চট্টগ্রাম হবে গ্রিন ও ক্লিন

আ জ ম নাছির উদ্দীন গত বছর ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন। দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২৬ জুলাই। তাই চাওয়া-পাওয়ার হিসাব কষছেন নগরবাসী। আগামী চার বছর কী কী কাজ করতে চান সিটি মেয়রসে প্রশ্ন নিয়ে সিটি মেয়রের মুখোমুখি হয়েছে সমকাল

সমকাল :মেয়রের দায়িত্ব গ্রহণের এক বছর পূর্ণ হলো। এ সময়টিকে মেয়র হিসেবে কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?

আ জ ম নাছির :এক বছরে নগরীর সমস্যা দূরীকরণে আমি কতটা আন্তরিক ছিলাম সেটি বিবেচনা করতে পারে নগরবাসী। আমি মনে করি নিজেকে শতভাগ উজাড় করেই নগরবাসীর সঙ্গে ছিলাম। হ-য-ব-র-ল করপোরেশনকে শৃঙ্খলায় ফেরাতে পেরেছি। দুর্নীতিমুক্ত থেকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে কাজ শুরু করেছি। করপোরেশনকে দলীয় কার্যালয়ে রূপান্তর করিনি। দলীয় কোনো নেতাকর্মীকে করপোরেশনের প্রকল্পে অন্যায়ভাবে যুক্ত হতে দিইনি।

সমকাল :৩৫ দফা নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি দিয়ে মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন আপনি। এখন কি মনে হচ্ছে প্রতিশ্রুতি দেওয়া যত সহজ বাস্তবায়ন করা ততটা কঠিন?

আ জ ম নাছির :নির্বাচনের সময় আমি কোনো প্রতিশ্রুতি দিইনি। নগরবাসীর জীবনমান উন্নয়নে আমার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছি মাত্র। সবকিছু আমি করে ফেলব এমনটিও মনে করি না। তবে আমি কিছু করার চেষ্টা করছি কি-না, নগরবাসীর সুখে-দুঃখে থাকছি কি-না সেটি বিবেচ্য হতে পারে। নির্বাচনের সময় আমার ঘোষিত পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছি। সবার সহযোগিতা ছাড়া চট্টগ্রামকে পরিবর্তন করা যাবে না। চট্টগ্রামে যারা আছেন তারা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি চট্টগ্রামকে নিয়ে ঢাকায় যারা ভাবেন তারাও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমি পরিকল্পনা করলাম কিন্তু কোনো বরাদ্দ পেলাম না, তাহলে তো সে পরিকল্পনা আলোর মুখ দেখবে না।

সমকাল :গত এক বছরে কোন কাজটি নিয়ে আপনি বেশি সন্তুষ্ট?

আ জ ম নাছির :নগরীকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি করার যে উদ্যোগ নিয়েছি সেখানে অগ্রগতি আছে। রাতের বেলা বর্জ্য অপসারণ করে সুধীমহলের প্রশংসাও পেয়েছি। আবর্জনা অপসারণে চসিকের বহরে যুক্ত করতে পেরেছি ৩৭টি নতুন গাড়ি। চলতি বছরের ১ আগস্ট থেকে বাড়ি বাড়ি থেকে বর্জ্য সংগ্রহের কার্যক্রম শুরু হবে। প্রাথমিক পর্যায়ে সাতটি ওয়ার্ডে এটি বাস্তবায়ন করা হবে। পাঁচ ধাপে ৪১টি ওয়ার্ডে এ কর্মসূচি বাস্তবায়ন করবে সিটি করপোরেশন। আবার নগরীকে ‘গ্রিন’ করতে ২০১৬ সালের শুরুতে অভিযান চালিয়ে প্রায় পাঁচ হাজার বিলবোর্ড উচ্ছেদ করা হয়, যা করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন অতীতের মেয়ররা। এ ছাড়া নগরীকে সবুজায়ন ও সৌন্দর্যবর্ধনে একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থাকে কাজ দিয়েছে সিটি করপোরেশন। গ্রিন সিটির কার্যক্রমে বিভিন্ন করপোরেট প্রতিষ্ঠানকেও সম্পৃক্ত করেছি। এ উদ্যোগ সফল হলে সত্যিকারের ক্লিন ও গ্রিন সিটি হবে চট্টগ্রাম।

সমকাল : জলাবদ্ধতা নিরসনে কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি নেই। অথচ আপনার নির্বাচনী ইশতেহারে প্রথম এজেন্ডায় ছিল এটি…।

আ জ ম নাছির :এই সমস্যা নিরসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে। চাক্তাই খালে স্লুইস গেট নির্মাণ করা হবে। মহেশখালে বন্দর কর্তৃপক্ষ একটি বাঁধ নির্মাণ করে দিয়েছে। খাল ও নালা-নর্দমা থেকে মাটি তোলার কাজ চলছে। অতীতে কোনো সময় এত মাটি উত্তোলন হয়নি। এবারকার বর্ষা মৌসুমে তেমন জলাবদ্ধতা হয়নি। কারণ নির্র্বাচনের পর ঘোষিত প্রথম বাজেটে জলাবদ্ধতা নিরসনে বরাদ্দ রেখেছি ২৭৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ১৭ কোটি ৫৮ লাখ ৮৯ হাজার টাকা ব্যয়ে ১১৬টি খাল-শাখা খাল থেকে ১৭ হাজার ৯৩৬ ঘনমিটার আবর্জনা ও মাটি উত্তোলন করা হয়। এ ছাড়া ৩ কোটি ৬৮ লাখ ৬৪ হাজার টাকা ব্যয়ে নগরের বিভিন্ন নালা-নর্দমা থেকে আবর্জনা ও মাটি অপসারণ করা হয়। সরকার থেকে পর্যাপ্ত বরাদ্দ না পাওয়ায় নতুন খাল খনন কাজ শুরু করতে পারিনি। তবে নগরের কর্ণফুলী সেতু থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ, চার লেন সড়ক ও কর্ণফুলীর সঙ্গে সংযুক্ত খালগুলোর মুখে স্লুইস গেট নির্মাণের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি সিটি করপোরেশনের সহায়তায় বাস্তবায়ন করছে পানি উন্নয়ন বোর্ড। জলাবদ্ধতা নিরসন করপোরেশনের একার পক্ষে সম্ভব নয়। দুয়েক বছরের মধ্যে আহামরি পরিবর্তনও আনা সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমেই সমাধান করতে হবে পুঞ্জীভূত এ সমস্যা।

সমকাল : নগরবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি ছিল আপনার ইশতেহারে। কিন্তু আপনি দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ করে দিয়েছেন। বন্ধের তালিকায় রেখেছেন আরও ১৬টি। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় আপনার এখনকার পরিকল্পনা কী?

আ জ ম নাছির :স্বাস্থ্যকেন্দ্র বন্ধ করা হয়নি। যে ওয়ার্ডে দুটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ছিল সেখানে একটি বন্ধ করা হয়েছে। এগুলোতে আসলে কোনো রোগী সেবা নিতে যেত না। স্বাস্থ্য সুরক্ষায় ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন জেনারেল হাসপাতালকে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছে। দন্ত বহির্বিভাগ কার্যক্রম ও প্রতিবন্ধী কর্নার চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ফি ৩০ টাকা থেকে কমিয়ে ১০ টাকা করা হয়েছে। স্বাস্থ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও হাসপাতালে ৭৭ জন চিকিৎসক ও নার্স নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। পূর্ণাঙ্গ বার্ন ইউনিটসহ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে সিটি করপোরেশনের।

সমকাল : করপোরেশনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য একটি নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর অগ্রগতি কতটুকু?

আ জ ম নাছির : শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা, উন্নত পাঠদান পদ্ধতি, শিক্ষক নিয়োগ ও পদোন্নতি নিয়ে নানা জটিলতা নিরসনে নীতিমালা তৈরি করেছে বিশেষজ্ঞ কমিটি। এখন যাচাই-বাছাই চলছে। শিক্ষা সম্প্রসারণের লক্ষ্যে মিউনিসিপ্যাল মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ ও পাথরঘাটা মহিলা মহাবিদ্যালয়কে সিটি করপোরেশনের অধীনে আনা হয়েছে। ফতেয়াবাদ বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ে চালু করা হয়েছে একাদশ শ্রেণি। বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে জামালখান কুসুম কুমারী স্কুলে বসানো হয়েছে ফিঙ্গারপ্রিন্ট প্রযুক্তি। শিক্ষার মানোন্নয়নে নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।

সমকাল :সরকারদলীয় মেয়র আপনি। করপোরেশনের উন্নয়নে সরকারের বর্তমান ভূমিকায় আপনি কতটুকু সন্তুষ্ট?

আ জ ম নাছির : অতীতের তুলনায় করপোরেশনের জন্য সরকারের বরাদ্দ বেড়েছে। তবে এটিকে পর্যাপ্ত মনে করি না আমি। রাজস্ব আয়সহ বিভিন্ন খাতে আয় বৃদ্ধি পাওয়ায় ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৩৭৭ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজ হয়েছে, যা ২০১৪-১৫ অর্থবছরের তুলনায় ১৮২ কোটি টাকা বেশি। কিন্তু ২০১৫-১৬ অর্থবছরে সরকার থেকে ৯৭২ কোটি টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও পেয়েছি মাত্র ২২৮ কোটি টাকা, যা প্রত্যাশার মাত্র ২৩ শতাংশ।

সমকাল :সামান্য বৃষ্টি হলেই খানাখন্দে ভরে ওঠে নগরীর সড়ক। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে আপনার পরিকল্পনা কী?

আ জ ম নাছির :আমার দায়িত্ব নেওয়া আগে নগরের সড়কের অবস্থা আরও বেহাল ছিল। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে ৮৫টি সড়ক সম্প্রসারণ ও সংস্কার করা হয়েছে। এ ছাড়া নিজস্ব ও জাইকার অর্থায়নে সড়ক সংস্কার-সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নতুন করে ৮৪টি সড়কের ৬০ কিলোমিটার সম্প্রসারণ করে কার্পেটিং করা হয়েছে। আগামী তিন বছর পর কোনো সড়ক কাঁচা থাকবে না।

আ জ ম নাছির :চট্টগ্রামকে ক্লিন ও গ্রিন সিটি করার কাজটি শেষ করতে চাই। জলাবদ্ধতা সমস্যা নিরসনে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে চাই। নগরীকে হকারমুক্ত করতে হকারদের জন্য একটি নীতিমালা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এটি চূড়ান্ত করে হকারদের পুনর্বাসন করা হবে। শিক্ষা নীতিমালা চূড়ান্ত করতে চাই। স্বাস্থ্য খাতকে কোনো রকম বাঁচিয়ে না রেখে সত্যিকার অর্থে জনগণের সেবা কেন্দ্রে রূপান্তর করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাই। এ ছাড়া আধুনিক ও নান্দনিক চট্টগ্রাম গড়তে ছয়টি মেগা প্রকল্পের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। শাহ আমানত সেতু থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণ, জাইকার অর্থায়নে দুটি ফ্লাইওভার নির্মাণ, বর্জ্য থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন, স্মার্ট সিটি প্রকল্প ও ২৬টি খাল খনন করে নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত করতে চাই। আমার সদিচ্ছা আছে। আমার ওপর আস্থা রাখুন।

সমকাল :সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।

আ জ ম নাছির :সমকালকেও ধন্যবাদ।