উত্পাদনমুখি খাতে ঋণ বাড়ানোর তাগিদ থাকবে

বর্তমানে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি শান্ত। তবে দীর্ঘদিন ধরে বিনিয়োগ পরিস্থিতির মন্দা কাটছে না। আর বিনিয়োগ না বাড়ার কারণে ব্যাংকগুলোতে প্রচুর উদ্বৃত্ত বা অলস অর্থ পড়ে আছে। তাই অলস এসব অর্থ বিনিয়োগে নিয়ে আসার পাশাপাশি বিদেশি বিনিয়োগ সঠিকভাবে কাজে লাগানো প্রয়োজন। এজন্য উত্পাদনমুখি খাতকে গুরুত্ব দিয়ে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর প্রয়োজনীয় কর্মসূচি নিয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। আর সেটা হলে জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনও সহজ হবে। অন্যদিকে বাজারে বেশি অর্থ চলে গিয়ে যাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে না যায় সেদিকে খেয়াল রেখে নতুন মুদ্রানীতি আজ ঘোষিত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, চলতি অর্থবছরের (২০১৬-১৭) প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) মুদ্রানীতি ঘোষণা হবে আজ মঙ্গলবার। সকাল ১১টায় বাংলাদেশ ব্যাংক গভর্নর ফজলে কবির আগামী ৬ মাসের জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। গভর্নর হিসেবে গত মার্চে দায়িত্ব নেওয়ার পর ফজলে কবির প্রথমবারের মত মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছেন। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে গত কয়েকটি মুদ্রানীতির ধারা ঠিক রেখে নতুন মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে। এবারও সংযত ও সতর্ক ভঙ্গির মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, দেশের পরিস্থিতি এখন অনেক ভালো। এসময়ে প্রবৃদ্ধি ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হবে। একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি সহনীয় মাত্রায় রাখার প্রয়াস থাকবে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রাখার লক্ষ্য নিয়ে প্রতি ৬ মাস অন্তর আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সরকার নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রাকে অগ্রাধিকার দিয়ে মুদ্রানীতিতে ঋণ ও মুদ্রাযোগান বাড়ানো বা কমানোর লক্ষ্যস্থির করা হয়। চলতি অর্থবছর ৭ দশমিক ২ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার। আর মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৬০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক মনে করছে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫০ শতাংশে সীমিত রেখে কাঙ্ক্ষিত প্রবৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে। গত জুনে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশ। আগের অর্থবছর শেষে যা ৬ দশমিক ২৫ শতাংশ ছিল।

জানা গেছে, নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণ যোগানের প্রাক্কলন বাড়ানো হলেও ব্যাপক মুদ্রা যোগানের লক্ষ্যমাত্রা একই রকম থাকছে। গত মুদ্রানীতিতে জুন নাগাদ বেসরকারি খাতে বার্ষিক ঋণ প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন করা হয় ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ। তবে এরই মধ্যে গত মে পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। জুনে এটি আরও বাড়বে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলনের তুলনায় বেশি হলেও সরকারের ঋণ অনেক কম থাকায় ব্যাপক মুদ্রা যোগান কেন্দ্রীয় ব্যাংক নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার মধ্যেই রয়েছে। মূলত ব্যাংক খাতে সরকারের ঋণ চাহিদা কম থাকায় এমন হয়েছে। গত মুদ্রানীতিতে ব্যাপক মুদ্রা যোগানের বার্ষিক প্রবৃদ্ধি ১৫ শতাংশের বিপরীতে মে নাগাদ অর্জিত হয়েছে ১৪ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। আর গত অর্থবছরে ব্যাংক থেকে সরকার ৩১ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করলেও নিয়েছে মাত্র চার হাজার ৮০৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর ব্যাংক থেকে ৩৮ হাজার ৯৩৮ কোটি টাকা ঋণের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং জিডিপি’র প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করা বা এগিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যেই মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়। দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনায় মুদ্রানীতি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এর মাধ্যমে পরবর্তী ছয় মাসে অভ্যন্তরীণ ঋণ, মুদ্রা সরবরাহ, অভ্যন্তরীণ সম্পদ, বৈদেশিক সম্পদ কতটুকু বাড়বে বা কমবে তার একটি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়। মুদ্রানীতি চূড়ান্ত করতে অন্যান্য বছরের মত এবারও বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, বিশিষ্ট ব্যাংকার, প্রাক্তন গভর্নর, প্রাক্তন মন্ত্রী, সাংবাদিকসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে পরামর্শ করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।