চলনবিলে দরিদ্র শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়াচ্ছে ‘শিখন’

ছোট ছোট ডিঙি নৌকায় গাদাগাদি করে বসে আছে স্কুলড্রেস পরা কোমলমতি একদল খুদে শিক্ষার্থী। বৈঠা হাতে হাল ধরেছে নৌকার। এদের ভেতর ভয়-সংশয় নেই। আছে শুধু এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়। ভেসে চলা এসব শিশুর গন্তব্য ‘শিখন পাঠশালা’।

চলনবিলের তাড়াশ উপজেলার বিচ্ছিন্ন গ্রাম শ্যামপুরে রয়েছে শিখনের তিনটি পাঠশালা। গ্রামটির চারদিকে থৈথৈ পানি। বর্ষার পানিতে তলিয়ে গেছে শ্যামপুরের মেঠোপথগুলো। নির্দিষ্ট সময়ে স্কুলে যেতে প্রতিদিন সকালে এভাবেই নৌকায় চাপাচাপি করে যেতে হয়। মাঝি না থাকায় শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নৌকার হাল ধরে স্কুল অভিমুখে ছুটে চলে প্রতিদিন। পাঁচ বছর ধরে চলছে লেখাপড়া শেখার জন্য ছোট ছোট শিশুদের এই সংগ্রাম।

শ্যামপুরসহ চলনবিলের গুরুদাসপুর, তাড়াশ, চাটমোহর ও সিংড়া উপজেলার অবহেলিত ৪৮৭৬ জন কোমলমতি শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ করে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এবং সেভ দ্য চিলড্রেনের কারিগরি সহায়তা প্রাপ্ত দেশি সংস্থা ভিলেজ এডুকেশন রিসোর্স সেন্টার (ভার্ক)। স্কুল সকাল ৯টা থেকে চলে বিকাল ৩টা পর্যন্ত। শিক্ষক রয়েছেন ২১১ জন। সপ্তাহের ছুটির দিন ব্যতীত প্রতিদিন একই নিয়মে স্কুলে যাচ্ছে সুবিধাবঞ্চিত শিশুরা।

২০১২ সালে শিশু জরিপের পর ওই বছরের ডিসেম্বরে তিনটি উপজেলায় ১০০টি স্কুল নিয়ে ভার্ক-এর যাত্রা শুরু হয়। স্কুলগুলোর নাম দেওয়া হয়েছে ‘শিখন স্কুল’। এসব স্কুলে প্রতিবন্ধীসহ দরিদ্র পরিবারের শিশুরা পড়ছে, সরকারিভাবে তাদের বিনামূল্যে বই দেওয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শিক্ষার সকল উপকরণ দিচ্ছে সেভ দ্য চিলড্রেন। এ অঞ্চলের শিশুদের স্কুলমুখী করতে শিখন স্কুলে নেওয়া হয়েছে ব্যতিক্রমী কিছু উদ্যোগ। গুরুদাসপুর ফিল্ড অফিসের আওতায় সিংড়া, চাটমোহর, তাড়াশ এবং গুরুদাসপুর উপজেলায় শিখন স্কুলের পাশাপাশি রয়েছে ৫৭টি শিখন কেন্দ্র। শিখন কেন্দ্রে খেলাধুলার মাধ্যমে শিশুদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ ঘটছে। পড়াশোনায় আগ্রহী হচ্ছে শিশুরা।

যেভাবে যাত্রা শুরু: একটা সময় ছিল যখন বিস্তীর্ণ চলনবিলে স্কুল-কলেজ থাকলেও প্রত্যন্ত পাড়াগাঁয়ের অবহেলিত শিশুদের স্কুলে পড়ার কোনো সুযোগ ছিল না। কেউ কেউ স্কুলে গেলেও টাকার অভাবে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী প্রাথমিকের গণ্ডি পার হতে পারেনি। গ্রামীণ শিক্ষা ব্যবস্থার এমন নাজুক অবস্থার প্রেক্ষাপটে ২০১২ সালে যাত্রা শুরু করে শিখন স্কুল।

পাঁচ বছরের কর্মকাণ্ড : চলনবিলের তিন উপজেলার সুবিধাবঞ্চিত ৬ হাজার শিশুকে ১ম শ্রেণি হতে (চার বছর মেয়াদি), ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত, প্রস্তুতি পর্ব হতে দ্বিতীয় শ্রেণি পর্যন্ত (তিন বছর মেয়াদি) এবং প্রাইমারি স্কুলের পিছিয়ে পড়া ১ হাজার ৮০ জন ছাত্র-ছাত্রীকে পাঠদান করা হচ্ছে। এসব শিক্ষার্থীকে বিনামূল্যে পড়াশোনার যাবতীয় উপকরণ দেওয়া হয়। এ ছাড়া দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকদের দিয়ে ইংরেজি, গণিতসহ ছয়টি বিষয়ে পড়ানো হয়। এ বছর ৩ হাজার ২শ জন শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী (পিএসসি) পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করবে।

বিনোদন : পড়াশোনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ে দীক্ষিত করে তুলতে ক্লাস শেষে নিয়মিত আয়োজন করা হয় চিত্রাঙ্কন, নাচ-গান এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের। শিক্ষার্থীদের উত্সাহিত করতে কেন্দ্র ভিত্তিক ও বার্ষিক পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর কৃতী ছাত্রছাত্রীদের দেওয়া হয় সংবর্ধনা।

অন্যান্য :শিখন ক্লাবে রয়েছে প্রায় ২৬ প্রকারের খেলার সামগ্রী। সপ্তাহে একদিন অভিভাবকদের নিয়ে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। সভায় তুলনামূলক দুর্বল শিক্ষার্থীদের ভালো ফলাফলের জন্য আগ্রহী করে গড়ে তোলা, অভিভাবকদের দায়িত্ববোধ তৈরি, স্কুলের প্রতি দায়বদ্ধতা, স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং বাল্যবিবাহ রোধসহ বিভিন্ন সামাজিক বিষয় নিয়ে অভিভাবকদের সাথে উন্মুক্ত আলোচনা করা হয়। প্রাথমিক চিকিত্সা প্রদান : চলনবিলের এসব সুবিধাবঞ্চিত শিশুর পুষ্টিজনিত কারণে মেধা শূন্যতাসহ স্বাস্থ্যহানি চরমভাবে লক্ষণীয়। শিশুদের এসব সমস্যা দূর করার জন্য শিখন স্কুলগুলোতে বছরে দুবার ভিটামিন এ ক্যাপসুল, কৃমিনাশক ও আয়রন ট্যাবলেট এবং চক্ষু পরীক্ষার মতো চিকিত্সা প্রদান করা হয়। এতে অবহেলিত দরিদ্র পরিবারের শিশুদের লেখাপড়ার পাশাপাশি তাদের মধ্যে স্বাস্থ্য সচেতনতা গড়ে উঠছে। স্কুলে টয়লেট শেষে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

এসএমসি কমিটি: শিখন স্কুল পরিচালনার জন্য ১১ সদস্য বিশিষ্ট একটি এসএমসি কমিটি রয়েছে। ওই কমিটিই ভার্কের শিখন স্কুল ও কেন্দ্র পরিচালনা করেন। এ ছাড়া স্কুলের অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য কমিটির সদস্যগণ ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা বিভিন্ন সময়ে আর্থিক সহায়তা প্রদান করেন।

সমস্যা: ভালো শিক্ষা কার্যক্রম থাকলেও স্কুলের নিজস্ব কোনো ভবন নেই। কার্যক্রম চলে স্থানীয়দের বাড়িতে। অনেক সময় সব স্কুলে পাঠদানের মতো পরিবেশবান্ধব কক্ষ পাওয়া যায় না। স্কুলগুলোতে বিদ্যুত্ না থাকায় প্রচণ্ড গরমে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের খুবই কষ্ট পেতে হয়।

শিখন সহায়ক :শিখন স্কুলে মোট ১২ জন শিখন সহায়ক কর্মরত আছেন। এদেরই একজন মো. এমদাদ হোসেন বলেন, তিনি প্রতিদিন শিখনের স্কুলগুলো পরিদর্শন করেন। অভিভাবক কমিউনিটি সদস্যদের সাথে যোগাযোগের মাধ্যমে সকল ছাত্র-ছাত্রীর উপস্থিতি নিশ্চিত করেন।

শিখন সম্পর্কে স্থানীয় সংসদ সদস্য যা বললেন :নাটোর জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক আব্দুল কুদ্দুস বলেন, ভার্কের শিখন স্কুল ও ক্লাবে চলনবিলের শিশুরা বিনামূল্যে প্রাথমিক শিক্ষার সুযোগ পাচ্ছে। এ ধরনের কার্যক্রম অব্যাহত থাকলে একদিন আলোকিত হবে চলনবিলের মাটি ও মানুষ।