ত্র ও পোশাক রফতানি বাড়লেও সরবরাহকারী কারখানা মালিকরা খুব বেশি লাভবান হচ্ছে না। কারণ, কারখানার কমপ্লায়েন্স ও জ্বালানি ব্যয় বেড়েছে। আবার আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্য কমেছে। এসব ইস্যুতে ক্রেতারা পণ্যের মূল্য আরও কমিয়ে দিয়েছে।
রফতানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) ও পুনঃঅর্থায়নে ১৬ হাজার ৮৩০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ১৯৮৯ সালে রফতানিকারকদের জন্য ৩ কোটি ১২ লাখ ডলারের তহবিল দিয়ে ইডিএফ যাত্রা শুরু করেছিল। বর্তমানে সেই ফান্ড ২০০ কোটি বা দুই বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। সাধারণত পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা ইডিএফ থেকে সর্বোচ্চ দুই কোটি ডলার পর্যন্ত ঋণ সুবিধা পেয়ে থাকে। ইডিএফের বেশিরভাগ ঋণ পোশাক শিল্প মালিকরা পেয়ে থাকে। সাম্প্রতিক সময়ে ইডিএফের আওতা বাড়ানো হয়েছে। এতে পোশাক রফতানির সঙ্গে জড়িত ব্যবসায়ী তথা বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিটিএমএ সংগঠনের সদস্য ছাড়াও বস্ত্র, চামড়া, চামড়াজাত পণ্য এবং প্লাস্টিক পণ্য প্রস্তুতকারীরা ইডিএফ থেকে ঋণ সুবিধা পাচ্ছে। এ ছাড়া রফতানি পণ্য উত্পাদনের জন্য প্রয়োজনীয় উপকরণ যেমন তুলা, সুতা, শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতেও রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে ঋণ সুবিধা পাওয়া যাচ্ছে। রফতানি আয়ের পরিমাণ বাড়াতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এবারের ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে রফতানি খাতের উেস কর ১ দশমিক ৫ শতাংশ প্রস্তাব করা হলেও রফতানিকারকদের দাবির মুখে শেষ পর্যন্ত প্রস্তাবিত ১ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে উেস কর দশমিক ৬০ শতাংশ ধার্য করা হয়েছে।
২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের পথে হয়তো নানা প্রতিকূলতা আছে, যা অতিক্রম করে সমৃদ্ধির ধারা বজায় রাখাটা নিঃসন্দেহে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের প্রত্যাশা, সব প্রতিকূলতা, বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধির ধারা এ বছরও অব্যাহত থাকবে। রফতানি আয় বাড়াতে নানামুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের মধ্যে রফতানি বাণিজ্যকে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন ধরনের পণ্য রফতানির উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। পৃথিবীর কোন দেশে কোন ধরনের পণ্যের চাহিদা রয়েছে তা জানতে হবে। এজন্য বিদেশে বাংলাদেশ দূতাবাস ও মিশনগুলোকে সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে। বিভিন্ন দেশের আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে হবে। এজন্য আমাদের রফতানিকারকদের নিজস্ব উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। বর্তমানে যেসব দেশের সঙ্গে আমাদের রফতানি বাণিজ্য চালু রয়েছে তার বাইরে আরও নতুন দেশে বাজার খোঁজার চেষ্টা জোরালো করতে হবে। রফতানি বাণিজ্যের বিকাশ ঘটাতে হলে আমাদের উত্পাদিত পণ্যের মান উন্নত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার কারণে বাংলাদেশি বিভিন্ন ধরনের পণ্যের চাহিদা সৃষ্টি হয়েছে বিভিন্ন দেশে। বিশেষ করে খাদ্য ও কৃষিজাত শিল্পপণ্য রফতানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের কয়েকটি প্রতিষ্ঠান অভূতপূর্ব সাফল্য অর্জন করেছে। বাংলাদেশের বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের পণ্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি পাওয়ায় এর বাজার বিস্তৃতির উজ্জ্বল সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে রফতানি পণ্যের বহুমুখীকরণ এবং নতুন বাজার সৃষ্টির প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। সময়োপযোগী, কার্যকর, বাস্তবমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ একান্ত প্রয়োজন এজন্য।
দেশে নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, স্বস্তিকর সামাজিক পরিবেশ, সুস্থ-সুন্দর ব্যবসায়িক অবকাঠামো, সুশাসন নিশ্চিত করা গেলে রফতানি আয়ের অব্যাহত প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা মোটেও কঠিন হবে বলে মনে হয় না। গ্যাস, বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে অনেক শিল্প-কারখানায় উত্পাদন ব্যাহত হয়, যার প্রভাব সরাসরিভাবে রফতানি বাণিজ্যে পড়ে। এজন্য রফতানিমুখী শিল্প-কারখানাগুলোতে গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো প্রয়োজন। এ ছাড়া প্রতিযোগী দেশের সরকার রফতানিমুখী শিল্পের বিভিন্ন খাতে যেসব সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে সেসব বিবেচনায় এনে নীতি নির্ধারণ করতে হবে। সরকারি দফতরসমূহে হয়রানি, আমলতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতা এবং জটিলতা অনেক সময় রফতানিমুখী শিল্প খাতগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ ধরনের হয়রানি, দীর্ঘসূত্রতা, প্রশাসনিক জটিলতা দূরীকরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।