বিনিয়োগবান্ধব মুদ্রানীতি আসছে

বেসরকারী খাতকে চাঙ্গা করতে উৎপাদনমুখী ও বিনিয়োগবান্ধব মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জিপিডি প্রবৃদ্ধি অর্জনকে প্রাধান্য দিয়ে কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে নয়া মুদ্রানীতিতে। ঋণপ্রবাহ বাড়াতে নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা এক থেকে দেড় শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এতে পুঁজিবাজারে স্বস্তি, দারিদ্র্য বিমোচন, কর্মসংস্থান ও উন্নয়নে আস্থা ও উৎসাহ যোগানে উদ্যোগ নেয়া হবে। তবে মুদ্রানীতির ভঙ্গি হবে আগের মতোই সময়োপযোগী। বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গবর্নর ফজলে কবির প্রথমবারের মতো এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের এ মুদ্রানীতি আগামী ২৭ জুলাই বেলা ১১টায় ঘোষণা করা হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

চলতি অর্থবছরের বাজেটে বিনিয়োগ বাড়ানোর বিভিন্ন পদক্ষেপের কথা বলা হয়েছে। এর অংশ হিসেবে বাজারে ঋণের চাহিদা বাড়াতে ঋণের সুদের হার কমানোর পদক্ষেপ নেয়া হবে নয়া মুদ্রানীতিতে। ঋণের চাহিদা সৃষ্টিতে এসএমইর মতো আরও কিছু খাতকে এবার বেছে নেয়া হবে। এবারের বাজেটে মোট দেশজ আয়ের প্রবৃদ্ধি ৭ দশমিক ২ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে রাখার কথা বলা হয়েছে। ফলে এবারের মুদ্রানীতিতে এর প্রতিফলন আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল জনকণ্ঠকে বলেন, এবারের মুদ্রানীতিতে মূল্যস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বাড়ানোর প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। ঋণপ্রবাহ বাড়ানো এবং শেয়ারবাজারে স্বস্তি ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ নেয়া হবে। তিনি বলেন, মূূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাই প্রবৃদ্ধি অর্জনই এখন লক্ষ্য। এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, গতানুগতিক ধারায় এবারও মুদ্রানীতিকে সঙ্কোচনশীল বা সম্প্রসারণমুখী কোনটাই বলা হবে না। বেসরকারী ও উৎপাদনশীল খাতে ঋণপ্রবাহ গতিশীল করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার কৌশল নেয়া হয়েছে। মূলত মুদ্রানীতির ভঙ্গি হবে সময়োপযোগী।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে, ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জুলাই-ডিসেম্বর মেয়াদের মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতের ঋণপ্রবাহ বাড়ানো হবে। প্রাথমিকভাবে বেসরকারী ঋণপ্রবাহ এক থেকে দেড় শতাংশ বাড়ানোর পরিকল্পনা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ফলে মুদ্রানীতি বেসরকারী খাতের ঋণপ্রবাহ ১৫ দশমিক ৮০ থেকে ১৬ দশমিক ৩০ শতাংশের মধ্যে রাখা হবে। তবে নীতিনির্ধারণী সুদ হারে আপাতত কোন পরিবর্তন আনার চিন্তা করছে না। জানা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারী খাতের ঋণপ্রবাহ যেভাবে বাড়ছে, তাতে মুদ্রানীতিতে ঋণপ্রবাহ আরও বাড়ানোর সুযোগ ছিল। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্যে বেরিয়ে এসেছে, অন্য ব্যাংকগুলোর ঋণ না বাড়লেও রাষ্ট্রমালিকানাধীন সোনালী, রূপালী, অগ্রণী, জনতা ও বেসিক ব্যাংকের ঋণ বাড়ছে। ২০১৫ সালের মে মাসে এসব ব্যাংকের ঋণ প্রবৃদ্ধি ছিল ৬ দশমিক ৪ শতাংশ, গত মে মাসে তা বেড়ে হয়েছে ১৬ শতাংশ।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গবর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, মুদ্রানীতি সঙ্কোচনমুখী না হয়ে সঙ্কুলানমুখী হওয়া দরকার। বেসরকারী খাতে ঋণপ্রবাহ আরও বাড়ানো যেতে পারে। আমাদের প্রবৃদ্ধি যেহেতু বেসরকারী খাতনির্ভর, তাই উদ্যোক্তাদের একধরনের বার্তা দিতে হবে। পাশাপাশি শুধু বড় বড় গ্রাহকের দিকে না ছুটে ব্যাংকগুলোকে ছোট ও মধ্যম মানের উদ্যোগে অর্থায়ন করতে হবে; তাহলে কর্মসংস্থান তৈরি হবে। আমাদের সমতাভিত্তিক উন্নয়নের কথা ভাবতে হবে। সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ব্যাংকগুলোকে শুধু নির্দেশনা না দিয়ে তদারকি বাড়াতে হবে। আমাদের যে অর্জনগুলো আছে, তা সুসংহত করতে হবে। যে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জগুলো আসছে, খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ছে, এসবের দিকে নজর রাখতে হবে। পাশাপাশি সেবাগুলো যেন সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছায়, সেদিকে নজর রাখতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জানা গেছে, ২০১৫-১৬ অর্থবছরের দ্বিতীয়ার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতের ঋণপ্রবাহ ১৪ দশমিক ৮০ শতাংশ নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে গত মে মাসেই বেসরকারী ঋণ ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। জুন শেষে তা আরও বাড়বে বলে আশঙ্কা করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এ প্রসঙ্গে এবিবির সাবেক চেয়ারম্যান ও বেসরকারী মেঘনা ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল আমিন বলেন, এখন দেশে বিনিয়োগের পরিবেশ বিরাজ করছে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ব্যাংক ঋণে সুদহার কম থাকার কারণে উদ্যোক্তারা ঋণের দিকে ঝুঁকছেন। অনেক নতুন উদ্যোক্তা ব্যাংক থেকে ঋণ নেয়া শুরু করেছেন। আবার পুরনো অনেকে ঋণসীমা বৃদ্ধি করেছেন। এ কারণেই ঋণের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে। এ প্রসঙ্গে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশ কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন বলেন, মুদ্রানীতির ভঙ্গি পরিবর্তনের তেমন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। পাশাপাশি নীতিনির্ধারণী জমার হারেও পরিবর্তন প্রয়োজন নেই। মুদ্রানীতিতে প্রবৃদ্ধি অর্জন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখার জায়গা থাকতে হবে। বেসরকারী খাতের ঋণ তো লক্ষ্যমাত্রাই অর্জন করতে পারছে না। ব্যাংক থেকে সরকারের ঋণ নেয়ার যে লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, তার ব্যবস্থাপনা কী হবে, তাও ঠিক করতে হবে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলোয় সুশাসনের অভাব রয়েছে। এসব দুর্বলতা রোধে পরবর্তী ছয় মাস কী পদক্ষেপ থাকবে, তার ঘোষণাও থাকা প্রয়োজন।

জানা গেছে, গত টানা ৫ বছরের মুদ্রানীতি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, বিনিয়োগ পরিবেশ স্বাভাবিক না থাকার কারণে টানা ৫ বছর প্রাক্কলিত ঋণ প্রবৃদ্ধি পূরণ হয়নি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০১২-১৩ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছিল সাড়ে ১৮ শতাংশ। কিন্তু বাস্তবে ২০১২-১৩ অর্থবছর শেষে বেসরকারী খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি হয়েছিল ১০ দশমিক ৮৫ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও অনেক কম প্রবৃদ্ধি হওয়ায় ২০১৩-১৪ অর্থবছরের প্রথমার্ধে মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ধরা হয় সাড়ে ১৫ শতাংশ। এই অর্থবছরে বেসরকারী খাতের ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যায় ৪ দশমিক ২৩ শতাংশ। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয় ১২ দশমিক ২৭ শতাংশ। অবশ্য ২০১৪-১৫ অর্থবছরের জানুয়ারির আগে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তুলনামূলক ভাল ছিল। সেই আলোকে জানুয়ারি-জুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতে জুন নাগাদ ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয়। কিন্তু ২০১৪ সাল শেষে বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়ায় ১৩ দশমিক ৫০ শতাংশ। ২০১৫-১৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধের মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ধরা হয় ১৫ শতাংশ। এ লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও গত অর্থবছরের শেষার্ধের (জানুয়ারি-জুন) জন্য বেসরকারী খাতে সাড়ে ১৫ শতাংশ ঋণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবে অর্জন হয় ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ। সবর্শেষ ২০১৬ সালের জানুয়ারি মাসে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঘোষিত মুদ্রানীতিতে বেসরকারী খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়। নির্ধারিত সময়ের ২ মাস আগেই এপ্রিল শেষে বেসরকারী খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১৫ দশমিক ৫৯ শতাংশ।