অলিম্পিকে দুই বন্ধুর স্বপ্নযাত্রা

রাত ১২টার কাছাকাছি হঠাৎই বেজে উঠল ফোন। চেনা নম্বরের ওপাশ থেকে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশনের এক কর্মকর্তা সুসংবাদটি দিলেন এভাবে_ ‘অলিম্পিকে যাচ্ছো তুমি।’ এটা স্বপ্ন, নাকি বাস্তব। ঘুমের ঘোরে থাকা শিরিন আক্তার এই ভাবনায়। যেন বিশ্বাসই হচ্ছিল না। একটু পরই ঢুকলেন ইন্টারনেটে, দেখলেন ওয়াইল্ড কার্ডের সৌজন্যে অনেক দিনের বন্ধু মেজবাহ আহমেদ ও তিনি অলিম্পিকে যাচ্ছেন। স্বপ্নপূরণের আনন্দটা সঙ্গে সঙ্গে ভাগ করতেও দেরি করেননি, টেলিফোনে জানিয়ে দেন বাংলাদেশের দ্রুততম মানব মেজবাহকে। স্বপ্নপূরণের আনন্দে তখন উদ্বেলিত। অবশেষে অলিম্পিকে খেলার স্বপ্নপূরণ, সোমবারের রাতটি আর ঘুমাতে পারেননি বাংলাদেশের দ্রুততম মানব মেজবাহ ও দ্রুততম মানবী শিরিন। গতকাল নিজেদের উচ্ছ্বাসের কথা এভাবেই বর্ণনা করেছেন তারা। ৫ আগস্ট রিওতে শুরু হবে বিশ্ব ক্রীড়া মহাযজ্ঞের সবচেয়ে বড় আসর। ১ আগস্ট সাঁতার দলের সঙ্গে যাবেন অ্যাথলেট মেজবাহ ও শিরিন। সব মিলিয়ে বাংলাদেশ থেকে রিও গেমসে অংশ নিচ্ছেন সাত অ্যাথলেট। এর মধ্যে একমাত্র গলফার সিদ্দিকুর রহমানই যাচ্ছেন সরাসরি অলিম্পিকে, বাকিরা ওয়াইল্ড কার্ডে।

১৫ জুলাই ছিল দুই অ্যাথলেট মেজবাহ ও শিরিনের জন্য ছিল ওয়াইল্ড কার্ড পাওয়ার শেষ সময়। কিন্তু ওই রাতেও আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি (আইওসি) থেকে কোনো মেইল আসেনি। এরপর দু’দিন পার হয়ে যাওয়ায় অ্যাথলেটিকস থেকে মেজবাহ-শিরিনের যাওয়াটা অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। সবাই আশা ছেড়েই দিয়েছিলেন। সৃষ্টি হয় শঙ্কার মেঘ। দ্রুততম মানব মেজবাহ আশা ছাড়লেও শিরিনের বিশ্বাস ছিল; তারা অলিম্পিকে যাবেন। অবশেষে সোমবার রাতে এলো আইওসি থেকে সুসংবাদ। এর পরই যেন স্বপ্নপূরণের আনন্দে ভাসছেন মেজবাহ ও শিরিন। ওয়াইল্ড কার্ডে হোক, অলিম্পিকে যাওয়াটা নিশ্চিত হওয়ার পরই তাদের মোবাইল ইনবক্সে ভরে যায় অভিনন্দনের মেসেজ। টেলিফোনে অনেকেই জানিয়েছেন শুভকামনা। দীর্ঘদিনের স্বপ্নটা পূরণ হওয়ার পর অলিম্পিকে যাওয়ার জন্য তর সইছে না মেজবাহর, ‘অলিম্পিক খেলার স্বপ্ন তো আগে থেকেই ছিল। এই অলিম্পিক টার্গেট করেই তো আমি এতদিন ধরে অনুশীলন করেছি। চারবারের দ্রুততম মানব হওয়ার পরও যদি অলিম্পিকে যেতে না পারি, এটা ভেবে টেনশনে ছিলাম। এখন টেনশন দূর হয়েছে। খুব ভালো লাগছে। আর খুশি এজন্য যে, ফুটবলে ব্রাজিলকে সাপোর্ট করি, সেই ব্রাজিলেই অলিম্পিক খেলতে যাব।’

মেজবাহর রক্তে-মাংসেই অ্যাথলেটিকস। মা শাহিনা বেগম ও মামা মনজুর ছিলেন অ্যাথলেট। তাদের দেখেই এই খেলায় উদ্বুদ্ধ হন বাংলাদেশের এ দ্রুততম মানব। মামা ও মায়ের দুটি স্বপ্ন ছিল মেজবাহকে নিয়ে। সেই স্বপ্নের কথা বলে আনন্দিত মেজবাহ, ‘মামা চাইতেন আমি দ্রুততম মানব হই। আর মা চাইতেন অলিম্পিকে খেলি। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করার পথে।’ স্বপ্ন পূরণ হয়েছে, এবার লক্ষ্যের কথাও জানিয়েছেন দ্রুততম মানব। তবে লক্ষ্যটা যে অনেক বড় নয়, তা অনুমেয়ই, ‘যেভাবে অনুশীলন করছি, চেষ্টা করব ভালো একটা টাইমিং করতে। এর আগে যারা দৌড়াইছে, তাদের চেয়ে যেন ভালো স্কোর করতে পারি, এটাই আমার লক্ষ্য’_ আত্মবিশ্বাসের সুরে বলেন মেজবাহ।

মেজবাহর মতো অলিম্পিকে খেলার স্বপ্নটাও অনেক বছর ধরেই দেখে আসছেন শিরিন আক্তার, ‘যেদিন থেকে অ্যাথলেটিক্সে আসি, সেদিন থেকেই লক্ষ্য ছিল অ্যাথলেটিক্সের শীর্ষে যাওয়া। অ্যাথলেটিক্সের শীর্ষ ইভেন্ট হলো অলিম্পিক। সেই অলিম্পিকে খেলতে যাচ্ছি, এটা আমার জন্য খুব আনন্দের ব্যাপার এবং আমার অনেক দিনের স্বপ্নপূরণ হয়েছে।’ ওয়াইর্ল্ড কার্ড না এলেও বিশ্বাস ছিল দ্রুততম মানবীর, ‘১ তারিখে আমাদের যাওয়ার কথা। ওই তারিখটা পার হলে আমি আশা ছেড়ে দিতাম। তার আগ পর্যন্ত আমার মনের ভেতর একটা বিশ্বাস কাজ করেছিল যে, আল্লাহ হয়তো বা স্বপ্নটা পূরণ করবেন।’ জ্যামাইকান স্প্রিন্টার শেলিয়ান ফ্রেজারকে আইডল মানা শিরিন আক্তারের লক্ষ্যও বন্ধু মেজবাহর মতো আগের টাইমিং ছাড়িয়ে যাওয়া, ‘লক্ষ্য হচ্ছে নিজের পারফরম্যান্সটাকে ব্রেক করা। নিজের টাইমিংয়ের চেয়ে সেরা স্কোর করা। ১১.৯৯ সেকেন্ড থেকে যদি বেশি করি, সেটাই হবে সেরা।’ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামিক ইতিহাস ও সাংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শিরিনের কাছে দেশের প্রতিনিধিত্ব করাটাই বড়, ‘ওয়াইল্ড কার্ডে যাচ্ছি ঠিক আছে, তবে দেশকে প্রতিনিধিত্ব করাটাই আমার কাছে বড় বিষয়। দেশের হয়ে অলিম্পিক গেমসে খেলতে যাচ্ছি, এটা অনেক বড় গর্বের।’