সতর্ক মুদ্রানীতি আসছে

বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান কিছুটা বাড়িয়ে চলতি অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই থেকে ডিসেম্বর) জন্য মুদ্রানীতি ঘোষণা করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ২৭ জুলাই কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জাহাঙ্গীর আলম কনফারেন্স হলে নতুন এ মুদ্রানীতি ঘোষণা করবেন গভর্নর ফজলে কবির। নতুন গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব নেয়ার পর এটিই হবে তার প্রথম মুদ্রানীতি। এজন্য নতুন মুদ্রানীতি নতুন গভর্নরের জন্য এক ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জনের মধ্যে ভারসাম্য রেখেই প্রতি ৬ মাসের জন্য আগাম মুদ্রানীতি ঘোষণা করে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৮ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার কথা বলা হয়েছে।
জানা গেছে, আগের ধারাবাহিকতায় জাতীয় বাজেটের সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই এবারও নতুন মুদ্রানীতি দেয়া হবে। বিশেষ করে সরকার প্রক্ষেপিত ৭ দশমিক ২ শতাংশ হারে জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জনে নতুন মুদ্রানীতিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হবে। এজন্য বেসরকারি খাতে চাহিদা অনুযায়ী ঋণের জোগান বাড়ানোর কৌশল নেয়া হচ্ছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল ও খাদ্যপণ্যের দাম বৃদ্ধির ইঙ্গিত এবং সরকারি চাকরিজীবীদের নতুন কাঠামোয় বেতন-ভাতার বাড়তি ব্যয় যাতে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে না পারে, সেজন্য নতুন মুদ্রানীতিতে থাকবে যথেষ্ট সতর্কতাও।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ বিরূপাক্ষ পাল আলোকিত বাংলাদেশকে বলেন, দেশের অর্থনীতির জন্য যা কিছু ভালো, তার সবকিছুই থাকবে নতুন মুদ্রানীতিতে। আগামী সপ্তাহে এটি ঘোষণা করা হবে। তবে এটির ভঙ্গিমা কেমন হচ্ছে সেটি তিনি বলতে রাজি হননি।
জানা গেছে, নতুন মুদ্রানীতি নির্ধারণে এবারও স্টেকহোল্ডার তথা অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মতামত নেয়া হয়েছে। রাজধানীর হোটেল লেকশরে ১১ জুলাই নতুন গভর্নরের সভাপতিত্বে এই মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দেয়ার পাশাপাশি বিনিয়োগবান্ধব মুদ্রানীতি প্রণয়নের পক্ষে মতামত উঠে আসে। এতে অনেকেই মত দেন যে শুধু বেসরকারি খাতে ঢালাওভাবে ঋণের জোগান বাড়ালেই উচ্চপ্রবৃদ্ধি অর্জন হবে, তা নয়। বরং প্রকৃত চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়ানো উচিত। নইলে বিনিয়োগ অনুৎপাদশীল খাতে গিয়ে মূল্যস্ফীতিকে উসকে দিতে পারে। সভায় মুদ্রানীতি যাতে সবার কাছে আরও স্পষ্ট ও বোধগম্য হয়, এ বিষয়েও গুরুত্বারোপ করা হয়। এছাড়া নতুন মুদ্রানীতি নিয়ে শনিবার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন গভর্নর। এদিকে নতুন মুদ্রানীতির ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের ওয়েবসাইট পেজেও মতামত নেয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফেরায় বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা বাড়ছে। আগামীতে ঋণের চাহিদা আরও বাড়বে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে বেসরকারি খাতে ঋণের সীমা নির্ধারণ করা হবে। তবে এটি করা হবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে প্রাধান্য দিয়েই।
চলতি মুদ্রানীতিতে জুন পর্যন্ত বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। মে পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ। জুন পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি ১৭ শতাংশের কাছাকাছি বা ১৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে। জুন মাসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা ঊর্ধ্বমুখী হওয়ার জন্য বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি বৃদ্ধি কিছুটা হলেও দায়ী বলে মনে করছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
তাই নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণের জোগান বাড়ানো হবে পরিমিত হারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, ডিসেম্বর পর্যন্ত বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা সাড়ে ১৫ শতাংশ ধরা হতে পারে। তবে আগামী বছরের জুন পর্যন্ত তা ১৫ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে।
সমাপ্ত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৭ শতাংশ। আর মূল্যস্ফীতি ৬ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ঠিক করেছিল সরকার। অর্থবছর শেষে দুটিতেই সাফল্য এসেছে।
৭ শতাংশের ওপর প্রবৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি মূল্যস্ফীতিও ৬ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে। তবে বিদায়ী অর্থবছরের জুন মাসে মূল্যস্ফীতি সার্বিকভাবে কিছুটা বেড়েছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি বাড়ার কারণেই সার্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। জুন মাস শেষে তা দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক ৫৩ শতাংশে। আগের মাসে এর পরিমাণ ছিল ৫ দশমিক ৪৫ শতাংশ। তাই কেন্দ্রীয় ব্যাংক নতুন মুুদ্রানীতি এমনভাবে প্রণয়ন করতে চাইছে যাতে অর্থবছর শেষে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৫ শতাংশ ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি ন্যূনতম ৭ শতাংশ অর্জন করা যায়।