মাছের উৎ​পাদন বাড়ছে উন্নত জাত উদ্ভাবনের কল্যাণে, স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে চতুর্থ

সারা বিশ্বে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদনে এক ধাপ এগিয়ে এবার চতুর্থ স্থানে উঠে এসেছে বাংলাদেশ। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) এক প্রতিবেদনে গত বছর বাংলাদেশের অবস্থানকে পঞ্চম হিসেবে দেখানো হয়েছিল।

৭ জুলাই এফএও থেকে প্রকাশিত ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার-২০১৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশি প্রজাতির মাছের উন্নত জাত উদ্ভাবনের মাধ্যমে মাছের উৎপাদন বাড়িয়ে চলেছে বাংলাদেশ। এ ছাড়া ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নদীতে জাটকা নিধন বন্ধ করার মাধ্যমে ইলিশের উৎপাদন বিপুল পরিমাণে বেড়েছে।

প্রতিবেদনে ২০১৪ সালের উপাত্ত ব্যবহার করা হয়েছে। এতে দেখা যাচ্ছে, ওই বছর বাংলাদেশে ৩৪ লাখ ৩৪ হাজার মেট্রিক টন স্বাদু পানির মাছ উৎপাদিত হয়েছে। আর বাংলাদেশের চেয়ে প্রায় ২২ গুণ বেশি আয়তনের দেশ ভারত একই সময়ে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদন করেছে ৭৩ লাখ ৬৩ হাজার মেট্রিক টন। তালিকায় মাছ উৎপাদনে ভারতের অবস্থান তৃতীয়। ভারতকে টপকে মিয়ানমার চলে এসেছে দ্বিতীয় স্থানে। চীন এখনো প্রথম স্থানেই আছে।

এর আগের প্রতিবেদনে (২০১৪ সালের) দেখানো হয়েছিল, ২০১২ সালে বাংলাদেশে স্বাদু পানির মাছ উৎপন্ন হয়েছে ৩২ লাখ মেট্রিক টনের বেশি।

সামুদ্রিক মাছ উৎপাদনের তালিকায় বাংলাদেশ শীর্ষ ২৫ দেশের মধ্যেও নেই। তবে স্বাদু পানির মাছ উৎপাদন বৃদ্ধির দিক থেকে বাংলাদেশের নেওয়া উদ্যোগের প্রশংসা করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর উপযোগী মাছের নতুন জাত উদ্ভাবনে বাংলাদেশ সাফল্য দেখাচ্ছে।

বাংলাদেশ গত বছর (২০১৫ সাল) পুকুরে চাষ ও জলাভূমি থেকে ৩৮ লাখ ৫০ হাজার টন মাছ উৎপাদন করেছে। বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও মাছের চাহিদা বৃদ্ধির হিসাব কষে বাংলাদেশ মৎস্য অধিদপ্তর বলছে, ২০২১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ৪৫ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন করতে হবে। এ জন্য প্রতিবছর দেড় লাখ টন করে মাছের উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রাও নির্ধারণ করেছে সরকার।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী ছায়েদুল হক প্রথম আলোকেবলেন, ‘সমুদ্রসীমা জয়ের ফলে আমরা সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের নতুন দুয়ার উন্মোচন করেছি। দেশের সমুদ্রসীমায় কী পরিমাণ মাছ আছে, তা অনুসন্ধানের জন্য মালয়েশিয়া থেকে আমরা একটি জরিপ জাহাজ এনেছি। এ বছর জরিপ শেষে আমরা সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের ওপর মহাপরিকল্পনা নেব।’

দেশি মাছের উন্নত জাত: মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের বিজ্ঞানীরা বলেন, সংস্থাটির বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত ১৪টি মাছের নতুন জাত উদ্ভাবন করেছেন। চাষিদের হাতে তুলে দিয়েছেন ৫০টি উন্নত প্রযুক্তি। মূলত নতুন এই জাত ও চাষ পদ্ধতির কারণেই দেশে মাছের উৎপাদন বাড়ছে বলে এফএওর প্রতিবেদনেও বলা হয়েছে।

এফএওর হিসাব অনুযায়ী, এক যুগ ধরে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশ মাছ চাষে বিশ্বের শীর্ষ পাঁচ দেশের মধ্যেই রয়েছে। ২০০৬ সালে বাংলাদেশ ভারতকে টপকে দ্বিতীয় স্থানে উঠে এসেছিল। ২০০৪ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মাছের উৎপাদন ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

এ ব্যাপারে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁরা রুই, রাজপুঁটি, তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছের জাত উন্নয়ন করে চাষিদের কাছে পৌঁছে দিচ্ছেন। এ ছাড়া জেনেটিক গবেষণায় উদ্ভাবিত রুই, রাজপুঁটি, তেলাপিয়া ও পাঙাশ মাছের উৎপাদন স্থানীয় জাতের চেয়ে যথাক্রমে ১৫ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বেশি।

মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাবে, জাটকা সংরক্ষণসহ নানা উদ্যোগের ফলে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় মাছ ইলিশের উৎপাদন ৬৫ হাজার টন বেড়ে ৩ লাখ ৮৭ হাজার টন হয়েছে। রপ্তানির পরিমাণও গত এক যুগে প্রায় ১৩৫ গুণ বেড়েছে।

সংশোধনী: প্রথম আলোতে গতকাল শুক্রবার ‘মাছ খাওয়া বাড়ছে’ শিরোনামে প্রকাশিত সংবাদে দুটি তথ্যের ভুল আছে। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী মোহাম্মদ ছায়েদুল হককে ওই মন্ত্রণালয়ের সচিব লেখা হয়েছে। এছাড়া মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহবুবকে মৎস্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।