মত্স্য খাতে সাম্প্রতিক অর্জন

মত্স্য সম্পদ উন্নয়নের লক্ষ্যে ১৯-২৫ জুলাই ২০১৬ মেয়াদে দেশব্যাপী মত্স্য সপ্তাহ ২০১৬ উদযাপিত হবে। মত্স্য সপ্তাহের এবারকার প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘‘জল আছে যেখানে, মাছ চাষ সেখানে’’। মত্স্য সপ্তাহের মূল কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে সড়ক শোভাযাত্রা, মত্স্য মেলা, সেমিনার ইত্যাদি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আগামী ২০ জুলাই কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে মত্স্য সপ্তাহের শুভ উদ্বোধন করবেন।

আমাদের দেশ মূলত নদী মাতৃক গাঙ্গেয় বদ্বীপ। পদ্মা-মেঘনা-যমুনাসহ অসংখ্য নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, খাল-বিল, পুকুর-দীঘি এবং বিচিত্র জলাশয়ে পরিপূর্ণ এ দেশ মত্স্য সম্পদের এক অফুরন্ত সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র। দেশের জিডিপিতে মত্স্য খাতের অবদান ৩.৬৯ শতাংশ এবং কৃষিজ জিডিপিতে ২২.৬০ শতাংশ। আমাদের খাদ্যে প্রাপ্ত প্রাণীজ আমিষের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে মাছ থেকে। দেশের ১৪ লাখের বেশি নারীসহ মোট জনসংখ্যার ১১ শতাংশের অধিক মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে মত্স্য খাতের উপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করে। মত্স্য খাতে প্রতি বছর অতিরিক্ত ৬ লক্ষাধিক লোকের নতুন কর্মসংস্থান হচ্ছে। ২০১৪-১৫ অর্থ বছরে আমাদের দেশে উত্পাদিত মাছের পরিমাণ প্রায় ৩৭.০ লাখ মেট্রিক টন। ২০২১ সালে দেশে মাছের উত্পাদন ৪৫.০ লাখ মেট্রিক টনে পৌঁছাতে হবে। এ লক্ষ্যে বর্তমান মত্স্যবান্ধব সরকার নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। অর্থ বরাদ্দ বৃদ্ধি ও আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহের মাধ্যমে গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি, মাছের আবাসস্থল উন্নয়ন, মাছের প্রাকৃতিক প্রজনন ক্ষেত্র সংরক্ষণ, পুকুরে প্রযুক্তিভিত্তিক মাছ চাষ সম্প্রসারণ, জাটকা সংরক্ষণ ও ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন, প্রকৃত মত্স্য জেলেদের পরিচয়পত্র প্রদান, বিদেশে নিরাপদ মত্স্য ও মত্স্যজাত পণ্য রপ্তানির সক্ষমতা অর্জন, পরিবেশবান্ধব চিংড়ি চাষ, ইউনিয়ন পর্যায়ে মত্স্য চাষ সম্প্রসারণ সেবা প্রদান ইত্যাদি অন্যতম।

মাছের উত্পাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের ক্রমবর্ধমান জনগোষ্ঠীর খাদ্য ও পুষ্টি চাহিদা মেটাতে প্রযুক্তি উদ্ভাবনে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) কাজ করে যাচ্ছে। ইনস্টিটিউট থেকে ইতোমধ্যে মত্স্য চাষ ও ব্যবস্থাপনা বিষয়ক ৫০টি প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং এসব প্রযুক্তি মত্স্য অধিদপ্তর ও বিভিন্ন এনজিওর মাধ্যমে মাঠ পর্যায়ে সম্প্রসারণের ফলে দেশে মাছের উত্পাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বৃদ্ধি পেয়েছে। ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠালগ্নে (১৯৮৬) দেশে মাছের উত্পাদন ছিল ৮.০ লাখ মে.টন- যা ২০১৪-১৫ সালে প্রায় ৩৭.০ লাখ মে.টনে উন্নীত হয়েছে। বাংলাদেশ মিঠাপানির মত্স্য উত্পাদনে ইতোমধ্যে ৪র্থ স্থান অর্জন করেছে। মাছের উন্নতজাত ব্যবহারের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর চাষাবাদ ও ব্যবস্থাপনার আওতায় এই উত্পাদন আরো বৃদ্ধি করা সম্ভব। খরা প্রবণ বৃহত্তর রংপুর ও দিনাজপুর এলাকায় যেখানে ৪/৫ মাস পানি থাকে এসব জলাশয়ে ৪ মাসেই ফলন পাওয়া যায় এমন প্রজাতি যেমন কৈ, সরপুঁটি ও তেলাপিয়া জাতীয় মাছের চাষ করে উত্পাদন বৃদ্ধি করতে হবে। এসব চাষাবাদের ক্ষেত্রে বিএফআরআই উন্নতজাতের পোনা ও প্রযুক্তি সরবরাহ করতে সক্ষম।

মাছের প্রচলিত প্রজাতির পাশাপাশি বাণিজ্যিক গুরুত্বসম্পন্ন অপ্রচলিত প্রজাতি যেমন কুচিয়া, শামুক, ঝিনুক, কাঁকড়া ইত্যাদি সংরক্ষণ ও চাষাবাদ উন্নয়নে বর্তমান সরকার সবিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। আমাদের খাদ্য তালিকায় এসব প্রজাতি না থাকলেও বিদেশে এর প্রচুর চাহিদা রয়েছে। এসব পণ্য বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা প্রদান করেছেন। উল্লেখ্য, কাঁকড়া ও কুচিয়া চাষ উন্নয়নে মত্স্য অধিদপ্তর ও বিএফআরআই থেকে ১টি উন্নয়ন প্রকল্প বর্তমানে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সেই সাথে পুষ্টিমান সমৃদ্ধ সী-উইড নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট গবেষণা পরিচালনা করছে। দেশে বণিজ্যিকভাবে মিঠাপানির মুক্তা চাষ করার লক্ষ্যে মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রীর সুযোগ্য নেতৃত্বে দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর দেশে প্রথমবারের মতো ভিয়েতনাম থেকে মুক্তা উত্পাদনকারী বড় আকৃতির ঝিনুক সংগ্রহ করা হয়েছে। ফলে দেশে মুক্তা গবেষণায় নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে।

মাছ উত্পাদন বৃদ্ধির পাশাপাশি জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এবং প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকার লক্ষ্যে মত্স্য অধিদপ্তরের আওতায় ঢাকা, চট্টগ্রাম ও খুলনায় আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ৩টি গবেষণাগার প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। ২০১৪ সালে ঢাকার সাভারে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে আধুনিক মাননিয়ন্ত্রণ গবেষণাগার- যা নিয়ে আমরা গর্ব করতে পারি। ফলে আন্তর্জাতিক মহলে মত্স্য ও মত্স্যজাতীয় পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে বাংলাদেশের গ্রহণযোগ্যতা সম্প্রতি বহুলাংশে বৃদ্ধি পেয়েছে। তবে, মাছের আহরণ পরবর্তী ক্ষতি কমানোর জন্য আমাদের উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। মাছ ও চিংড়ি দ্রুত পচনশীল পণ্য বিধায় সময়মত এর পরিচর্যা করা না হলে দ্রুত মাছ পচে নষ্ট হয়ে যায়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, সঠিক পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণের অভাবে এখনো দেশে আহরণকৃত মাছের শতকরা ১২-১৯ ভাগ পচা অবস্থায় ভোক্তার হাতে পৌঁছে। পচা মাছ কিনে রান্না করে খেলে ভোক্তাগণ শতকরা ৩০-৪০ ভাগ সুফল কম পায়। তাছাড়া, দৈনন্দিন জীবনে মানুষের ব্যস্ততা বাড়ায় সরাসরি কিংবা স্বল্প পরিশ্রমে খাবার উপযোগী মানসম্মত মত্স্য পণ্য আমাদের তৈরি করতে হবে।

উল্লেখ্য, আগামী ২০২১ সালে আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর উদযাপন করবো। তাত্পর্যপূর্ণ এই বছরকে সামনে রেখে প্রণয়ন করা হয়েছে রূপকল্প ২০২১। রূপকল্প ২০২১-এ মত্স্য খাতকে বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা হয়েছে। রূপকল্প ২০২১-এ দেশের মাছের উত্পাদন ৪৫.০ লাখ মে. টন নির্ধারণ করা হয়েছে- যা বর্তমান উত্পাদনের চেয়ে ৮ লাখ মে. টন বেশি। এজন্য আগামী বছরগুলোতে আমাদের প্রতিবছর প্রায় অর্ধ লাখ মে. টন মাছ বার্ষিক উত্পাদন করতে হবে। আশার কথা যে, গত অর্থ বছরে মাছের উত্পাদন পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১ লাখ মে. টন ছাড়িয়ে গেছে। উত্পাদনের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৯-২০ সালের মধ্যেই দেশ মাছে স্বয়ংসম্পূর্ণ হবে ।

n লেখক: মহাপরিচালক, বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউট,