অপূর্ণাঙ্গ শিশুটি সুস্থ হয়ে এখন মায়ের কোলে

মায়ের কোলে মোহাম্মদ আলীকে তুলে দিচ্ছেন বিএসএমএমইউয়ের উপাচার্যমোহাম্মদ আলী এখন পুরোপুরি সুস্থ। মায়ের কোলে সাড়ে চার মাসের শিশুটি আপন মনে হাত-পা নাড়ছিল। তা দেখে মা-বাবার মুখে হাসি। চিকিৎসকের চেহারায় স্বস্তি। অপূর্ণাঙ্গ যমজ হিসেবে জন্ম নিয়েছিল মোহাম্মদ আলী। জটিল অস্ত্রোপচার শেষে এক মাস পর তাকে মায়ের কোলে তুলে দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) চিকিৎসকেরা।

আজ বুধবার সকাল সাড়ে ১০টায় বিএসএমএমইউয়ে​র ডা. মিল্টন হলে এক সংবাদ সম্মেলনে চিকিৎসকেরা জানান, মোহাম্মদ আলী এখন পুরোটাই সুস্থ।
এ সময় বিএসএমএমইউয়ের উপাচার্য অধ্যাপক কামরুল হাসান খান সুস্থ মোহাম্মদ আলীকে মায়ের কোলে তুলে দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য আজ একটি বিশেষ দিন। আমরা নতুন মোহাম্মদ আলীকে মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পেরে আনন্দিত। দেশে যে এ ধরনের চিকিৎসাসেবার সুযোগ রয়েছে, তা সব মানুষের জানা নেই। যেকোনো অস্ত্রোপচারে আমাদের আশঙ্কা থাকে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় মোহাম্মদ আলীর মতো জন্ম নেওয়া শিশুকে “কনজেনিটাল প্যারাসাইটিক টুইন” বা জোড়া অপূর্ণাঙ্গ যমজ বলা হয়। তার অস্ত্রোপচারে আশঙ্কা একটু বেশি ছিল। তবে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়েছে।’
বাগেরহাটের দিনমজুর মো. জাকারিয়ার স্ত্রী হীরামনি গত ৭ মার্চ জোড়া লাগানো যমজ সন্তানের জন্ম দেন। বাগেরহাটের রামপাল থানার শোলাকুড়া গ্রামের বাড়িতে হীরামনি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় শিশুটির জন্ম দেন। শিশুটি ওই দম্পতির চতুর্থ সন্তান। তাঁদের আট, তিন ও এক বছর বয়সী তিন মেয়ে রয়েছে।
মোহাম্মদ আলীর মা হীরামনি প্রথম আলোকে বলেন, জন্মের পর সন্তানের এমন অস্বাভাবিক অবস্থা দেখে সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসকেরা ঢাকায় নিয়ে আসার পরামর্শ দেন। তিন দিন বয়সী সন্তানকে নিয়ে তারা গত ১০ মার্চ ঢাকায় চলে আসেন। দুটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যান। কিন্তু সেখানে কোনো আশার দেখা যায়নি। পরে বিএসএমএমইউতে চিকিৎসার জন্য আসেন। বেশ কয়েকবার পরীক্ষার পর গত ২০ জুন মোহাম্মদ আলীর অস্ত্রোপচার হয়।
অপূর্ণাঙ্গ যমজের সফল অস্ত্রোপচার

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিএসএমএমইউতে ১৮ সদস্যের চিকিৎসক দল অপূর্ণাঙ্গ যমজ শিশু মোহাম্মদ আলীর অস্ত্রোপচার করে। এতে নেতৃত্ব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিশু সার্জারি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন। পুরো অস্ত্রোপচারটি হাসপাতালে সরাসরি সম্প্রচার করা হয়। অস্ত্রোপচারকক্ষের বাইরে বসে তা দেখেন শিশুটির মা-বাবা। সরাসরি সম্প্রচারিত অস্ত্রোপচারটি গণমাধ্যমকর্মী, রোগীর স্বজন ও দর্শনার্থীরাও দেখার সুযোগ পান। শিশুটির চিকিৎসার ব্যয়ভার বহন করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
মায়ের কোলে মোহাম্মদ আলীমোহাম্মদ আলীর অস্ত্রোপচারে নেতৃত্ব দেওয়া অধ্যাপক মো. রুহুল আমিন সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘সাম্প্রতিক সময়ে জোড়া লাগানো শিশুর সংখ্যা আমরা বেশি দেখতে পাচ্ছি। আগেও এ ধরনের শিশুরা জন্ম নিত। জন্মের পরই ওই শিশুরা মারা যেত বা মা-বাবা এদের লুকিয়ে রাখতেন। সমাজ তাদের “ডাইনি” বলে ডাকত। এ ধরনের জোড়া লাগানো শিশুদের খোঁজ পেলে আমরা অস্ত্রোপচার করতে প্রস্তুত।’ তিনি আরও বলেন, মোহাম্মদ আলীর ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচারে জটিলতা ছিল। সেসব কাটিয়ে ওঠার পর অস্ত্রোপচার সফল হয়েছে।
সন্তানকে কোলে নিয়ে আনন্দে ভাসছিলেন মা হীরামনি। তিনি বলেন, ‘আমি আমার ছেলেকে কোলে নিতে পেরে আনন্দিত। আমি ভাবিনি, আমার সন্তান আমার কোলে ফিরে আসবে।’ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন। ও যেন আপনাদের মতো বড় হয়।’