বিবিএস জরিপঃ দেশে প্রজনন হার কমেছে

শিক্ষার হার ও চাকরিজীবী দম্পতির সংখ্যা বৃদ্ধিসহ নানা কারণে সন্তান গ্রহণে সচেতনতা বাড়ছে। মোট প্রজনন হার (১৫-৪৯ বছর বয়সের মধ্যে) জাতীয়ভাবে কমে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ১০ জনে। যা ২০১২ সালে ছিল ২ দশমিক ১২ জন। তবে শহুরে দম্পতিদের মধ্যে সন্তান গ্রহণের হার কমলেও গ্রামে বেড়েছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মনিটরিং দি সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্টাটিস্টিকস অব বাংলাদেশ-২০১৫’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রতিবেদনে বলা হয়, শহরে ২০১৫ সালে প্রজনন হার কমে দাঁড়িয়েছে ১ দশমিক ৭২-এ, যা ২০১৪ সালে ছিল ১ দশমিক ৭৭ এবং ২০১৩ সালে ছিল ১ দশমিক ৮৪। এ ছাড়া ২০১২ সালে ছিল ১ দশমিক ৮৪ এবং ২০১১ সালে ছিল ১ দশমিক ৭১।
অন্যদিকে গ্রামে প্রজনন হার বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, গ্রামে ২০১৫ সালে প্রজনন হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ দশমিক ৩০ এ। যা ২০১৪ সালে ছিল ২ দশমিক ২২ এবং ২০১৩ সালে ছিল ২ দশমিক ১৯। এ ছাড়া ২০১২ সালে ছিল ২ দশমিক ৩০ এবং ২০১১ সালে ছিল ২ দশমিক ২৫।
প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, সাধারণ প্রজনন হারও (যে কোনো বয়সের নারী) কমেছে। ২০১৫ সালে এ হার কমে দাঁড়িয়েছে প্রতি হাজার মহিলার মধ্যে ৬৯ জনে, যা ২০১৪ ও ২০১৩ সালে ছিল ৭১। ২০১২ ও ২০১১ সালে ছিল ৭০। গ্রামে ২০১৩ সালে সাধারণ প্রজনন হার প্রতি হাজার মহিলার মধ্যে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭৭-এ, যা ২০১৪ সালে ছিল ৭৫ এবং ২০১১ সালে ছিল ৭৬। অন্যদিকে শহর এলাকায় ২০১৫ সালে সাধারণ প্রজনন হার কমে দাঁড়িয়েছে ৫৭ জনে, যা ২০১৪ সালে ছিল ৬০ এবং ২০১১ সালে ছিল ৬০।
পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. শামসুল আলম এ বিষয়ে বলেন, ‘এখন মানুষের মধ্যে সন্তান জন্ম দেয়ার বিষয়ে যে সচেতনতা
সৃষ্টি হয়েছে সেটি অত্যন্ত পজিটিভ। এটি দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার ফসল। এ ক্ষেত্রে এনজিও, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থাসহ সব শ্রেণির মানুষের অংশগ্রহণ রয়েছে।’
সন্তান গ্রহণ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মানুষের মধ্যে শিক্ষার হার বৃদ্ধি, সামাজিক বিভিন্ন ক্ষেত্রে অগ্রগতি, জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি ব্যবহারে সচেতনতা, চাকরিজীবী দম্পতির সংখ্যা বৃদ্ধি, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাওয়া মোট প্রজনন হার কমেছে।
প্রতিবেদন বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক একেএম আশরাফুল হক বলেন, ‘প্রজনন হার কমা মানে সন্তান জন্মদানের সক্ষমতা কমা নয়। এর অর্থ হচ্ছে মানুষের সন্তান নেয়ার হার কমছে।’
তিনি জানান, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো ১৯৮০ সাল থেকে দৈব পদ্ধতিতে জন্ম, মৃত্যু, বিবাহ ও স্থানান্তরে তথ্য সংগ্রহ করে আসছে। শুরুতে মাত্র ১০৩টি নমুনা এলাকায় তথ্য সংগ্রহ করা হতো। ধাপে ধাপে তা বৃদ্ধি পেয়ে বর্তমানে ২ হাজার ১২টি নমুনা এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে এ প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া। এ প্রতিবেদনটি ২ হাজার ১২টি নমুনা এলাকার ২ লাখ ১৫ হাজার ৮১১টি খানা (পরিবার) থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়।
এ বিষয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক ও প্রসূতি রোগ বিশেষজ্ঞ এবং ল্যাপারোস্কপিক সার্জন ডা. রেজাউল করিম কাজল বলেন, ‘মূলত তিন কারণে দেশে প্রজনন হার কমছে। এগুলো হচ্ছে প্রথমত, শিক্ষার হার বাড়ছে। এজন্য মানুষ সচেতন হয়েছে। তারা মনে করছে পরিবারে জনসংখ্যা কম রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, মানুষের মধ্যে জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ব্যবহার বাড়ছে এবং তৃতীয়ত, কর্মজীবী নারীর সংখ্যা বাড়ছে। ফলে দেখা যাচ্ছে যে, অধিকাংশ সময়ে স্বামী ও স্ত্রী আলাদা থাকছে। কেননা, দুজনেই চাকরি করেন। তাছাড়া কর্মজীবী নারীরা মনে করেন যে, একটির বেশি সন্তান নিলে তাদের ব্যবস্থাপনার সমস্যা হবে। এসব কারণেই প্রধানত প্রজনন হার কমছে।’