অলিম্পিকে বাংলাদেশ

ব্রাজিলের রিও ডি জেনেইরোতে ৫-২১ আগস্ট শুরু হতে যাচ্ছে দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ অলিম্পিক। তিন ধাপে এবার অলিম্পিকে যাবে বাংলাদেশ দল। আগামী ৩১ জুলাই যাচ্ছে শুটিং দল। গত ১ আগস্ট সাঁতার ও অ্যাথলেটিকস, ২ আগস্ট যাবে গলফ। ২১ সদস্যের বহরে খেলোয়াড় সাতজন। গেমসের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পতাকা বহন করবেন সিদ্দিকুর রহমান। সিদ্দিকুর রহমান বাংলাদেশের প্রথম ক্রীড়াবিদ হিসেবে অলিম্পিকে সরাসরি খেলার সুযোগ পেয়েছেন। অলিম্পিকে সবকিছু উজাড় করে দেয়ার প্রত্যয় জানিয়েছেন দেশ সেরা এই গলফার। নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, ২০১০ সাল থেকে পেশাদার গলফ সার্কিটে খেলার পর আমার যে অভিজ্ঞতা তার সবকিছু মিলিয়ে উজাড় করে দেব রিও অলিম্পিকে। গত বছর ইনজুরিতে খুব বেশি কিছু করে দেখাতে পারেননি সিদ্দিকুর। সেই আক্ষেপ নিয়ে তিনি বলেন, ২০১৪-১৫ সালে ইনজুরির কারণে প্রত্যাশা মতো খেলতে পারিনি। তবে সেই ইনজুরি কাটিয়ে উঠেছি। সেই সঙ্গে আমার খেলা আরো উন্নত করতে বেশ কিছু পদক্ষেপও নিয়েছি। এর প্রতিফলন আশা করি, রিওতে দেখাতে পারব। আমার আত্মবিশ্বাস এখন আগের থেকে অনেক বেশি।

দেশের প্রথম অ্যাথলেট হিসেবে অলিম্পিকে খেলতে যাওয়ার অনুভূতি জানাতে গিয়ে তিনি বলেন, আনন্দের বিষয় ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। দেশের পতাকা সেখানে উড়াতে পারব তাতেই তো অন্যরকম লাগছে। বাংলাদেশের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে আমি অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছি যেটা অবশ্যই গর্বের। সিদ্দিকুর জানান ২৪ জুলাই থাইল্যান্ডে একটি টুর্নামেন্ট খেলতে যাচ্ছেন তিনি। সেখান থেকে ফিরেই ২ আগস্ট রিও তে চলে যাবেন এশিয়ান ট্যুরের শিরোপা জেতা প্রথম ও একমাত্র বাংলাদেশি এই গলফার। আগে নয়টি অলিম্পিক আসরে অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। অলিম্পিক লক্ষ্য সম্পর্কে সিদ্দিকুর বলেছেন, অলিম্পিকে তার কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য নেই। কোনো পদকের জন্যও তিনি চিন্তা করছেন না। বরং অলিম্পিকে নিজের খেলাটাই খেলতে চান।

অলিম্পিকে আমার নির্দিষ্ট কোনো লক্ষ্য নেই। অতীতে অনেক টুর্নামেন্টেই আমি টার্গেট করে খেলেছি, কিন্তু আমি অনেকবারই ফেল করেছি। তাই আমি এবার পরিকল্পনা করছি, আমি আমার গেমটাকে এনজয় করব। রেজাল্ট যাই আসুক, সেটার দিকে ফোকাস দেব না। আমি আমার নিজের খেলাটাই খেলতে চাই, আমি আমার বেস্ট দেব।

বাংলাদেশের অ্যাথলেটদের বেলায় একটি কথা বলা হয় যে, অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করতে পারাটাই তাদের সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা। সেই ধারা থেকে বেরিয়ে সিদ্দিকুর রহমান কি কোনো পদক নিয়ে ফিরতে পারবেন? এ বিষয়ে সিদ্দিকুর বলেন, আসলে কোনো পদকের জন্য চিন্তা করছি না। আমি মনে করি, একজন গলফার হিসাবে যে অলিম্পিকে যাচ্ছি, এটা বাংলাদেশের গলফের জন্য একটি বড় অর্জন। এটা তো আসলে বাংলাদেশে একটি নতুন খেলা। এখন আমি আমার বেস্ট খেলাটা খেলতে পারলে, আমার আত্মবিশ্বাস যে, আমি একটা সম্মানজনক পজিশনে থাকতে পারব।

ক্রীড়ায় বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর ক্রীড়াবিদরা এ আসরে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি, বাংলাদেশের ক্রীড়াবিদদের জন্য অলিম্পিক এখনো অভিজ্ঞতা অর্জনের মঞ্চ। স্বাধীনতার পর ১৯৭২ মিউনিখ অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি ছিলেন কাজী আনিসুর রহমান। বাংলাদেশ ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের আহ্বায়ক কৃতী ক্রীড়া সংগঠক আনিসুর রহমান ওই গেমসে পর্যবেক্ষক ছিলেন। চার বছর পর মন্ট্রিল অলিম্পিকে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল যোগ দেয়। ওই দলে কোনো ক্রীড়াবিদ ছিলেন না। দলনেতা ছিলেন জাতীয় ক্রীড়া নিয়ন্ত্রণ বোর্ডের সে সময়ের চেয়ারম্যান কর্নেল আবদুর রহমান। পর্যবেক্ষক ফ্লাইট লে. (অব.) রুস্তম আলী এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রতিনিধি সুমিত রায়। ১৯৮০ মস্কো অলিম্পিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ কয়েকটি দেশ বর্জন করলে বাংলাদেশ ওই আসরে কোনো প্রতিনিধি পাঠায়নি।

১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলেস গেমসে বাংলাদেশ প্রথম ক্রীড়াবিদ পাঠায়। তিন সদস্যের ওই দলে একমাত্র ক্রীড়াবিদ ছিলেন সাইদুর রহমান ডন। মার্চপাস্টে বাংলাদেশ দলের পতাকা বহন করেন তিনি। লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ অলিম্পিক থেকে নিয়মিত অংশ নিয়ে আসছে বাংলাদেশ। সেই থেকে বাংলাদেশি ক্রীড়াবিদদের অলিম্পিকে জায়গা করে নিতে হতো বিশেষ কোটা ওয়াইল্ড কার্ডের মাধ্যমে। রিও অলিম্পিকে সরাসরি খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছেন দেশ সেরা গলফার সিদ্দিকুর রহমান।

সাধারণত অলিম্পিকে ক্রীড়াবিদরা অংশ নিয়ে থাকেন যোগ্যতার মাপকাঠিতে। তবে আমাদের মতো স্বল্পোন্নত দেশগুলোর ক্রীড়াবিদদের ভরসা ওয়াইল্ড কার্ড। সাঁতার আরচারি, শুটিংয়ে এবারো ওয়াইল্ড কার্ডে অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশের অ্যাথলিটরা। ব্যতিক্রম কেবল গলফার সিদ্দিকুর রহমান। তিনি বাংলাদেশের হয়ে প্রথমবারের মতো যোগ্যতার ভিত্তিতে অংশ নিচ্ছেন ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত এ আসরে। আশা ছিল অ্যাথলেটিকসেও দুটি ওয়াইল্ড কার্ড পাবে বাংলাদেশ।

গত ১৫ জুলাই বিকেল পর্যন্ত কোনো ওয়াইল্ড কার্ড না আসাতে ১৯৮৪ সালের পর প্রথমবার অলিম্পিক গেমসের অ্যাথলেটিক্সে অংশগ্রহণ করতে না পারার শঙ্কা দেখা দিয়েছে বাংলাদেশের।

এবারো অলিম্পিকে অংশ নিচ্ছে এমনটা ধরে নিয়েই প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন দুই স্প্রিন্টার মেজবাউদ্দিন ও শিরিন আক্তার। এর আগে বাংলাদেশের অংশ নেয়া সব আসরেই ওয়াইল্ড কার্ডে ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশের অ্যাথলিটরা, যার শুরু হয়েছে ১৯৮৪ সালে। ১৯৮৮ সিউল অলিম্পিকে চারজন অ্যাথলিট পাঁচটি ইভেন্টে অংশ নিয়েছিলেন। এর মধ্যে সে সময়ের দেশসেরা অ্যাথলিট শাহ আলম ১০০ মিটার ও ২০০ মিটারে, মিলজার হোসেন ৪০০ মিটার ও ৮০০ মিটারে, শাহ আলম, মিলজার হোসেন, শাহানুদ্দিন চৌধুরী ও শাহজালাল চার গুণীতক ১০০ মিটার রিলেতে অংশ নেন। ১৯৯২ সালের বার্সেলোনা অলিম্পিকে চার গুণীতক ১০০ মিটারে গোলাম আম্বিয়া, মেহেদী হাসান, শাহানুদ্দিন চৌধুরী ও শাহজালাল। পুরুষদের ১০০ মিটারে গোলাম আম্বিয়া, শাহানুদ্দিন চৌধুরী ও মেহেদী হাসান ৪০০ মিটারে অংশ নেন। ১৯৯৬ সালে আটলান্টা অলিম্পিকে পুরুষদের ১০০ মিটারে বিমল তরফদার এবং মহিলাদের হাইজাম্পে নিলুফা ইয়াসমিন অংশ নেন। ২০০০ সালে সিডনি অলিম্পিকে মাহবুবুল আলম ২০০ মিটার স্প্রিন্টে ডিসকোয়ালিফাই হন। মহিলাদের ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ফৌজিয়া হুদা জুঁই, ২০০৪ সালে অ্যাথেন্স অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে শামসুদ্দিন এবং ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে আবু আবদুল্লাহ অংশ নেন। ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকে মোহন খান ১০০ মিটার স্প্রিন্ট ১১.২৫ সেকেন্ডে হিটে পঞ্চম হন। এবারো ট্র্যাক অ্যান্ড ফিল্ডে দুটি কার্ডের প্রত্যাশা করেছিল বাংলাদেশ অলিম্পিক এসোসিয়েশন (বিওএ)। যে অনুযায়ী দেশের দ্রুততম মানব মেজবাউদ্দিন আহাম্মেদ ও দ্রুততম মানবী শিরিন আক্তারকে প্রস্তুত রাখে বাংলাদেশ।

১৯৮৪ সালে লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিকে স্প্রিন্টার সাইদুর রহমান ডন দেশের প্রথম প্রতিযোগী হিসেবে অলিম্পিকে অংশগ্রহণ করেন। এরপর কুইন অব দ্য গেমস খ্যাত অ্যাথলেটিক্সে গত ৩২ বছরে অন্তত একটি করে ওয়াইল্ড কার্ড পেয়ে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১২ সালের লন্ডন গেমসে অ্যাথলেটিক্সে অংশ নিয়েছিলেন দেশের দ্রুততম মানব মোহন খান। এবার দেশের দ্রুততম মানব ও মানবী মেজবাহ আহমেদ ও শিরিন আকতারের জন্য দুটি ওয়াইল্ড কার্ড চেয়েছিল বাংলাদেশ। গত ১৪ জুলাই ছিল ওয়াইল্ড কার্ড প্রদানের শেষ দিন। ১৫ জুলাই বিকাল পর্যন্ত এ ব্যাপারে রিও অলিম্পিক কমিটি বা আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন কোনো কিছু না পাঠানোতে হতাশ হয়ে পড়েছে অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশন। এ ব্যাপারে অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ইব্রাহিম চেঙ্গিম বলেন, কেনও এমন হলো তা আমাদের জানা নেই। আমরা নিয়মমাফিক সবকিছুই করেছি আর এ রকম এর আগে কখনো হয়নি। তবে আমরা আশা ছাড়ছি না। আমরা আন্তর্জাতিক অ্যাথলেটিক্স ফেডারেশনের কাছে অনুরোধ করে ই-মেইল পাঠিয়েছি। তাদের অনুরোধ করেছি বিষয়টি পুনর্বিবেচনার জন্য। ১৯৮৪ সালের অলিম্পিকে সাইদুর রহমান ডন ১১ দশমিক ২৫ সেকেন্ড সময় নিয়ে ১০০ মিটার স্প্রিন্টে ৮২তম স্থান পান দেশের প্রথম অলিম্পিয়ান।

ছয় অ্যাথলিটের বহর নিয়ে দক্ষিণ কোরিয়ার সিউলে আসরে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ।

১৯৯৬ সালে আটলান্টায় চার, ২০০০ সালে সিডনিতে পাঁচ, ২০০৪ এথেন্সে চার, ২০০৮ সালে বেইজিংয়ে পাঁচ ও ২০১২ সালে লন্ডন অলিম্পিকে পাঁচ অ্যাথলিট নিয়ে অংশগ্রহণ করে বাংলাদেশ।

আন্তর্জাতিক অলিম্পিক সংস্থাভুক্ত ২০৪ দেশ বিশ্বের সর্ববৃহৎ এ ক্রীড়া আসরে অংশগ্রহণ করে। এর মধ্যে বাংলাদেশ সবচেয়ে জনবহুল দেশ হয়েও, কোনো পদক জয় করতে পারেনি। রিও ডি জেনিরোর আসর হতে যাচ্ছে নবম। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরেও বাংলাদেশের জন্য বিশ্বের সবচেয়ে বড় ক্রীড়া প্রতিযোগিতা কেবল ‘অংশগ্রহণের মঞ্চ’ হয়ে আছে, হয়ে আছে অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রও। যুদ্ধবিধ্বস্ত অনেক দেশই অলিম্পিকের মঞ্চে বাজাতে পেরেছে তাদের মধুর জাতীয় সঙ্গীত, গৌরবের পতাকা। তিন দশক ধরে পদক দূরে থাক, এখন পর্যন্ত কোনো ইভেন্টের চূড়ান্ত লড়াইয়ে অংশ নেয়ারও সুযোগ মেলেনি বাংলাদেশের কোনো প্রতিযোগীর।

অলিম্পিকে বাংলাদেশ পদক জেতার ধারে কাছে যেতে না পারলেও বাংলাদেশের সমপর্যায়ের অনেক দেশই অলিম্পিকে পদক জিতেছে।

অলিম্পিকের চিরকালীন পদক তালিকায় আছে দারিদ্র্য ক্লিষ্ট ইরিত্রিয়া, জিবুতি, নাইজারের মতো দেশ। আছে বারবাডোজ, মেসিডোনিয়া, টোগো, গায়ানা কিংবা বারমুডার মতো অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের প্রায় সমপর্যায়ের দেশও। ছোট্ট দেশ শাদ কিংবা সুরিনামও অলিম্পিকে সোনা জিতে হইচই ফেলেছিল অতীতে। কিন্তু আমরা প্রথম থেকেই অলিম্পিককে বানিয়ে রেখেছি ‘শিক্ষাসফরে’র গন্তব্য হিসেবে। ২০০২ সালে ম্যানচেস্টার কমনওয়েলথ গেমসে আসিফ হোসেন খান ভারতের অভিনব বিন্দ্রাকে হারিয়ে সোনা জিতেছিল। সেই বিন্দ্রা ২০০৮ সালে বেইজিং অলিম্পিকে ভারতকে স্বর্ণ উপহার দিয়েছে। এই একটি ঘটনা থেকেই পরিষ্কার হয়ে যায় সবকিছু। বোঝা যায় কোথায় আমাদের দৈন্য।