শিল্পের তুলনায় কৃষি মজুরি বাড়ছে

কাজের খোঁজে শ্রমিকদের একটি বড় অংশ গ্রাম থেকে শহরে ছুটছে। গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এমন তথ্য দিলেও সংস্থাটির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শহরের শিল্পের তুলনায় গ্রামের কৃষি মজুরি বৃদ্ধির হার বেশি।

বিবিএসের খাতভিত্তিক সর্বশেষ মজুরি সূচকে এ প্রবণতা দেখা গেছে। ১৯৭৪ সাল থেকে বিবিএস দিনমজুরদের মজুরি হার সূচক নির্ণয় করে আসছে। আগে ১৯৬৯_৭০ অর্থবছরকে ভিত্তি ধরে মজুরি হার সূচক নির্ণয় করা হতো। বর্তমানে ২০১০-১১ অর্থবছরকে ভিত্তি বছর ধরে মজুরি হার সূচক নির্ণয় করা হচ্ছে। গত কয়েক বছর ধরে কৃষি, শিল্প এবং সেবা খাতে মজুরিতে প্রবৃদ্ধি বাড়ছে।

গত অর্থবছরে কৃষি মজুরি বেড়েছে ৬ দশমিক ৪১ শতাংশ। সেখানে শিল্পে মজুরি বেড়েছে ৬ দশমিক ১৬ শতাংশ। এদিকে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে গত অর্থবছরের জানুয়ারি থেকে ধারাবাহিকভাবে শিল্প মজুরি প্রবৃদ্ধি কমতে থাকে। জানুয়ারিতে এ খাতের মজুরি প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৫ দশমিক ৭৩ শতাংশ। গত জুনে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৫ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ।

বিবিএসের যুগ্ম পরিচালক জিয়াউদ্দিন আহমেদ সমকালকে বলেন, এখন একই জমিতে বছরে তিন থেকে চার ফসল উৎপাদন হচ্ছে। ফসল তোলার সময় শ্রমিক পাওয়া অনেক ক্ষেত্রে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। বছরের একটি নির্দিষ্ট সময়ে ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা ব্যয় করেও শ্রমিক পাওয়া কষ্টকর হয়ে যায়। এ জন্য কৃষি শ্রমিকের মজুরিতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হচ্ছে।

বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এমএম জুলফিকার আলী সমকালকে বলেন, শিল্পে মজুরি কাঠামো থাকায় একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির মধ্য দিয়ে বাড়ানো হয়। হঠাৎ করে মজুরি বাড়ানো সম্ভব হয় না। কৃষিতে চাহিদা এবং জোগানের ভিত্তিতে হওয়ায় এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি মজুরি পাচ্ছে। কয়েক বছর আগে যেখানে সারাদিন খেটে এক কেজি চাল হতো না, সেখানে এখন ৫ থেকে ৭ কেজি কেনা সম্ভব। মজুরি বাড়ার কারণে কৃষিপণ্য উৎপাদন খরচও বেশ বেড়েছে। তিনি বলেন, কাজের খোঁজে গ্রাম ছেড়ে শহরে ভিড়ছে মানুষ। এ কারণে কৃষিতে শ্রমিক সংকটও প্রকট হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে শ্রমিক পাওয়া কঠিন হয়ে যায়। এসব সুযোগের কারণে কৃষি মজুরি বেড়েছে।

বিবিএসের হিসাবে নতুন ভিত্তিবছর অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরে গড় মজুরি বৃদ্ধির ছিল সাড়ে পাঁচ শতাংশ। এর পরের বছরে পাঁচ শতাংশের নিচে নেমে আসে।

গত অর্থবছরে তা বেড়ে সাড়ে ছয় শতাংশ হয়েছে। পুরনো ভিত্তিবছরে মজুরি বৃদ্ধির হারের চিত্র পুরোপুরি উল্টো। ২০১১-১২ অর্থবছরে ছিল ৬ দশমিক ২৪ শতাংশ। এর পরের অর্থবছরে ছয় শতাংশে নেমে আসে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে আরও কমে সাড়ে পাঁচ শতাংশ হয়। পরের অর্থবছরে আরেক ধাপ কমে পাঁচ শতাংশের নিচে নেমে এসেছে।

জানতে চাইলে বিবিএসের ন্যাশনাল অ্যাকাউন্টিং উইংয়ের এক কর্মকর্তা সমকালকে বলেন, নতুন ভিত্তিবছরে অনেক পরিবর্তন হয়েছে। এ কারণে মজুরি প্রবৃদ্ধির হারে পরিবর্তন হয়েছে। সার্বিক বিবেচনায় নতুন ভিত্তিবছরের হিসাবটাই গ্রহণযোগ্য।

বিবিএসের হিসাবে, সেবা খাতে উচ্চ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে সেবা খাতের মজুরিতে পাঁচ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে তা বেড়ে প্রায় ৮ শতাংশের কাছাকাছি রয়েছে।

বিবিএসের হিসাবে, দেশে কৃষি শ্রমিকের হার কমছে। শ্রমশক্তি জরিপ-২০১৩ এর তথ্য মতে, দেশে ১৫ বছর বয়সের উধর্ে্ব থাকা কর্মক্ষম শ্রমশক্তি ৬ কোটি ৭ লাখ। এর মধ্যে কৃষিখাতে নিয়োজিত ৪৫ শতাংশ। এর আগের জরিপে (২০১০) কৃষি শ্রমিকের হার ছিল ৪৭ দশমিক ৩ শতাংশ।

ম্যানুফাকচারিং বা উৎপাদন খাতে রয়েছে ১৬ দশমিক ৪০ শতাংশ শ্রমিক। বাণিজ্য, হোটেল ও রেস্তোরায় রয়েছে ১৪ দশমিক ৫০ শতাংশ শ্রমিক। নির্মাণ খাতে রয়েছে মোট শ্রমিকের ৩ দশমিক ৭০ শতাংশ।