সেবাতেই রাকিবের সুখ

তাঁর মনোজগৎ বদলে গিয়েছিল সেই কিশোরবেলায়। তারপর সিডর থেকে শুরু করে রানা প্লাজা—সব সংকটে, দুর্যোগে মানুষের পাশে হাজির হয়েছেন রাকিব হায়দার। তাঁদের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা নিয়ে বই লিখেছেন। জাহাঙ্গীরনগরে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন গড়েছেন, আন্তর্জাতিক সামাজিক সংগঠনেরও তিনি উদ্যোক্তা। তাঁর সেবাজীবনের কথা শোনাচ্ছেন আসাদুজ্জামান। ছবি তুলেছেন কায়সার আহমেদ

২০০৭ সাল, মন দিয়ে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন রাকিব। তবে এক ভয়াল ঘটনা তাঁকে বদলে দিল। তিনি সাতক্ষীরার ছেলে। তাঁদের পাশের জেলা বাগেরহাটের শরণখোলায় ১৫ নভেম্বর সিডর আঘাত হানল। সেই রাতে তাঁদের এলাকায়ও প্রবল ঝড়বাদল হয়েছিল। কিন্তু দুর্যোগের মাত্রা কত ভয়াবহ ছিল, সেটি কয়েক দিনের মধ্যে টের পেলেন তিনি। খবরের কাগজে একটি বাঘ, হরিণ আর এক নারীর পাশাপাশি পড়ে থাকা লাশের ছবি ছাপা হলো। ছবিটি দেখার পর দারুণভাবে চমকে গেলেন রেডক্রসের সদস্য রাকিব হায়দার। স্কুলবন্ধুদের নিয়ে শ্যামনগরে চলে গেলেন। সবাই মিলে অসহায় মানুষদের শুকনো খাবার, খাওয়ার স্যালাইন দিলেন। তবে তাঁরা যা নিয়ে গিয়েছিলেন, সেগুলোয় কুলোতে পারলেন না। মানুষগুলোর আরো অনেক বেশি সহায়তার দরকার। বন্ধুরা মিলে সাতক্ষীরার বিভিন্ন স্কুল-কলেজে ঘুরে ঘুরে চাঁদা তুলতে লাগলেন। সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ, বাবুলিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, গভর্নমেন্ট বয়েজ হাই স্কুলসহ আরো কয়েকটি স্কুলের ছাত্রছাত্রীদের কেউ ১০ টাকা, কেউ ৫ টাকা চাঁদা দিল। সেগুলো দিয়ে আরো খাবার, স্যালাইন কিনে দিয়ে এলেন সব হারানো মানুষদের।

বছরদুয়েক পরের কথা। তত দিনে ইন্টারমিডিয়েট পড়েন রাকিব। একদিন বাড়ি ফিরে দেখেন, ফুফু বসে আছেন। তিনি কাঁদছেন। কী হয়েছে? জানতে চাইলেন ভাইপো। ফুফু বললেন, আইলায় তাঁদের বাড়িঘর ভেঙে গেছে। কথায় কথায় জানালেন, তখনো অনেকের বাড়িঘর পানিতে তলিয়ে আছে। মানুষ বাড়ির চালে আশ্রয় নিয়ে বেঁচে আছে। আবার বন্ধুদের নিয়ে তিনি সাহায্যের জন্য চললেন। ভেলা নিয়ে একের পর এক বানভাসি মানুষের বাড়িতে গেলেন। তাদের উদ্ধার করে নিয়ে এলেন কোনো উঁচু জায়গায়। পানির তীব্র স্রোত থেকে বাঁচতে রাকিব নিজেকে গাছের সঙ্গে শক্ত করে বেঁধেছেন আর বাড়ির চালে বসে থাকা মানুষটিকে টেনে নিয়ে এসে ভেলায় তুলেছেন। ছেলের এই জীবনপণ সংগ্রাম দেখে বাবা তাঁকে শ্যালো ইঞ্জিনের নৌকাটি দিয়ে বললেন, ‘নৌকাটি নিয়ে যাও।’ নৌকায় তাঁরা শুকনো খাবার আর স্যালাইন নিয়ে মানুষের বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দিলেন। সে খাবারগুলোও কিনেছিলেন চাঁদার টাকায়। এভাবে বড় দুটি দুর্ঘটনায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর অভিজ্ঞতা তাঁকে পুরোপুরি বদলে দিল। কৃষক বাবার ছেলে হয়েও তিনি অবসরে এলাকার পাঁচটি শিশুকে অক্ষরজ্ঞান দিতেন। তবে তাতে তাঁর মন ভরত না। তিনি চাইতেন আরো বেশি ছেলেমেয়ে লেখাপড়া শিখুক। এর ফলেই গড়ে উঠল বেগম সায়রা [বিএস] মডেল হাই স্কুল। এখানে প্রাইমারি শ্রেণির লেখাপড়া শেখানো হতো। প্রায় ৭৫টি শিশু-কিশোর পড়ত। ২০১১ সালে কয়েকজন বন্ধু, জনহিতৈষী মোহাম্মাদ আলী ও ডা. এস এম ইসরাইল হোসেনের সহযোগিতায় নিজের এলাকা সাতক্ষীরার কাশিমপুরে মায়ের নামে স্কুলটি গড়েছিলেন রাকিব। যারা টাকা দিতে পারত না, তারা বিনা পয়সায় পড়ত। যাদের সামর্থ্য আছে, তাদের কাছ থেকে নামমাত্র টাকা নেওয়া হতো।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগে ভর্তি হয়েও রাকিবের এসব নেশা কাটেনি। অবশ্য তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর আস্তে আস্তে স্কুলের কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়তে থাকে। পরে ছাত্রছাত্রীদের অন্য স্কুলগুলোয় ভর্তি করা হয় এবং স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। তবে থেমে থাকেননি রাকিব। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েই বিএনসিসিতে ঢুকে পড়েছিলেন তিনি। এই সংগঠনের হয়ে নিয়মিত ভর্তি পরীক্ষার সময় শৃঙ্খলারক্ষী হয়েছেন, অসহায় ছাত্রছাত্রীর সাহায্যের জন্য চাঁদা তুলেছেন।

২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজার ভয়াবহ ঘটনা চমকে দিল সারা দেশের মানুষকে। বিএনসিসির সবাইকে নিয়ে ছুটলেন রাকিব। তবে ভিড় আর নানা ধরনের মানুষের চাপে তাঁরা অসহায় মানুষগুলোকে কোনো সহযোগিতাই করতে পারলেন না। ক্যাম্পাসে ফিরে সেদিনই ২১ জন মিলে গড়ে তুললেন ‘জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় স্বেচ্ছাসেবক পরিষদ’ [জাবিস্বেপ]। পরদিন আবার গেলেন সেখানে। তাঁরা কয়েকটি দলে ভাগ হয়ে সারা দিন মানুষকে উদ্ধার করলেন। কেউ ব্যস্ত লাশ শনাক্তের কাজে, কেউ তহবিল জোগাড় করছেন আবার কেউ সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোকে ক্ষতিগ্রস্তদের সম্পর্কে নানা তথ্য দিচ্ছেন। এভাবে কয়েক দিন টানা কাজ করলেন রানা প্লাজায়।

সেদিনও রাকিব সেখানে আছেন। সামনে একটি লাশ। সেটির সারা শরীর থেঁতলে গেছে, মুখ, চোখ দেখে মানুষটিকে চেনার কোনো উপায় নেই। কেবল একটি নম্বর জানিয়ে দিচ্ছে তার পরিচয়—‘লাশ নম্বর ৬৭’। খুব মন খারাপ হলো তাঁর। হঠাৎ ফোন বেজে ওঠল। তাকিয়ে দেখেন, মা ফোন করেছেন—‘বাবা কোথায় আছ?’ ‘মা, আমি সাভারে।’ উত্তর দিলেন ছেলে। ‘ওদের জন্য কিছু করার থাকলে করো। ওরা তো তোমারই ভাইবোন’। মা বললেন। সারাটি দিন এসব মানুষের সেবায়ই কেটে গেল। ফিরে এসে জাহাঙ্গীরনগরের হলগুলোয়, শিক্ষকদের কোয়ার্টারে, পথচলতি মানুষের কাছে আর গাড়িগুলোতে সাহায্য চাইলেন তাঁরা। সে টাকায় আবার সহযোগিতা করা হলো আহতদের।

নানা দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর যে অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছে, সেগুলো সবাইকে জানাতে কয়েকটি বইও লিখেছেন তিনি। আইলা নিয়ে ‘নিঃস্ব যবে আইলার বানে’, তাজরীন ও নিমতলীর ভয়াবহ আগুনের দাবানলে পোড়া মানুষদের নিয়ে ‘স্বপ্ন শশ্মান’, রানা প্লাজার কাহিনী নিয়ে ‘স্বপ্ন সমাধি’ নামে বই আছে রাকিব হায়দারের।

এ ছাড়া তাঁর লেখা ইংরেজি কবিতার বই আছে। নাম ‘মি. ইউনিভার্স’। রাকিব সামাজিক সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে অভিনয় করেন। তিনি সিলেটের রাজন হত্যাকাণ্ড নিয়ে তৈরি রাজন টেলিফিল্মে অভিনয় করেছেন।

আন্তর্জাতিকভাবে যেন সারা দুনিয়ার মানুষের নানা দুর্যোগে পাশে দাঁড়ানো যায়, সে জন্য তিনি একটি সংগঠন গড়ে তুলেছেন। ২০১৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর স্মৃতিসৌধের সামনে প্রতিষ্ঠিত এই সংগঠনের নাম ‘সোশ্যাল অর্গানাইজেশন অব ইউনিভার্সিটি লার্নার্স [সোলএসওইউএল]। বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও তুরস্কের ১০টি বিশ্ববিদ্যালয়ে সোলএসওইউএলের শাখা আছে। কেন এভাবে মানুষের পাশে ছুটে যান—এ প্রশ্নের জবাবে লোকপ্রশাসন বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র রাকিব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকলেন। এরপর বললেন, ‘মানুষের দুর্দিনে পাশে থাকার আনন্দটি অন্য কিছুতে পাই না বলে।’