বাংলার মায়েরাই পারবে

একুশে জুলাই আমার মায়ের ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকী ছিল। মায়ের জন্য তার স্কুলে আলোচনা ও দোয়া মাহফিল হয়েছে। বাড়ির মসজিদে দোয়া, কুরানখনি ও মিলাদ হয়েছে। আমার গ্রামের মানুষরা আরো একবার স্মরণ করেছে তাদের পীর মাকে। এর বাইরে তাকে নিয়ে বাড়তি দুয়েকটি শব্দও উচ্চারণ করার নেই। তিনি মাদার তেরেসা, মালালা ইউসুফজাই, বেগম রোকেয়া, নূরজাহান বেগম বা সুফিয়া কামাল নন। দেশের প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলীয় নেত্রী, স্পিকার বা বিশিষ্ট কেউই তিনি নন। তার জন্য আমি এর বাইরের বাড়তি কিছু চাইও না। আর দশটি সন্তান যেমন করে তার মাকে স্মরণ করেন আমিও তাই করছি। তবে এবার এমন একটি সময়ে মায়ের স্মৃতি চোখের সামনে এল যখন মনে হচ্ছে প্রতিটি বাঙালি মায়ের জেগে ওঠার সময় হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশটি শত্রুমুক্ত হওয়ার পর ১ জুলাই ২০১৬ ঢাকার গুলশানের হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁর ঘটনা ও শোলাকিয়া মসজিদে ঈদের দিনে হামলা করার সঙ্গে জঙ্গিবাদের যে সূত্রগুলো স্পষ্ট করে জানা গেছে তাতে আমার নিজের কাছে মনে হয়েছে আবার যেন মায়ের কোলে ফিরে যেতে হবে। আমার মায়ের কথাটি বলছি নিজের প্রজন্মের মায়েদের একজনকে প্রতীক করে আমাদের সবার মায়ের কথা বলার জন্য। আমি নিজে মনে করি আমাদের মায়েদের চাইতে এখনকার মায়েরা আরো অনেক স্বর্ণগর্ভা। তারা আমাদের চাইতে অনেক মেধাবী সন্তানের জননী। তারা তাদের সন্তানের অনেক বেশি যতœ নেন। অনেক বেশি সচেতন। তবে তাদের জীবনধারা ও ভাবনাচিন্তায় সম্ভবত কিছু একটা ফারাক আছে যা আমাদের প্রজন্মের মানুষদের মার কাছ থেকে তাদের শিখতে হবে। তারা এদের দাদি-নানি। আমি আমার মায়ের কথা খুব সংক্ষেপে বলছি। কিন্তু নিশ্চিত করেই বলছি আমার বন্ধুবান্ধব ও প্রজন্মের মানুষদের প্রায় সবার মাকেই আমার মা প্রতিনিধিত্ব করেন।

আমার মা এক অসম সাহসী রমণীর নাম- রাবেয়া খাতুন। আমার নানা তাপসী রাবেয়া বসরীর নামে তার বড় মেয়ের নাম রেখেছিলেন। তার পরের দুই মেয়ে আছিয়া ও আয়েশা। ১৯৪৮ সালে ১৪/১৫ বছর বয়সে তার বিয়ে হয়। বাবার সঙ্গে মার বয়সের ব্যবধান হয়তো প্রায় ২৫ বছর। এটি ছিল বাবার দ্বিতীয় বিয়ে। মায়ের বিয়ের এক বছর পরই ১২ আগস্ট ১৯৪৯ আমি জন্মাই। তখনো তিনি আমার নানার বাড়িতে থাকেন। কখনো শ্বশুরবাড়ি দেখেননি। আমি আস্তে আস্তে নানার বাড়িতে বড় হই-হাঁটতে শিখি-স্লোগান দিতে শিখি-নুরুল আমিনের কল্লা চাই। খালা ও নানার কাঁধে চড়ে স্কুলেও যাই। বয়স সম্ভবত ৪ বছর। তখনই মা বেঁকে বসলেন। বাবার সঙ্গে লড়াইতে নামলেন। তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বাবাকে জানিয়ে দিলেন, তার বাবার বাড়িতে তিনি থাকবেন না, তাকে তার নিজের শ্বশুরবাড়িতে নিতে হবে। বাবার তখন আলাদা সংসার। তারা পাঁচ ভাই আমার দাদার সম্পত্তি ভাগাভাগি করে নিয়েছেন। বাবার জমিজমা প্রায় শ’খানেক বিঘা। ১৬০ শতাংশের বাড়ি। সব পতিত। কেউ দেখার নেই। কিন্তু বাবার আগ্রহ ছিল না মাকে সেখানে নেয়ার। প্রায় আদিবাসীদের কৃষি সমাজ, প্রচণ্ড প্রতিক‚ল অবস্থায় মা একা বাবার সংসারের দায়িত্ব নিতে পারবেন তেমনটি তার মনে হলো না। কিন্তু মায়ের জিদের কাছে হেরে গেলেন। মাও জানতেন জঙ্গলে বাস করার মতো জীবন তিনি বেছে নিয়েছেন, একটি নাগরিক জীবনের বদলে। সেই সময়ে ৩ দিন লাগত আশুগঞ্জ থেকে কৃষ্ণপুর যেতে। মা সেভাবেই গেলেন নেত্রকোনা জেলার কৃষ্ণপুর গ্রামে। হাল ধরলেন তার নিজের সংসারের। এখনকার আইনে শিশু বয়সী মা তার নতুন সংসারকে সাজাতে গিয়ে দেখলেন তিনি কিছুই জানেন না। গোবরের চট লেপা, গরুকে খাবার দেয়া, কামলাকে ভাত-তরকারি রেঁধে দেয়া, নদী থেকে পানি আনা, কামলা মেয়েদের দিয়ে কাজ করানো সবই অজানা। গ্রামের কেউ তার পাশে নেই। বাবা বাইরে বাইরে থাকেন- রান্নাঘর থেকে হাওরের জমি এবং সন্তানের লেখাপড়া একাই সামাল দেন। মাঝে মাঝে হাতে টাকাও থাকে না। বাবা বৈশাখ মাসে বাড়ি ফিরে গোলার ধান বেচে টাকাটা পকেটে করে আবার দেশে দেশে ঘুরতে চলে যেতেন। সুফিবাদে বিশ্বস্ত বাবা মার হাতে কি থাকল সেটি কোনোদিন জানতেনও না। মা তার সহযোগী আব্বাস আলী কাকু ও তার ভাই আশরাফ আলী, জনাব আলীসহ কামলা-গোমস্তাদের দিয়ে সংসার সামলাতেন। মা প্রথমেই যে কাজটি করলেন, সেটি অসাধারণ। আমাকে গরু রাখতে রাখাল বানিয়ে মাঠে না পাঠিয়ে স্কুলে পাঠালেন। আমার গ্রামে তখন ২/৩ জন শিশু স্কুলে যেত না। মা যে কেবল স্কুলে পাঠালেন সেটিই নয়, সকালে মক্তবে পাঠাতেন ও সন্ধ্যায় নিজে পড়াতে বসতেন। এক সময় যখন দেখলেন নিজে পড়াতে সময় পান না বা পড়ানোটা তার সীমানার বাইরে তখন বাড়িতে একজন মাস্টার রাখলেন। তারপর তিনি একটি দুঃসাহসী সিদ্ধান্ত নেন। প্রাইমারি পাস করে ৪০ কিলোমিটারে যখন হাই স্কুল পেলাম না তখন ৪০ কিলোমিটার দূরের হাইস্কুলে বোর্ডিংয়ে রেখে পড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। মাসে ২০ টাকা (দুই মণ ধান) এবং ২০ কেজি চাল দিতেন নিজের সংসার থেকে। এরপর পাঠিয়ে দিলেন ঢাকা কলেজে। তারপর বিশ্ববিদ্যালয়ে। তখন তাকে আমার জন্য প্রতি মাসে ১৫ মণ ধান বেচতে হতো। লোকজন মাকে নানা কথা বলত। মা বলতেন, আমার ছেলের দাম সবার হাজার বিঘা জমির চাইতে বেশি। তখনকার দিনে সেই গ্রামে কে বোঝে সেই কথা। নিজের অন্য ছেলেমেয়েগুলোকেও একইভাবে শিক্ষায় জড়িয়ে নিলেন। মার কাছে জীবনের বড় শিক্ষা। শিক্ষাই শক্তি। বাড়িতে হিন্দু-মুসলমানে ভরে থাকত। মা বলতেন, মানুষে মানুষে ধর্ম দিয়ে ফারাক করবা না। নিজে নামাজ-রোজা করেছেন কিন্তু কোনোদিন কোনো হিন্দুর সঙ্গে একটুও খারাপ ব্যবহার করতেন না। তারা তাকে মা ডাকত। যখন একটু বেড়ে উঠি মা তখন তার হাতিয়ার হিসেবে আমাকে ব্যবহার করা শুরু করেন। মা বললেন নিজে লেখাপড়া করলে হবে না, গ্রামের মানুষকে লেখাপড়া করাতে হবে। ওরা তোমার মতো বোর্ডিংয়ে থাকতে পারবে না, ঢাকা কলেজ আর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে পারবে না। গ্রামে স্কুল কর।

মায়ের উৎসাহেই ১৯৬৯ সালে গ্রামে একটি হাই স্কুল দাঁড় করালাম। ১৯৭২ সালে বাবা সেটি চালু করলেন। এরপর ১৯৮৬ সালে আমি প্রতিষ্ঠা করলাম ভাটি অঞ্চলের প্রথম কলেজ যেটি এখন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং সরকারিকরণের তালিকাভুক্ত।

নব্বই দশকের শুরুতে বাড়িতে গিয়ে চারপাশের বাড়িগুলোর অবস্থা দেখে মাকে জিজ্ঞেস করতাম, মা স্কুল-কলেজ হলো, লোকজন লেখাপড়াও করছে কিন্তু গ্রামটা তো বদলাচ্ছে না। মা আমার মাথায় হাত দিয়ে বলতেন, বাবারে পুরুষ মানুষ ঘর সংসার তৈরিও করতে পারে না, বদলাতেও পারে না। আমার মাকে দেখলে সেই কথা সবাই বলত। ততদিনে পুরো গ্রামে মায়ের শত শত ভক্ত। আমার বাবার বাউণ্ডুলে জীবনটাকে নিয়মে এনেছিলেন মা-ই। সবাই ডাকত পীর মা। গ্রামের দুরবস্থার কথা শুনে তিনি বললেন, পারলে একটি মেয়েদের স্কুল কর। মা জানতেন, আমি পারব। মায়ের কথায় ১৯৯৬ সালে পৈতৃক সম্পত্তিতে নিজের খরচে মা-বাবার নামে মেয়েদের স্কুল করলাম। প্রথম বছরেই স্কুলটা ছাত্রীতে ভরে গেল। মা বললেন, বাবারে, স্কুলটা অনেক দূরে- আমি যেতে পারি না- আমার বাড়ির সামনের জমিটাতে স্কুলটা নিয়ে আয়। তোরা জমি দিয়ে কি করবি- জমিটা স্কুলেই যাক। মার কথায় আমরা ভাইবোনরা বাড়ির সামনে ভালো জমিগুলো স্কুলেই দিয়ে দিলাম। সেই স্কুল আজ আমার মায়ের মতো শত শত মা তৈরি করছে। ২০১৪ সালের জুন মাসে আমি আমার গ্রামে গিয়ে একটু জরিপ করে দেখেছি- মা-ই ঠিক বলেছেন। যে গ্রামে একজন মানুষ পায়ে জুতা দিত না, একজন দাঁত ব্রাশ করত না বা একটি পাকা ল্যাট্রিন ছিল না বা কারো বাড়িতে যেখানে বসার একটি চেয়ার ছিল না সেই গ্রামে খালি পায়ের একটি শিশু দেখিনি এবং এমন কোনো বাড়ি পাইনি যেখানে পিঁড়িতে বসতে হয়েছে। মায়ের নামের স্কুলের মেয়েরা পুরো গ্রামটাকে বদলে দিয়েছে। আমার মা আমাকে, আমার গ্রামকে, আমার মাটিকে, আমার দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাাসতে শিখিয়েছেন। তিনি আমাকে তার মুখের ভাষাকে ভালোবাসতে শিখিয়েছেন। তিনি নিজের হাতে যুবক ছেলেটাকে মুক্তিযুদ্ধে পাঠিয়েছেন। দিন-রাত কেঁদেছেন, রোজা রেখেছেন ছেলে ও তার সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধারা যেন ভালো থাকে। আমার মা-ই ১৯৭২ সালে দেশদ্রোহীদের চরম শাস্তি দেয়ার ঠিকানাটা দিয়েছেন।

মা তোমাকে অনেক মনে পড়ে। তোমার জন্য আমার মূর্খ গ্রামের মেয়েরা এখন স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ওরাই এখন তোমার মুখ। আমি জানি না, মা তুমি সেই গ্রামে না গেলে ওদের কি হতো। আসুন আমরা সবাই নিজেদের মার সঙ্গে আমার মার সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলো মেলাই। বস্তুত বাংলাদেশের সব সন্তানের শিক্ষার প্রধান স্থপতি মায়েরা। একটু চোখ মেলে তাকালে দেখবেন এখনকার মায়েরা আমাদের মায়ের চাইতে আরো বেশি যতœবান। রোদে পুড়ে-বৃষ্টিতে ভিজে সন্তানের হাত ধরে কেবল যে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালন করেন তাতো নয়, নিজের কর্মজীবন ও সংসার গুছিয়ে সন্তানের সব চাহিদা পূরণে তাদের কোনো তুলনা নেই। আমাদের জন্য এটি আরো একটি বড় অর্জন যে দেশের মোট শিক্ষার্থীর শতকরা ৫৩ ভাগ মেয়ে। মেয়েকে রান্নাঘরে না পাঠিয়ে মায়েরা তাদের জীবন গড়ে তুলছেন। বাঙালি মায়ের এই অসাধারণত্ব নতুন কিছু নয়। সবাই আমার মায়ের চাইতে অনেক বেশি সচেতন। তবে খুব সাম্প্রতিককালে যেসব ঘটনা ঘটেছে তাতে মনে হচ্ছে সন্তানের সঙ্গে মায়ের (বাবার তো বটেই) দূরত্ব অনেকটাই বেড়েছে। দেশের মধ্যবিত্ত শ্রেণির মাঝে ইংরেজি শিক্ষায় শিক্ষিত করার এক ধরনের হুজুগ তৈরি হওয়ার ফলে মায়েদের কাছ থেকে শিশুরা শৈশবের শিক্ষাটাও পায় না। আমি ঠিক জানি না মায়েরা কি উচ্চাভিলাষী হয়ে উঠছেন কিনা। তা না হলে মায়ের কাছ থেকে মাতৃভাষা শেখার কথা, মাতভূমির প্রতি দরদ জন্ম নেওয়ার কথা। মায়ের কাছেই ধর্ম শেখার কথা- ধর্মনিরপেক্ষতা শেখার কথা। বাঙালি হওয়ার কথা। বাংলার সংস্কৃতিতে যুক্ত হওয়ার কথা। আমার বাবা নামাজ পড়ে বাউল গান শুনতে শুনতে ঘুমাতেন। মা-ই আমাকে বোঝাতেন বাঙালি তার নিজের মতো করে জীবনযাপন করে। প্রথমে মানুষ হবে, বাঙালি হবে, এর পাশাপাশি ধর্মকর্ম করবে। মিথ্যা না বলা মার কাছে শিখেছি। অন্যায় না করা মার কাছে শিখেছি। আমাদের নতুন প্রজন্মের মায়েরা কি আমাদের মায়ের মতো নন? খুব স্বাভাবিক নিয়মেই একই সঙ্গে মায়ের প্রতি প্রবল ভালোবাসা জন্ম নেওয়ার কথা। এখনকার মায়েরা কি এই শিক্ষাগুলো দিতে পারছেন না? আমার তো মনে আছে। সকালে ঘুম থেকে তুলে মা মক্তবে পাঠাতেন। মক্তব থেকে আসার পর গোসল করিয়ে ভাত খাইয়ে স্কুলে পাঠাতেন। মা-ই তো ভিন্ন ধর্মের মানুষের মা হয়ে আমাকে তাদের ভাই বানিয়ে দিয়েছিলেন। মাকেই দেখেছি একাত্তর সালে হাজার হাজার হিন্দু বাড়ি রক্ষা করার কড়া নির্দেশ দিয়েছিলেন। এখনকার মায়েরা কি নীতি-নৈতিকতা তাদের সন্তানদের শেখান না?

এটি কি এমন যে সন্তানরা অনেক বেশি প্রযুক্তিনির্ভর হতে হতে মায়ের কোল হারাতে বসেছে? এটি কি এমন যে মায়েরা প্রযুক্তি প্রতিবন্ধী এবং মায়েরা তাদের পাশে বসতেও পারছেন না। স্মার্ট ফোন, ইন্টারনেট, ম্যাসেঞ্জার, স্কাইপে প্রযুক্তি মাদের সন্তানের ওপর প্রভাব বিস্তারের পথে প্রতিবন্ধকতা হয়ে দাঁড়িয়েছে? এমনকি যে মায়েরা নিজেরাই তাদের অবস্থান বদলেছেন? আমি আমার মাকে এক প্যাঁচ শাড়ি পরে খালি গায়ে গোবরের চট লেপতে দেখেছি। গ্রামের কোনো মানুষ তো তাকে অশ্লীলতা বলেনি। কেন এখনকার মায়েদের শ্লীলতার জন্য হিজাব আর বোরকার আড়ালে আমাদের বাঙালিত্ব লুকাতে হচ্ছে। কেন মায়ের কপালে টিপ বা পায়ে আলতাটা দেখি না। আমিতো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়ও আমাদের সব সহপাঠিনীকে পায়ে আলতা দিতে দেখতাম। কপালে টিপ না থাকলে তো মেয়েই মনে হতো না। সেসব কেন হারিয়ে গেল। আমাদের সময়ে যে মেয়ে গান জানত বা নাচতে পারত তাকে বেশি সম্মান দিতাম। সেসব কেন এখন নেই? মায়েরা নিজের হাতে সন্তানদের সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠানে পাঠাতেন। এখনকার মেয়েরা সেটি কি করেন না? আমার বাবাকে দেখতাম মসজিদে নামাজ পড়ে আলিমুদ্দিন ফকিরকে একতারা নিয়ে বাবাকে বাউল গান শোনাতে। মা আলিমুদ্দিনকে যতœ করে খেতে দিতেন। নিজেও শুনতেন সেই গান। আজকের মায়েরা কি রবীন্দ্রসঙ্গীত, নজরুল গীতি বা আধুুনিক গান বা মমতাজের গান শোনা বন্ধ করে দিয়েছেন? তাদের সন্তানরা কোন গান শোনে বা কার বই পড়ে তার খবর কি তারা রাখেন? তারা কি খবর রাখেন, তাদের সন্তানরা রবীন্দ্রনাথ, নজরুল বা শরৎ পড়ার পাশাপাশি হুমায়ূন, শামসুর রাহমান বা নির্মলেন্দু গুণকে পাঠ করে কিনা?

আমি জানি না এখনকার মায়েরা অসহায় কিনা। তবে এটি বুঝি নতুন প্রজন্ম যেভাবে ক্ষয়িষ্ণু পথে চলতে শুরু করেছে সেই পথ থেকে পুরো জাতিকে ফিরিয়ে আনতে পারেন কেবল বাংলার মায়েরাই। আমি অনেক বেশি আশাবাদী যে, সেই মায়েরা এখন আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত। আমি এই মায়েদের উঠে দাঁড়ানোর আহ্বান জানাই। মায়েরা আপনারাই আপনাদের সন্তানকে জানাতে পারেন কেন আমরা পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ তৈরি করেছি। আমরা যে একটি ধর্মভিত্তিক জাতি নই, আমরা যে আউল-বাাউল ফকির-আউলিয়া-দরবেশের দেশ এবং সেখানে যে বৈষ্ণববাদ আর সুফিজম বিস্তৃত হয়েছে। আমরা যে সবার ওপরে মানুষ সত্য সেই বাণীটি অন্তরে গেঁথে রাখি সেটি মাকেই তার সন্তানের কানে দিতে হবে। এই সময়ে আমি আমার মাকে মিস করছি না এ জন্য যে, আমাদের মায়েরা আমার সেই মায়ের অভাবটাকে পূরণ করে দেবেন, এই আশাটি আমার রয়েছে।

মোস্তাফা জব্বার : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট।