অন্ধকার দূরীকরণে আসুন রুখে দাঁড়াই

জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ এখন আর বাংলাদেশের একক কোনো সমস্যা নয় বরং এটি এখন অন্যতম একটি বৈশ্বিক সমস্যা। সম্প্রতি বাংলাদেশসহ বিশ্বের কয়েকটি দেশে পরপর মর্মন্তুদ যেসব ঘটনা ঘটেছে সেসব বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে, এখন আর শুধু দরিদ্র কিংবা মাদরাসা পড়–য়া ছাত্ররাই জঙ্গিবাদে-উগ্রবাদে যুক্ত হচ্ছে না বরং মেধাবীদের বেছে বেছে মগজ ধোলাই করে সভ্যতা-মানবতা এবং সর্বোপরি ধর্মবিরোধী এমন অপকাণ্ডে যুক্ত করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে সম্প্রতি যে দৃষ্টান্ত মিলেছে তা রীতিমতো বিস্ময়কর, উদ্বেগজনক যুগপৎ প্রশ্নবোধক। আমাদের সরকার জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ দমনে অধিকতর সক্রিয় এবং আইশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীগুলো ব্যাপকভাবে তৎপর। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হলো, এর মধ্যেও বিপথগামীরা বসে নেই! তারা তাদের অপকর্মের ছক কষে চলেছে এবং প্রায় নিত্য এর প্রমাণও মিলছে। ১৯ জুলাই ২০১৬ তারিখে মানবকণ্ঠসহ পত্রিকান্তরে প্রকাশ, তিন জেলার চার পুরোহিত হত্যার হুমকি দিয়েছে জঙ্গি-উগ্রবাদীরা।
পত্রিকান্তরে আরো প্রকাশ, নিখোঁজের সংখ্যা ক্রম বাড়ছে এবং এদের সিংহভাগই বিত্তবানের সন্তান। ১৯ জুলাই ২০১৬ তারিখে পত্রিকান্তরে প্রকাশ, একজন চিকিৎসক সপরিবারে দেশ ত্যাগ করেছেন জঙ্গি কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত হতে! তার বক্তব্য পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। ইতোমধ্যে নিখোঁজরা কোথায় আছে কিংবা কোথায় গেছে এরও কোনো স্পষ্ট দিকচিহ্ন পাওয়া যাচ্ছে না। প্রশ্ন উঠেছে নিখোঁজরা কোথায় যায়? এখন আরো প্রশ্ন হচ্ছে, প্রকৃত নিখোঁজের সংখ্যা কত এবং এরা কোথায় কোন অপকাণ্ডের ছক কষছে? সম্প্রতি সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ দমনে চ্যালেঞ্জ নিয়ে যেভাবে কাজ করছেন তা প্রশংসাযোগ্য। এরই ধারাবাহিকতায় বগুড়ার দুর্গম চরাঞ্চলে র‌্যাব-বিজিবি-পুলিশের যৌথ অভিযান চালানো হয় দীর্ঘ সময়ব্যাপী এবং ওই অভিযানে উদ্ধার হয়েছে কিছু উপকরণ যেগুলো জঙ্গি কার্যক্রমের সাক্ষ্য বহন করছে।
নিকট অতীতে ঢাকার গুলশানের একটি রেস্তোরাঁয় এবং শোলাকিয়া ঈদের জামাতে যে বর্বরোচিত পৈশাচিক ঘটনা ঘটিয়েছে জঙ্গি-উগ্রবাদী মানুষ নামধারী দানবরা তা খুব মর্মন্তুদ এবং একই সঙ্গে প্রশ্নেরও। প্রশ্ন হলো কোন পথে চলেছে এ দেশের তারুণ্যের একাংশ? তাদের অভিভাবকরা কি তাদের এসব গুণধর(?) সন্তানদের সম্পর্কে কিছুই জানতেন না? তাদের সন্তানদের রহস্যজনক গতিবিধি তাদের চোখে পড়েনি? এসব অভিভাবকের মধ্যে অনেকের অবস্থানই সমাজের উঁচু স্তরে! এর মধ্যে সাবেক সচিবও আছেন। তারা তাদের সন্তানদের গতিবিধি লক্ষ্য করবেন না, কিছু জানবেন না তাদের কর্মকাণ্ড সম্পর্কে তা তো হতে পারে না। একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তিনি হোন সরকারি কিংবা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ওই শিক্ষক যখন জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদের মতো ভ্রান্ত পথে তার শিক্ষার্থীকে পরিচালিত অন্ধকার দূরীকরণে আসুন রুখে দাঁড়াইকরতে ভূমিকা রাখেন কিংবা নিজে অপকর্মের ছক কষেন তখন তো বিষয়টিকে অন্যভাবে বিবেচনা-বিশ্লেষণ করতেই হয়। একজন চিকিৎসক, একজন প্রকৌশলী কিংবা প্রতিক্রিয়াশীল লেখাপড়া জানা সচেতন যে কোনো লেখক যখন এমন বর্বরতার-পৈশাচিকতার পৃষ্ঠপোষক কিংবা হোতা হন তখন বুঝতে হবে সমাজ কতটা ব্যাধিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে।
এমতাবস্থায় প্রশ্ন হচ্ছে, এই ব্যাধির কি কোনো প্রতিকার নেই? অবশ্যই আছে। গণজাগরণই এর অন্যতম দাওয়াই। বৈশ্বিক এই সমস্যা মোকাবিলায় সরকারের পাশে প্রগতিবাদী সচেতন জনগোষ্ঠীকে দাঁড়াতে হবে। জাতীয় ঐকমত্য গড়তে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। তবে এই জাতীয় ঐক্যে স্বাধীনতা-মুক্তিযুদ্ধ-বাঙালি সংস্কৃতি ও জাতীয়তাবাদের শত্রুদের কোনো স্থান দেয়া যাবে না। স্থান দেয়া যাবে না স্ববিরোধী রাজনৈতিক নেতাদেরও। এও মনে রাখা প্রয়োজন বলে মনে করি যে, সমস্যাটি যেহেতু রাজনৈতিক এর মোকাবিলাও করতে হবে রাজনৈতিকভাবেই। আমাদের স্মরণে আছে বিগত বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের শাসনামলে জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদসহ নানা ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের উত্থানের অধ্যায়ের কথা। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার কিংবা বিগত মহোজাট ও বর্তমান সরকার জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ-সন্ত্রাস মোকাবিলায় সফলতার স্বাক্ষর রাখলেও হঠাৎ করে এই আগুন দেশে আবার জ্বলে ওঠার পেছনে আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হবে আরো দৃঢ় অবস্থান নিয়ে। মৌলবাদী-প্রতিক্রিয়াশীল-ধর্মের ধ্বজাধারী অপশক্তিকে তোষণ করে বশে আনা যাবে না, সুপথে আনা যাবে না। তোষণের রাজনীতি পরিত্যাগ করতে হবে। ভোটের রাজনীতি ত্যাগ করে মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ ও চেতনা শাণিতকরণের অতি গুরুত্বপূর্ণ কাজটি করতে হবে সব কিছুর ঊর্ধ্বে প্রাধান্য দিয়ে।
বাংলাদেশের মানুষ ধার্মিক কিন্তু ধর্মান্ধ নন এই সত্যের প্রমাণ ইতোমধ্যে বহুবার মিলেছে। ধর্মের নামে কোনো ধরনের অপকর্মে তারা অতীতেও সায় দেননি, ভবিষ্যতেও দেবেন না। আর যে দেশের মুক্তিযুদ্ধের মতো মহান গৌরবোজ্জ্বল অতীত অনেক অধ্যায় রয়েছে সে দেশে জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদ-ধর্মান্ধতা-প্রতিক্রিয়াশীলতা কোনোভাবেই শিকড় গাড়তে পারে না। আমরা যারা প্রগতির কথা বলি, প্রগতির পথে চলি তাদের অনেকেই ইতোমধ্যে অনেক ভুল করেছেন। সেসব ভুলের আশু সংশোধন জরুরি। আগে হিসাব কষতে হবে আমার সংস্কৃতির-ঐতিহ্যের-বাঙালিত্বের এবং প্রগতির। হিসাবটা স্বার্থবাদী রাজনীতির ছকে কষলে চলবে না তবে রাজনৈতিকভাবে এর মোকাবিলার পথটা প্রশস্ত করতে হবে। প্রশ্ন হচ্ছে কোন রাজনীতি? অবশ্যই সেই রাজনীতির মাধ্যমে পথটা প্রশস্ত করতে হবে যে রাজনীতি অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক, উদার এবং সর্বাগ্রে বাঙালিত্বের ধারায় পুষ্ট। প্রতিক্রিয়াশীলতা-ধর্মান্ধতা-ধর্মের অপব্যাখা এসব বর্জনের মাধ্যমে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগটা করতে হবে জোরদার। এসব ব্যাপারে ইতোমধ্যে কথা হয়েছে বিস্তর কিন্তু দুঃখজন হলেও সত্য কাজের কাজ তেমনটা হয়নি। জঙ্গিবাদ-উগ্রবাদের অপছায়ার আর বিস্তৃতি ঘটতে দেয়া যাবে না। আসুন আমরা এক কাতারে দাঁড়াই। রুখে দিই সব হিংস্রতা। অন্ধকার দূর করতে এগিয়ে যাই। একাত্তরে যে জাতি একটি প্রশিক্ষিত-সমরাস্ত্রে সুসজ্জিত বাহিনীসহ বিশ্বের অন্যান্য মদতদানকারী শক্তিকে পরাস্ত করে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয় ঘটিয়েছে সেই জাতি কি স্বাধীন দেশে পরাজিত হতে পারে? না, কখনোই না। এই দৃঢ়তাই আমাদের মূল শক্তি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার উগ্রবাদ-জঙ্গিবাদ-সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতির কথা দেশবাসী ও বিশ্ববাসীকে স্পষ্টভাবে জানিয়ে আসছেন। একজন সর্বহারা প্রধানমন্ত্রীর পক্ষেই সম্ভব আমাদের জন্য শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করা। শেখ হাসিনা যদি না পারেন তবে আর কেউ পারবেন না আমাদের কাক্সিক্ষত সোনার বাংলা গড়তে। নিশ্চয়ই এসব কোনো স্তুতিবাক্য নয়। নয় কোনো স্তাবকতা। এসবই হলো বাস্তবতা। নিশ্চয়ই এমন বাস্তবতা সচেতন কেউই অস্বীকার করতে পারবেন না কিংবা পারা সম্ভবও নয়।
লেখক: শিক্ষাবিদ ও সমাজ বিশ্লেষক