বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে, এগিয়ে যাবে

বাংলাদেশ বিশ্ব দরবারে ক্রমশ অর্থনৈতিকভাবে একটি সক্ষম দেশ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের মান-মর্যাদা বেড়ে যাওয়ায় অর্থনৈতিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলো এবং যারা দুর্বল বলে বিভিন্ন সময় দরিদ্র রাষ্ট্র থেকে বিভিন্ন পন্থায় পুঁজি পাচারে সক্রিয় থাকে এবং তাদের স্থানীয় এজেন্ট, যারা পঞ্চম স্তম্ভ হিসাবে বিবেচিত, তারা নানা পন্থায় একটি সুন্দর পরিবেশকে বিভিন্নভাবে ঘোলাটে করতে সচেষ্ট থাকেন। এমনিতেই বাংলাদেশ ভূ-রাজনৈতিক কারণে বিশ্ব দরবারে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও খনিজ সম্পদের পরিমাণ স্বল্প এবং প্রতি বর্গকিলোমিটার হিসাবে জনসংখ্যার ঘনবসতি সত্ত্বেও এদেশের অবস্থা বিশ্ব দরবারে আট বছরে শক্তিশালী হয়েছে। হঠাত্ করে ১লা জুলাই গুলশানে এবং পরবর্তীতে শোলাকিয়ার ঈদগাহ মাঠের কাছে কতিপয় বিপথগামী, বিভ্রান্ত ধর্মের নামধারী সন্ত্রাসীর খপ্পরে পড়ে এবং তারা যে সমস্ত পৈশাচিক কর্মকাণ্ড ঘটিয়েছে—তা পৈশাচিক। দুঃখে ভারাক্রান্ত হয় আমাদের হূদয়। এরা দেশ-জাতির শত্রু ও ষড়যন্ত্রকারীদের ক্রীড়নক। ধর্মের মূল বাণী বুঝতে অক্ষম, বিভ্রান্ত এরা। আত্মঘাতী ঘটনা ঘটিয়ে দেশের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করে এদেশের শত্রুদের সঙ্গে নিজেদের যোগসূত্র স্থাপনের পন্থা করতে চেয়েছে। আমাদের উন্নয়নের সহযোগী দেশ, কিংবা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশীদার দেশের নাগরিক, পার্শ্ববর্তী দেশের নাগরিক আর এদেশীয় নাগরিক কেউই এদের হাত থেকে নিস্তার পাচ্ছে না। মুসল্লিরাও নিস্তার পাচ্ছে না, আইন শৃংখলা বাহিনীও নিস্তার পাচ্ছে না। আসলে এ বিভ্রান্ত গোষ্ঠী যেন দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। এটি আসলে দুঃখজনক। যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া ও অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশে পড়তে গিয়ে যারা বিভ্রান্ত হচ্ছেন তাদের কারণ জানতে হবে।

সবকটি জায়গায় বিএনপি আমলে জঙ্গিরা তাদের উত্থানের ঘোষণা দিয়েছিল। সে সময়ে সরকারের নিষ্ক্রিয়তায় বাংলা ভাইয়ের উত্থান ঘটেছিল বলে পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছিল। যেহেতু আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে জঙ্গিবাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় ঘটছে সেহেতু এটি একটি বৈশ্বিক সমস্যা। এ বিশ্বের সবাই প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার কল্যাণে জানে, কারা তালেবান তৈরি করেছিল। তালেবানরা যা করে থাকে তা মোটেই আমাদের ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। আমরা যারা মুসলিম, তারা জানি- নবী করিম (স.) আল্লার প্রেরিত সর্বশেষ নবী। হযরত মুহাম্মদ (স.) -এর পর এ পৃথিবীতে আর কোনো নবী আসবেন না। অথচ আইএস নামধারীরা মসজিদে নববীতেও আক্রমণে ক্ষান্ত হয়নি। এটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুসলমানদের মত আমাদের কষ্ট দিয়েছে। এদেশের গুলশান আক্রমণের পরদিন ইরাকে ১৬৫ জন মারা গেছেন। আইএস কিভাবে তৈরি হয়েছে, কারা তাদের তৈরি করছে, কেন এখন পর্যন্ত তাদের দমন করা যাচ্ছে না বিশ্ব বিবেকের কাছে একজন সাধারণ বিশ্ব নাগরিক হিসাবে আমাদের প্রশ্ন।

ব্রেক্সিট ঘটলে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাস কিছুটা কমতে পারে।

পত্রিকান্তরে প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায় যে, বেলুচিস্তানের বিপথগামী তরুণরা ট্রেনিং নিয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আইন শৃংখলা বাহিনীর বক্তব্য না পাওয়ায় এর সত্যতা জানি না। যেভাবে গুটি কয়েক তরুণ বিপথগামী হয়ে এধরনের ঘটনা ঘটাচ্ছে তা কেবল নিন্দনীয় নয় বরং দেশ ও জাতির বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। এদেশের আইন-শৃংখলা বাহিনী যথেষ্ট দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়েছে- তাদের সদস্যদের রক্তাক্ত লাশের উপর দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা মাথায় শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে দায়িত্ব পালন করেছেন। নইলে যারা সেদিন ঈদের জামাত পড়তে গিয়েছিলেন, তাদের ঈদ থেকে হয়ত ফেরাটা প্রশ্নবোধক হয়ে যেত।

বাঙালি বীরের জাতি—তাই গুটিকয়েক দুষ্কৃতকারীর ভয়ে ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে থাকার পাত্র-পাত্রী নয়। নির্ভয়ে তারা ঘর ছেড়ে ঈদের উত্সবে মেতেছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অন্যবারের তুলনায় ভাল ছিল। তবে বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে—যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পাঁচজন পুলিশ মারা গেছে। বেশ কয়েক বছর আগে আইবিএ ও ম্যানেজমেন্ট বিভাগের শিক্ষকদ্বয় জঙ্গি সংযোগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গ্রেফতার হয়েছিল বলে পত্রিকায় প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়। এ ব্যাপারে দেশের গর্ব প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশকিছু শিক্ষকের ব্যাপারে পূর্বতন উপাচার্য মহোদয়ও অভিযোগ করেছিলেন। নামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র নর্থ-সাউথ, ব্র্যাকও এবার আক্রমণে সংযুক্ত হয়েছে। এটি অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। শিক্ষকরা জাতি গড়ার কারিগর। অথচ আজ তাদের একাংশ সম্পৃক্ত অন্যায়ভাবে বিপথগামী হচ্ছে আবার অন্যদের বিপথগামী করে চলেছে। এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা আগে নেয়া উচিত ছিল। এখন পর্যন্ত যেসমস্ত বিপথগামী আমরা টিভি রিপোটির্ং-এর কল্যাণে চোখের সামনে দেখছি তারা উঠতি বয়সের তরুণ। তরুণীরাও এব্যাপারে পিছিয়ে আছে কিনা সেটা কেবল গোয়েন্দারা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে বলতে পারবেন। আর বলতে পারা উচিত মা-বাবাদের। তাদের উচিত মাতা-পিতার দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করা, নিজের মেয়ে কিংবা ছেলে কার সঙ্গে বন্ধুত্ব করছে; ফেইসবুক টুইটার-লিংকেডিনে কার সঙ্গে যোগাযোগ করছে; ভাইবার-ইমু-হোয়াইট আপের মাধ্যমে কাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। কোন কোন শিক্ষক এদের মানবতার বিরুদ্ধে, সততার বিপক্ষে, ধর্মের বিপক্ষে অধর্মের পক্ষে, মিথ্যের পক্ষে অমানবিকতার পক্ষে কাজ করে চলেছে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইতোমধ্যে ইউজিসির বর্তমান চেয়ারম্যান ইতিবাচক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন—বাংলা ও বাংলাদেশ স্টাডিজ পড়ানো সম্পর্কে। এটি বাস্তবায়িত হলে ছাত্র-ছাত্রীদের মনে দেশের প্রতি ভালোবাসা ও টান বাড়বে। এদেশ-আমাদের প্রিয় জন্মভূমি। এদেশে আমাদের জন্ম হয়েছে-স্রষ্টার ইচ্ছায়। আর এ কথা আমাদের সবার জানা, ‘জননী জন্মভূমিশ্চ স্বর্গদপী গরিয়সী’ অর্থাত্ মাতৃভূমি হচ্ছে মা যা বেহেশতের মত। শিক্ষকতায় যারা সংযুক্ত রয়েছেন তাদের মতাদর্শের ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু কয়েকটি মৌলিক ইস্যুতে ঐকমত্য থাকা বাঞ্ছনীয়—নৈতিকতা, অসাম্প্রদায়িকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও সর্বোপরি মানবিকতা। আজ দেশে যান্ত্রিক কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা তৈরি হয়েছে যাদের মধ্যে মানবিকতার লেশ নেই। বিভ্রান্ত করে চলেছে তরুণ-তরুণীদের।

আসলে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীরা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়। তাদের সামনে সঠিক দিক-নির্দেশনা না থাকায় ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে। তফাত্ থাকছে না, বিদেশে শিক্ষা নিয়ে আসা ছেলে বা মেয়ের সঙ্গে গ্রামের মাদ্রাসা থেকে অসম্পূর্ণ শিক্ষায় শিক্ষিত ছাত্র-ছাত্রীর। এ বাংলাদেশের সিংহভাগ মানুষ ধর্মভীরু কিন্তু ধর্মান্ধ নয়। অথচ পাকিস্তান, তুরস্ক-এখন পর্যন্ত যুদ্ধাপরাধীর বিচার মানতে পারেনি। অথচ তুরস্ক ফ্রাংকেস্টাইন তৈরি করতে যেয়ে সম্প্রতি আইএসের বর্বরতার শিকার হয়েছে। যে আহ্লাদ পাকিস্তান তালেবান তৈরি করেছিল, তাদের অত্যাচারে পাকিস্তান আজ ব্যর্থ রাষ্ট্র। সন্ত্রাসী ও জঙ্গিদের দেশ-কাল-ধর্ম-অধর্মের বালাই নেই। তারা মানবতার শত্রু। ‘আশরাফুল মাখলুকাত’ না হয়ে নরপিশাচ হয়ে উঠেছে।

বিদেশি বিশেষত:যুক্তরাজ্যের জঙ্গিদের ইতিহাস পর্যালোচনা করে ছাত্রীদের মধ্যে যারা জঙ্গিদের ব্যাপারে বন্ধুত্বশীল তাদের সম্পর্কেও খোঁজ-খবর নেয়া দরকার। এদের সামাজিকভাবে ঘৃণা করতে হবে; বয়কট করতে হবে। কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর উপর নির্ভরশীল না থেকে বরং তৃণমূল পর্যায় থেকে উপর পর্যন্ত সর্বত্র প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। পাঁচ তারকা হোটেলে অনুষ্ঠানের আয়োজন না করে বরং দল-মত নির্বিশেষে গ্রামে-গঞ্জে, ইউনিয়ন পরিষদ, থানা-উপজেলা, জেলা, রাজধানী সর্বত্র জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে সন্ত্রাস ও জঙ্গি বিরোধী তত্পরতা জোরদার করতে হবে। এটি দেশ, জাতি ও সামাজিক কল্যাণের জন্য একান্ত প্রয়োজনীয়।

দেশের শত্রুরা সুন্দর সুন্দর কথা বলেন, অথচ গোপনে দেশের শত্রুতা করেন বলে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার রিপোর্টে প্রকাশিত হয়েছে। আমার অত্যন্ত প্রিয় বোনজামাই মৃত্যুর কিছুদিন পূর্বে (মুক্তিযোদ্ধা মরহুম জহিরুল হক চৌধুরী) দুঃখ করে বলেছিলেন, স্বাধীনতা বিরোধী একটি চক্র প্রগতিশীলদের সঙ্গে আত্মীয়তা করে, বন্ধুত্ব করে, আর্থিক লেনদেন করে দেশে মুক্তিযুদ্ধ চেতনাবিরোধী অপতত্পরতায় লিপ্ত।

উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের জন্য সত্যিকার ইতিহাস নির্ভর বাংলার কৃষ্টি, সংস্কৃতি ও দেশাত্মবোধক গান বিভিন্ন মিডিয়ায় পরিবেশন করতে হবে। বাংলাদেশের সবচেয়ে পশ এলাকা গুলশান। অথচ গুলশান এলাকায় কূটনৈতিক নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ, ব্যবসা-বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডের জন্য। জননেত্রী শেখ হাসিনার কাছে আবেদন করব, কোনো ধরনের বিশ্ববিদ্যালয় যেন গুলশান এলাকায় না থাকে সেজন্য নির্দেশ দিতে দেশের বৃহত্তর স্বার্থে ।

জঙ্গি যেই হোক, সে যেন উপযুক্ত শাস্তি প্রমাণ সাপেক্ষ পায়। ধর্ম মানুষকে উদার করে। ইসলাম ধর্মের মধ্যে যারা হানাফী মাযহাবের তারা শান্তিপ্রিয়। ওহাবীরা হিংস্র; মিথ্যে আত্মগরিমায় বিভ্রান্ত। এদেশ এগিয়ে যাবে—সুন্দর একটি রাষ্ট্র জননেত্রীর নেতৃত্বে গড়ে উঠবে।

n লেখক :শিক্ষাবিদ, অর্থনীতিবিদ