অপার সম্ভাবনার ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ

সম্প্রতি বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত খবর অনুযায়ী ‘ভবিষ্যতের ১০ উঠতি বাজারের একটি হবে বাংলাদেশ’। এই খবরটি নিঃসন্দেহে হতাশার মাঝে এক ঝলক আশার আলো দেখানোর মতোই আনন্দের, খুশি হওয়ার মতোই। কারণ নানা কারণে এখন সর্বত্র হতাশা, উদ্বেগ, আতঙ্ক এবং বাতাসে কেমন যেন একটা ষড়যন্ত্রের গন্ধ ভেসে আসছে। এমনি অবস্থায় ভবিষ্যতের বিশ্বের ১০ উঠতি বাজারের মধ্যে বাংলাদেশ এর একটি হিসেবে স্থান করে নেবে এর চেয়ে আর আশা জাগানিয়া ভালো খবর কি হতে পারে এ মুহূর্তে। এই খবরে এটিও আমাদের জানান দিচ্ছে, বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে নতুন এক সম্ভাবনা এবং উদীয়মান অর্থনীতির তথা ব্যর্থ অর্থনীতির দেশ হিসেবে অবস্থান করে নেবে।অবশ্য এ জন্য প্রথমমত: দরকার বিদ্যমান রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, সরকার পরিচালনা ও উন্নয়নের ধারাবাহিকতা। পাশাপাশি সরকারের পক্ষ থেকে দেশি-বিদেশি বিনোয়গকারীদের মধ্যে আস্থা আর বিশ্বাস স্থাপন করা। একই সঙ্গে প্রশাসনকে জনমুখী এবং প্রকৃত সেবাধর্মী এবং আমলাতান্ত্রিক মানসিকতা পরিহার করা। আমরা আশাবাদী, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিরন্তর সংগ্রাম চালিয়ে আসছেন বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে একটি মর্যাদাপূর্ণ রাষ্ট্র ও জাতিকে সম্মানের আসনে দাঁড় করাবার জন্য। ১৯৭১ সালে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশে স্বাধীনতা অর্জিত হয়েছে আর এখন তারই সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার সুযোগ্য ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বে ইনশাআল্লাহ দেশ উন্নত সমৃদ্ধ দেশ এবং বাঙালি জাতি বিশ্বের দরবারে মাথাউঁচু করে দাঁড়াবেই। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়। তার ঘোষিত ‘ভিশন-২০২১’ এর পরিপূর্ণ বাস্তবায়নের মধ্য দিয়েই আমাদের সেই প্রত্যাশিত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা হবে। এটাও নিশ্চিত করে বলার সময় এসেছে যে, আমাদের শ্রমিকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এখন চাকরি তথা কাজ করতে যাচ্ছে। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কাজ করতে আসবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিদেশিরা। অবশ্য এখনও দেশের কিছু কিছু প্রতিষ্ঠানে বিদেশিরা সীমিতসংখ্যক চাকরি করছেন।যাক বলছিলাম, এই দুঃসময়ের মধ্যেও এই ভালো খবরটি দিয়েছে আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান বিএমআই রিসার্চ। প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশসহ ১০টি দেশের নাম উল্লেখ করে বলেছে, আগামী ১০ বছরে মধ্যে এই দেশগুলো হবে বিশ্বের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, অগ্রগতি আর সম্ভাবনার নতুন চালিকাশক্তি। এই সম্ভাবনার তালিকায় থাকা বাদবাকি ৯ দেশ হচ্ছে যথাক্রমে মিসর, ইথিওপিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, মায়ানমার, নাইজেরিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইনস ও ভিয়েতনাম। কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলের লোককবি ও গবেষক ইবনে সালেহ মুনতাসিরের ‘স্বপ্ন হবে সত্য বাংলাদেশ হবে মর্ত্য’ শীর্ষক লিরিকটি প্রাসঙ্গিক বলে প্রতীয়মান হয়েছে। তিনি লিখেছেন, ‘দিবালোকের মতো সত্য বাংলাদেশ হবে মর্ত্য/উচ্চ আয়ের দেশ বাংলাদেশ হবে শেষমেশ/উন্নয়ন সম্ভাবনার দেশ সবার প্রিয় বাংলাদেশ/স্বপ্ন সম্ভাবনার দেশ আমাদের প্রিয় স্বদেশ স্বপ্ন হবে সত্যি সুশাসন থাকে যদি/সঞ্চয় যদি বাড়ে বিনিয়োগ তবে কাঁড়ে/বিনিয়োগ যদি বাড়ে কর্মসংস্থান তবে ছাড়ে/সুশাসন যদি আসে অর্থনীতি তবে ভাসে উদ্যোক্তা হবে তৈরি পরিবেশ হলে না বৈরী/শিল্প হবে জলদি সব দাও একত্রে চটজলদি/ বিদেশি বিনিয়োগ কেন দেশি বিনিয়োগ যেন/স্বপ্নের মতো সত্য বাংলাদেশ হবে মর্ত্য ইবনে সালেহ মুনতাসির বলেন_ দক্ষতার নেই অভাব আছে সক্ষমতার ভাব/পরিকল্পনার আছে অভাব চটজলদি স্বপ্ন আবির্ভাব/সময় এখন খুবই হাই চটজলদি বিনোয়োগ চাই/স্বপ্ন হবে আমাদেও সত্য বাংলাদেশ হবে মর্ত্য ‘ আবার আসা যাক- বিএমআই রিসার্চ মনে করছে, ২০২৫ সালের মধ্যে এই ১০টি দেশ সম্মিলিতভাবে বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ৪ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার (এক লাখ কোটিতে এক ট্রিলিয়ন) যোগ করবে, যা দেশি বেদেশি ব্যবসায়ি ও বড় বড় বিনিয়োগকারীদের জন্য বড় সুযোগ এনে দেবে। কেননা এই অর্থ জাপানের বর্তমান অর্থনীতির সমান। ফিচ রেটিংস বিশ্বের সবচেয়ে বড় তিন ঋণমান কোম্পানির একটি। নিউইয়র্কভিত্তিক এই কোম্পানির সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিএমআই রিসার্চ। তারা ২০০টি দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও ঝুঁকি এবং ২০ ধরনের শিল্প নিয়ে নিয়মিত গবেষণা করে থাকে। সম্প্রতি বিএমআই রিসার্চ ‘টেন ইমারজিং মার্কেট অব দ্য ফিউচার’ নামের এই রিপোর্ট প্রকাশ করেছে।গুলশানে হলি আর্টিজান বেকারিতে দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জঙ্গি হামলা এবং কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় দেশের সর্ববৃহৎ ঈদ জামাতের এক কিলোমিটারের মধ্যে জঙ্গি হামলার পর বিএমআই রিসার্চ রিপোর্টটি প্রকাশ করেছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি গত মে মাস থেকে এ নিয়ে কাজ করছিল, ফলে এখানে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে রাজনৈতিক সংঘাতের কথা থাকলেও জঙ্গি হামলা নিয়ে কিছু বলা নেই। যদিও পরপর দুটি হামলার ঘটনার প্রভাব নিয়ে অর্থনীতিবিদ ও উদ্যোক্তাদের মধ্যে বাংলাদেশের সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সন্ত্রাসবাদ একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এর ছোঁয়া বাংলাদেশেও লেগেছে। সামপ্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি এমন ঘটনা ঘটেছে। সেসব ঘটনাকে পেশাদারি মনোভাব নিয়ে মোকাবিলা করতে হবে। তা না হলে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতেই থাকবে। এতে বাংলাদেশের যে সম্ভাবনা আছে, তা নষ্ট হবে।বিএমআই রিসার্চ তাদের প্রতিবেদনে বলছে, সাধারণভাবে উৎপাদন খাত ও নির্মাণ খাত, কৃষি অর্থনীতিকে এগিয়ে নিচ্ছে ক্রমাগত উন্নয়ন ও অগ্রগতির পথে। অর্থনীতির এই বিকাশমান ও বহমান স্রোতধারা সমান গতিতে এগুতে থাকলে মনে করা হচ্ছে, উৎপাদন ও বিনিয়োগ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ভবিষ্যৎ কেন্দ্রস্থল হবে যাচ্ছে বাংলাদেশ। একই ধারা বজায় থাকলে পার্শ্ববর্তী দেশ মায়ানমার ও পাকিস্তানেও এই সুযোগ আসবে। পাশাপাশি এই তিনটি দেশেই রপ্তানি খাতে শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি হবে বলে মনে করা হচ্ছে। এর কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, চীনে শ্রম মজুরি বেড়ে যাওয়ায় এই তিন দেশের এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা করার ক্ষমতা বেড়েছে। এ ছাড়া অবকাঠামোর দ্রুত উন্নতি ঘটায় এই দেশগুলোর প্রতি বেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে টেঙ্টাইল, ওষুধ শিল্প ও গাড়িশিল্পে আগ্রহ বেশি থাকবে।বিএমআই রিসার্চ আরও বলছে, ওই দশটি দেশেই উৎপাদন খাত ছাড়া নির্মাণ খাতও আরও বিকশিত হবে। এর দুটি কারণ রয়েছে। যেমন দেশগুলোতে দ্রুত নগরায়ণ ঘটছে এবং উৎপাদন খাতের উন্নয়নকে সহায়তা দিতেও নির্মাণ খাতের দ্রুত প্রসার ঘটবে। আবার সেবা খাতও ১০টি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে আর্থিক খাত ও খুচরা বিক্রির ক্ষেত্রে অগ্রগতি বেশি হবে।বিএমআই রিসার্চ ১০টি দেশ নিয়ে আলাদা আলাদা মন্তব্যও করেছে। বাংলাদেশ নিয়ে সেখানে বলা হয়েছে, দেশটির রপ্তানি নির্ভর উৎপাদন খাতের অংশ ইতোমধ্যেই মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৫ শতাংশকে ছাড়িয়ে গেছে। বড় ধরনের রাজনৈতিক সংঘাত বাংলাদেশের অর্থনীতিকে পঙ্গু এবং সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটালেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ৯ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। দেশটির শ্রম মজুরি প্রতিযোগিতামুখী, শ্রমিকরা দক্ষ এবং শ্রমশক্তির পরিমাণও অনেক বেশি, যা শ্রমঘননির্ভর শিল্প উৎপাদন খাত, বিশেষ করে পোশাক খাতের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি দেশটি অবকাঠামো উন্নয়নেও মনোযোগ দিয়েছে।বিএমআই রিসার্চের রিপোর্টে বক্তব্য নিয়ে বিশ্বব্যাংকের অর্থনীতিবিদ ড. কাজী খলীকুজ্জমান আহমেদের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, উন্নয়ন ও বাজার-সম্ভাবনার দিক থেকে একবিংশ শতাব্দী হবে এশিয়ার। আর বাংলাদেশ হবে এর অন্যতম লক্ষ্যস্থল। তিনি বলেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো একটি পর্যায় পর্যন্ত উন্নতি করে ফেলেছে। আর এশিয়ার বাজার বলতে এখন দক্ষিণ এশিয়া। দক্ষিণ এশিয়ার বড় বাজার মানেই ভারত ও বাংলাদেশ। সুতরাং বাজার-সম্ভাবনার দশটি দেশের তালিকায় বাংলাদেশ থাকা অবাস্তব নয়। বরং এটি এখন দিবালোকের মতো ও উদীয়মান সূর্যের মতোই সত্য।আমাদের প্রত্যাশা থাকবে প্রশধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সুদৃঢ় নেতৃত্বে সম্ভাবনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে যে যেই অবস্থানে আছি সেখানে থেকে তথা নিজ নিজ অবস্থান থেকে নিরবচ্ছিন্ন ভাবে কাজ করে যাওয়া। তবে ২০২১ সালের মধ্যেই উন্নতসমৃদ্ধ বাংলাদেশ উপহার পাবো আমরা। এমন প্রত্যাশা দেশের আপামর সকলের।[লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট]motaherbd@gmail.com