দারিদ্র্য বিমোচনে চা- বদলে যাচ্ছে অর্থনীতির চাকা

পঞ্চগড়ে চায়ের আবাদ এখন আর সম্ভাবনা নয়, বাস্তব। শুধু পঞ্চগড় নয়, পাশর্^বর্তী ঠাকুরগাঁও জেলার বালিয়াডাঙ্গী উপজেলায়ও ইদানীং চায়ের আবাদ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে দেশের তৃতীয় চা-অঞ্চল হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে পঞ্চগড় জেলা। ফলে ‘দারিদ্র্য বিমোচনে চা’- স্লোগানটি এখন সত্যে পরিণত হয়েছে। ‘ক্ষুদ্রায়তন পদ্ধতি’তে (ছোট ছোট ভূখ- নিয়ে গঠিত অঞ্চল) চা চাষ প্রকল্প শুরুর সময় থেকেই ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও বাংলাদেশ সরকার যৌথভাবে এই সেøাগান গ্রহণ করে।

বিগত কয়েক বছরে এই চা আবাদই বদলে দিয়েছে গোটা পঞ্চগড় জেলার অর্থনীতির চিত্র। দিনে দিনে পাল্টে যাচ্ছে অভাব, দারিদ্র্য। বিশেষ করে সমতল ভূমিতে ক্ষুদ্রায়তন পদ্ধতিতে চা চাষ করে অসংখ্য চাষী এখন স্বাবলম্বী। এই জেলার অন্তত ৫ শতাধিক চাষী ক্ষুদ্রায়তন পদ্ধতিতে চা আবাদের জন্য বাংলাদেশ চা বোর্ডের আঞ্চলিক অফিসে নিজেদের নাম নিবন্ধনভুক্ত করেছে। এবং আরও শতাধিক চাষী নাম নিবন্ধনের জন্য আবেদন করেছে। এক সময় যে জমিতে শুধু আমন অথবা আখের এক ফসলী আবাদ হতো, আজ সেই পঞ্চগড় সদর, তেঁতুলিয়া ও আটোয়ারী উপজেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে শয়ে শয়ে একর জমি চায়ের সবুজ পাতায় ভরে গেছে। চা বিশেষজ্ঞদের মতে, এখানে আন্তর্জাতিক মানের এবং দার্জিলিং ভ্যারাইটির চা উৎপাদন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির জন্য পঞ্চগড়ের চা নিলামে উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্র ছাড়াও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে মিনা টি (অর্গানিক) নামে একটি ব্র্যান্ড রফতানি হচ্ছে।

উল্লেখ্য, বিগত ২০০০ সালে তৎকালীন জেলা প্রশাসক রবিউল ইসলামের মাধ্যমে তখনকার প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা পঞ্চগড় জেলায় ক্ষুদ্রায়তন পদ্ধতিতে চা চাষ প্রকল্প চালু করেন। এরপর এখানকার চা চাষীদের আর বসে থাকতে হয়নি। বেশ আগ্রহভরে তারা নেমে পড়েন চা আবাদে।

পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ড অফিস সূত্রের হিসাব মতে, বড় মাঝারি এবং ক্ষুদ্রায়তন এই তিন ক্যাটাগরিতে এক হাজার ৭১৩ দশমিক ৮৩ হেক্টর জমিতে চায়ের আবাদ হলেও জেলায় চা আবাদযোগ্য জমি রয়েছে দুই হাজার ৪৯ দশমিক ২ হেক্টর। সূত্র মতে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এসব টি এস্টেট ও বাগান থেকে এক কোটি ১৮ লাখ ৬২ হাজার ২৬ কেজি কাঁচা চা পাতা উত্তোলন করা হয়েছে, যা থেকে কাল চা উৎপাদিত হয়েছে ২৫ লাখ ২১ হাজার ৯২১ কেজি। সূত্র মতে, ২০১৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জেলায় চা আবাদের যে অগ্রগতি ছিল, চলতি বছরের গেল জুন পর্যন্ত আরও ২শ’ হেক্টর বেশি জমিতে চায়ের আবাদ হয়েছে। এতে, এ বছর অতিরিক্ত আরও ২৫ লাখ কেজি কাঁচা চা পাতা উত্তোলন করা হয়। প্রতিবছরই চা আবাদের পরিধি বাড়ছে। যে হারে চায়ের আবাদ বাড়ছে তাতে করে ভবিষ্যতে এ অঞ্চল থেকেই বছরে তিন কোটি কেজি কাঁচা চা পাতা আহরণ করা যাবে বলে সূত্র জানায়।

এছাড়াও সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়ার এপারে বাংলাদেশ সীমান্ত ঘেঁষে ভারতীয় চা বাগানের কাঁচা চা পাতাও চোরাপথে চলে আসছে পঞ্চগড়ের বিভিন্ন চা ফ্যাক্টরিতে। ভারতে কাঁচা চা পাতার কেজি ১৫/১৬ টাকা ভারতীয় রুপী। বাংলাদেশী মুদ্রায় ২০ টাকা কেজি পড়ছে। পঞ্চগড়ে কাঁচা চা পাতা ২৪ থেকে ২৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা ভারতীয় চা ফ্যাক্টরিগুলো ‘দুটি পাতা একটি কুড়ি’র বেশি কাঁচা চা পাতা সংগ্রহ না করলেও পঞ্চগড়ের ফ্যাক্টরিতে ৫/৬টি পাতা দিলেও ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ সংগ্রহ করছেন। এ বছর ফ্যাক্টরিগুলোর উৎপাদন ক্ষমতার চেয়ে বেশি কাঁচা চা পাতা সংগৃহীত হওয়ায় চা চাষীরা সঠিক সময়ে চা পাতা সরবরাহ করতে পারছেন না। ফলে অনেক চাষীরই বাগান থেকে উত্তোলিত কাঁচা পাতা পচে যাচ্ছে। এতে তাদের আর্থিক লোকসান গুনতে হচ্ছে। চা চাষীরা উত্তোলনকৃত কাঁচা চা পাতা ফ্যাক্টরিতে দিতে না পেরে তা সড়কের ওপর ঢেলে প্রতিবাদ বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। ফ্যাক্টরি মালিকরা এই সুযোগে কাঁচা চা পাতার প্রতি কেজি ২৫ টাকা থেকে কমিয়ে ২৪ টাকা কেজি নির্ধারণ করে দেয়।

পঞ্চগড় ও তেঁতুলিয়ায় এ পর্যন্ত ৭টি চা প্রক্রিয়াজাতকরণ ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয়েছে। এর মধ্যে ২টি ফ্যাক্টরি কাজী এ্যান্ড কাজী ও স্যালির‌্যান টি ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ তাদের নিজস্ব বাগান থেকে উত্তোলিত কাঁচা চা পাতা প্রক্রিয়াজাত করে। অন্য ৫টি ফ্যাক্টরি বাণিজ্যিকভাবে ছোট, বড় চা বাগান মালিক ও ক্ষুদ্রায়তন চা চাষীদের কাছ থেকে কাঁচা চা পাতা সংগ্রহ করে। এসব ফ্যাক্টরি হলো নর্থ বেঙ্গল টি ফ্যাক্টরি, তেঁতুলিয়া টি কোম্পানি (টিটিসিএল), করতোয়া টি ফ্যাক্টরি, গ্রিন কেয়ার টি ফ্যাক্টরি ও গ্রিন এনার্জি টি কোম্পানি। এর মধ্যে নর্থ বেঙ্গলের দুটি সিটিসি রো থেকে ২০ ঘণ্টায় ৫০ হাজার কেজি, করতোয়ায় ২০ ঘণ্টায় ১০ হাজার কেজি, গ্রিন কেয়ার ২০ ঘণ্টায় ১২ হাজার কেজি, টিটিসিএল ১০ ঘণ্টায় ৫ হাজার কেজি, গ্রিন এনার্জি ১০ ঘণ্টায় ২ হাজার কেজি কাঁচা চা পাতা উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন ফ্যাক্টরি। এর বেশি এসব ফ্যাক্টরি থেকে কাঁচা চা পাতা প্রক্রিয়াজাত করে কালো চা উৎপাদন সম্ভব নয় মর্মে সংশ্লিষ্ট চা ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গেছে। ওই সূত্রের দাবি, প্রতি বছর যে হারে চা আবাদের জমি বাড়ছে তাতে করে এই ৫টি চা ফ্যাক্টরি দিয়ে কাঁচা চা পাতা প্রক্রিয়াজাত করা সম্ভব নয়। সূত্রটির মতে, পঞ্চগড়ে আরও ৪/৫টি ফ্যাক্টরি স্থাপন করা হলে চা চাষীরা সুষ্ঠুভাবে তাদের কাঁচা চা পাতা সরবরাহ করতে পারবেন। এসব ফ্যাক্টরি থেকে ৯টি গ্রেডে চা উৎপন্ন হচ্ছে। এর মধ্যে সবচেয়ে উন্নত জিবিওপি গ্রেডের চা উৎপন্ন হচ্ছে। পঞ্চগড়ের উৎপাদিত চা চট্টগ্রামের বাজারে নিলামে বিক্রি হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মানের দিক দিয়ে দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে।

এদিকে পঞ্চগড়ের পাশর্^বর্তী জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলাতেও ব্যাপকহারে চা চাষ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সেখানকার স্থানীয় সংসদ সদস্য ১শ’ একর জমিতে চা চাষ করেছেন। গ্রিন ফিল্ড নামে একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠান ৫০ একর জমিতে চা বাগান করেছে। ব্যক্তি উদ্যোগে ৫০ জন চাষী ক্ষুদ্রায়তনে চা চাষ করেছে। চা বোর্ডের বালিয়াডাঙ্গীর প্রকল্প কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, আগামী ৫ বছরে এই উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ১শ’ হেক্টর জমি চা চাষের আওতায় আনা হবে। ইতোমধ্যে যেসব ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান চা আবাদ করেছে তাদের বিভিন্ন কারিগরি সহায়তা প্রদানসহ এলাকার চাষীদের চা চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, বালিয়াডাঙ্গীতে এখন পর্যন্ত কোন চা ফ্যাক্টরি স্থাপিত হয়নি। সেখানকার উত্তোলনকৃত কাঁচা চা পাতা পঞ্চগড়ের ফ্যাক্টরিগুলোতে সরবরাহ করা হচ্ছে।

পঞ্চগড় আঞ্চলিক চা বোর্ডের উর্ধতন পরিকল্পনা কর্মকর্তা সুমন সিকদার বলেন, জেলায় এখনও প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি চা চাষের আওতার বাইরে রয়েছে। অবশিষ্ট জমিতে চা চাষে আগ্রহী করতে চাষীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। ফলে প্রতি বছরই চা চাষের পরিধি বাড়ছে। তিনি বেসরকারী উদ্যোগে আরও চা ফ্যাক্টরি স্থাপনের জন্য টি এস্টেট বা বড় চা বাগান মালিকদের প্রতি আহ্বান জানান।