বঙ্গবাজারের দোভাষী

ওস্তাদের কাছ থেকে ভাষার উপর তালিমও নেননি তাদের কেউ। তারপরও তারা অনর্গল বলছেন ইংরেজি, হিন্দি, উর্দু, ফার্সি, চীনাসহ ৮ থেকে দশটি ভাষা। বঙ্গবাজারের দোভাষী হিসাবেই পরিচিত তারা। বিদেশিদের কথাকে বাংলায় অনুবাদ করে তা বাংলায় বলেন দোকানিকে। আবার দোকানির ভাষাকে অনুবাদ করে তা বলেন বিদেশিকে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মার্কেটের সামনে বসে থাকেন তারা। কাপড় কিনতে আসা কোনো বিদেশি এলেই এগিয়ে যান। নিজের নাম পরিচয় দিয়ে গাইড হিসেবে কাজ করার অনুমতি চান। বিদেশিরা খুশি হয়ে যা দেন তা দিয়েই চলে যায় তাদের সংসার। এদের মধ্যে পুরুষের পাশাপাশি রয়েছেন নারীও। দোভাষীদের একজন শিল্পী আক্তার। বয়স ৩২ বছর। স্বামীকে নিয়ে থাকেন পুরান ঢাকার নাজিরাবাজারে। ১০ বছর বয়সে রেল কলোনিতে পরিবারের সঙ্গে থাকতেন। তখন মা গার্মেন্টে কাজ করলেও বাবা কোনো কাজ করতেন না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত মার্কেটে আসা বিদেশিদের সঙ্গে ঘুরে বেড়াতেন শিল্পী। যাওয়ার সময় কেউ কেউ খুশি হয়ে কিছু বখশিশ দিতেন। এভাবে ছোটবেলা থেকেই মার্কেটে ঘুরতে ঘুরতে আয়ত্ত করেন বিদেশিদের ভাষা। তিনি বলেন, বিদেশিরা মার্কেটে এলে তাদের পিছু নিলে জিজ্ঞেস করতো ‘ইউ হেল্প মি?’ আমরা বলতাম হ্যাঁ। তখন বাংলা ছাড়া কিছুই বলতে পারতাম না। তবে তাদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে এক পর্যায় বিদেশি ভাষা শিখে ফেলি। এখন বাংলা, ইংরেজি, আরবি, ফারসি, ফিলিপিনো, মালয়, ফ্রেঞ্চ, রুশ, জার্মান, ফরাসি ও হিন্দি ভাষায় কথা বলতে পারি অনর্গল। এর বাইরে কোনো বিদেশি এলে তাদের সঙ্গে ইংরেজিতেই কথা বলি। বিদেশিদের গাইড করার পর যাওয়ার সময় তারা খুশি হয়ে ১ বা ২ ডলার বখশিশ দেয়। সেটাই আমাদের আয়। তিনি আরো বলেন, অনেক বিদেশি আমাদের পরিচিত হয়ে গেছেন। তারা বিমানবন্দরে নেমেই আমাদের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করেন। পরে রিসিভ করে মার্কেটে নিয়ে আসি। শিল্পীর মতো আরেকজন দোভাষী মো. বাবু। বয়স ২৩ বছর। রেল কলোনিতে বড় হলেও কলোনি উচ্ছেদের পর আগা মসজিদ এলাকায় ভাড়া থাকেন। পড়ালেখা প্রাইমারিও পার করতে পারেননি। তিনিও ছোটবেলা থেকে বিদেশিদের সঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে আয়ত্ত করেছেন ৮টি ভাষা। এখন পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন দোভাষী। এক ভাই এক বোনের পরিবারের এখন তিনিই হাল ধরেছেন। বাবা আগে কাঁচা তরকারি বিক্রি করলেও এখন বয়সের ভারে ক্লান্ত। সারাদিন মসজিদেই কাটিয়ে দেন। দোভাষীর কাজ করেই বিয়ে দিয়েছেন ছোট বোনকে। এখন তিনজনের পরিবার চালান এই কাজ করে। শিল্পী ও বাবুর মতো বঙ্গমার্কেটেই দোভাষীর কাজ করেন আরো অনেকেই। এদের মধ্যে রয়েছেন পারভীন ইসলাম, বেবি, ফাতেমা, রাবেয়া, রোখসানা, পলি আক্তার, মেরাজ উদ্দিন, হুকুম আলী, এরশাদ ও সুজনসহ কয়েকজন। সবারই বাল্যকাল কেটেছে বঙ্গমার্কেটের পাশের রেল কলোনিতে। কিন্তু সরকার রেল কলোনি বস্তি উচ্ছেদের পর সবাই ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় বাসা নিয়েছেন। কেউবা বিয়ে করে স্বামীর সঙ্গে ঢাকার অন্যান্য অঞ্চলে বসবাস করেন। তবে অনেকগুলো ভাষা জানার কারণে বঙ্গমার্কেটে এখন দোভাষীর কাজ করেন। তাদের কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঈদ ও রোজার কারণে এখন তাদের আয় কম। কারণ এই সময় বিদেশিরা আসেন কম। ঈদের পর ও শীতকালে বিদেশি বেশি আসেন। বেবি নামের এক দোভাষী জানান, ইয়ার হোস্টেজে চাকরিরতরা বেশি আসেন বঙ্গমার্কেটে। তারা সাধারণত ব্র্যান্ডের কাপড় ছাড়া পরেন না। আর বঙ্গমার্কেট থেকে প্রায় ৯০ শতাংশ কম দামে যে কোনো ব্র্যান্ডের কাপড় কিনতে পারেন তারা। এছাড়া নেপাল ও ভুটানের কিছু ব্যবসায়ী সারা বছরই এই মার্কেটে কাপড় কিনতে আসেন। বাংলাদেশে এসে ১০-১২ দিন থেকে মালামাল কিনে নিয়ে যান। তিনি বলেন, বাংলাদেশে এসে হোটেলে থাকা, বিমান খরচ, বিভিন্ন জায়গায় দালাল ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে টাকা দেয়ার পরও যে টাকা দিয়ে কাপড় কিনে নিয়ে যান তা তাদের দেশে নিয়ে প্রায় দ্বিগুণ লাভে বিক্রি করতে পারেন। এ জন্য তারা কম দামে কাপড় কিনতেই এখানে আসেন। তিনি বলেন, বিমানবন্দরে এসে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন অনেক বিদেশি। তাদের ভাষাকে অনুবাদ করে দেয়া, নতুন কি কাপড় এসেছে মার্কেটে এসব গাইড করে তাদের কাছ থেকে বখশিশ পাই। শুধু বঙ্গমার্কেটই না, ঢাকা কলেজের পাশে নূরজাহান মার্কেটেও দেখা মিলবে দোভাষীদের। তারাও এক সময় বঙ্গমার্কেটেই কাজ করতেন। দোভাষীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বিদেশিদের গাইড হিসেবে কাজ করলেও তাদের কোনো পরিচয় নেই। নেই কোনো আইডি কার্ড। মোতাহার হোসেন নামের এক দোকানি বলেন, দোভাষীরা সারাদিন মার্কেটের সামনেই থাকেন। আমাদের বেশিরভাগ ব্যবসায়ীর খুব বেশি লেখাপড়া নেই। বিদেশিরা এলে তাদের সঙ্গে কথা বলতে দোভাষীদের ডাকি। এছাড়া বিদেশি এলে দোভাষীরাই তাদের নিয়ে আসেন আমাদের দোকানে।